‘সরব’ হওয়া প্রয়োজন!

রীতা রায় মিঠু:

আগেও দেখেছি, আজও ফেসবুকে প্রায়ই দেখি, রাজনৈতিক মতে না মিললে, ধর্মীয় মতে না মিললে, নারীবাদ-পুরুষবাদে না মিললেই একজন আরেকজনকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে, নোংরা কতগুলো ছবিও লাগিয়ে দেয়।

যারা গালিগালাজ করে, তারা কাজটি খুব সহজে করে, কিন্তু যারা এগুলো পড়ে, তাদের খুব কষ্ট হয় কমেন্টের ভাষা দেখে।

এ তো গেলো মতভিন্নতার কথা। এবার আসি মেয়েদের প্রতি কিছু ছেলের কুৎসিত আচরণের কথায়। সমাজে কিছু ছেলে তক্কে তক্কে থাকে, কখন কীভাবে পথে ঘাটে, ঝোপে ঝাড়ে, স্কুল-কলেজে মেয়েদের প্রতি অশ্লীল ইঙ্গিত এবং ভাষা ব্যবহার করে বিকৃত সুখ পাওয়া যায়।

তারা এগুলো এতকাল করেছে নন ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়, অর্থাৎ বাস্তব জগতে। এখন তারা বাপের পয়সা খরচ করে, বাচ্চার দুধের কৌটার পয়সায় ব্রডব্যান্ড ব্যবহার করে অসভ্যতা শুরু করেছে অনলাইন মিডিয়ায়, তা ব্লগেই হোক অথবা ফেসবুকেই হোক।

মেয়েদের বন্ধু হতে চায়, বন্ধু হতে না পারলেই মেয়েদেরকে ইনবক্সে, আদার বক্সে, নাহয় ওয়ালে অশ্লীল ছবি, অশ্লীল ভাষায় কমেন্ট করে।

এইসব কারণে কত মেয়ে ফেসবুক ছেড়ে চলে গেছে। ব্লগে লিখতাম, কিছু বিকৃত রুচির পাঠকের মন্তব্যে তিতিবিরক্ত হয়ে ব্লগে লেখা বাদ দিয়েছি, নিজের ওয়ালে লিখি, সেখানেও বিপত্তি।

যে বা যারা এই ধরণের অপকর্ম করে, তাদের কেউ আমার ফ্রেন্ড লিস্টে নেই, কেউ হয়তো বন্ধু হওয়ার অনুরোধ পাঠিয়েছিল, আমি অ্যাড করতে পারিনি।

ফেসবুকে যেহেতু বন্ধু সংখ্যা লিমিটেড করা আছে, তাই ইচ্ছে থাকলেও সবাইকে অ্যাড করা যায় না। এটা ফেসবুক ইউজারের অপরাধ নয় বা কারো প্রতি ঔদাসীন্যতাও নয়।

অনেকেই ফেসবুক ব্যবহার করে নেটওয়ার্কিংয়ের জন্য, আমি ব্যবহার করি প্রবাসের একাকিত্ব কাটাতে, নিজ ভাষার, নিজ দেশের সকলের সাথে মনের কথা বলতে। এইজন্য আমি যা কিছু লিখি, তা ওপেন ফর পাবলিক থাকে যেন যার ইচ্ছে হবে সেই আমার লেখা পড়তে পারে, নিজস্ব মতামত দিতে পারে।

সুস্থ তর্ক-বিতর্কে অনেক সুফল পাওয়া যায়, নিজেও শেখা যায়, অন্যকেও কিছু শিখতে উৎসাহিত করা যায়।

আমি ছোটবেলা থেকেই ফটোগ্রাফির প্রতি আসক্ত, সুন্দর ফটোগ্রাফী তা যারই হোকনা কেন, দেখতে ভালো লাগে, অতীতের ছবি দেখতে ভালোবাসি, ছবিগুলো আমাকে অতীতে নিয়ে যায়।

সত্যি কথা বলতে কি, ফেসবুকে যখন প্রথম ঢুকেছিলাম, শুধু ছবি পোস্ট করার বাসনা নিয়েই ঢুকেছিলাম। স্ট্যাটাস লেখালেখি শুরু করেছি অনেক পরে। এরপর তো লেখালেখিও করি, ছবিও পোস্ট করি।

ছবি আমার কাছে আর্ট, ক্যামেরার সামনে পোজ দেয়াতেও আর্ট লাগে, যে যখন ছবি পোস্ট করে, আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখি। আমার নিজের ছবিও অনেক যত্ন করে তুলি, ছবি সুন্দর হলে নিজেই দেখি, অন্যকেও দেখাই, ভালো লাগে! এ আমার বাচ্চাদের মতো নেশাও বলা যায়, সকলেই তো মনে মনে একটু আধটু বাচ্চা থেকেই যায়।

আমি নিজের ইচ্ছেমত ছবি তুলি, ছবি পোস্ট করি। কভার ছবি তো কাস্টমাইজ করা যায় না, ওপেন ফর পাবলিক থাকে, তাই ছবিতে যে কেউ কমেন্ট করতে পারে। কতজনে কত মজার কমেন্ট করে, আমার দারুণ লাগে, সময় পেলে পালটা উত্তর দেই।
যে কারো কমেন্ট করার সুযোগ আছে বলেই একজন মানুষের ছবির নিচে ‘বিশেষ অঙ্গের অশ্লীল ছবি’ জুড়ে দেয়া উচিত?

কোন মেয়ের কোন স্ট্যাটাস (ফর পাবলিক) পছন্দ না হলেই কি কমেন্টে মাগী, তার চেয়েও অশ্লীল, নোংরা ভাষায় কমেন্ট করা উচিত?

ফেসবুকে সকলেরই ভাই, বোন, কন্যা, কন্যাসম কন্যারা, সন্তানসম কত পুত্র, অনেক দাদা বন্ধু আছে, এইসব অশ্লীল ছবি তাদের নজরে আসে, অশ্লীল কমেন্ট তাদের নজরেই আগে আসে। তারা বিব্রত হয়, হতবাক হয়। অশ্লীল কমেন্ট পড়ে আমার নিজের দিক থেকে যতটা না খারাপ লাগে, নিজের মানুষেরা এগুলো দেখলো, সেটা ভেবেই খারাপ লাগে।

ইনবক্সে তো এরা অশ্লীল ছবি, অশ্লীল কমেন্ট পাঠায়ই, তা নিয়ে আমার মোটেও দুর্ভাবনা নেই। ছয় বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলাম, অসুর কী করে সাইজ করতে হয় জানি। এই বদগুলোকে সাইজ করতে আমার এক মিনিটও লাগে না, কিন্তু আমি চাকরিজীবী, সংসারী এবং এর মধ্যেই সামাজিকতা করি, কাজেই সবকিছু সময়মত নজরে আসে না।

বন্ধুদের কেউ হয়তো আমাকে বলে, “দিদি, শীগগির অমুককে আনফ্রেন্ড করেন, দেখেন আপনার ওয়ালে কী নোংরা ভাষায় কমেন্ট করেছে”।
তখন হয়তো আমি টর্চ লাইট দিয়ে ফ্রেন্ড লিস্টে ‘অমুক’কে খুঁজি, কিন্তু পাই না। পাবো কী করে, এইসব নোংরা, বিকৃত পশুরা তো মেয়েদের ফ্রেন্ড লিস্টে থাকে না, এমনকি ফলোয়ার লিস্টেও থাকে না।

কয়েক বছর আগের কথা, এক সকালে জীসান নামের এক ভাই আমাকে ইনবক্সে জানিয়েছে, “দিদি, নূর উদ্দিন কে? এইটারে এক লাত্থি মেরে আনফ্রেন্ড করে দাও”।

আমি তো আমার স্ট্যাটাসের কোথাও নূর উদ্দিন নামের কাউকে দেখি না। সারাদিন কাজে ছিলাম, বিকেলে এসে কী মনে করে যেন কভার পিকচারে গেছি, দেখি আমার কভার পিকচারে কমেন্টে নূরউদ্দিন তার বিশেষ কুৎসিত দর্শন অঙ্গের ছবি দিয়েছে। দেখেই গা ঘিন ঘিন করে উঠলো।
ততক্ষণে ২৪ ঘন্টা পেরিয়ে গেছে, অনেকেই দেখেছে আমার ছবির নীচে কমেন্টে নূর উদ্দিনের বিকলাঙ্গ।

নূর উদ্দিন আমার বন্ধু লিস্টে থাকবে কি, আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানোর মত সাহসই তো তার নেই, এরা মানুষ চিনে। ব্লক তো করেছি, কিন্তু নূর উদ্দিনেরা এরপর অন্য মেয়েদের ওয়ালে গিয়ে বিকলাঙ্গসহ উপস্থিত হবে।

এই ধরণের নুরুদ্দিন মার্কা বিকলাঙ্গ পশু সব কালেই আমাদের সমাজে ছিল, আছে, থাকবে।
একটাই পার্থক্য, আগে মাথা নীচু করে চলতাম, এখন ‘উস্টা ‘ দেয়ার জন্য তৈরী থাকি। আগে ব্লক করে দিতাম, তবে ব্লক করা যথেষ্ট মনে না হওয়ায় মাঝে মাঝে পাবলিকলি উস্টা দেই।

ভারত বাংলাদেশে যে হারে ধর্ষণ, গণধর্ষণের উৎসব শুরু হয়েছে, মেয়ে বুড়ি কারোরই আজ আর নীরব থাকা নয়, লজ্জা ঝেড়ে ফেলে সরব হওয়া উচিত, গণউস্টা দেয়া দরকার। গণমাধ্যমে তো বটেই, রাস্তাঘাটেও গণউস্টা শুরু করা উচিত।

আমাদের বন্ধু বন্যার স্ট্যাটাসে প্রায়ই বিকৃতরা এসে ওকে মাগী বলে গালি দিয়ে বিড়িতে সুখটান দেয়ার সুখ পায়। ভদ্রজনেরা অনেকেই বলতে থাকে, “দিদি এটারে ব্লক দেন”!।
বন্যা সেসব কমেন্ট মুছে না, আমাদের প্ল্যানই এরকম। গালিগালাজ তো আমরা করি না, তাহলে আমরা লজ্জা পাবো কেন। আমরা ঠিক করেছি, সব অশ্লীল কমেন্ট রেখে দেব ওয়ালে যাতে ভবিষ্যতে আর কোন বিকলাঙ্গ পশু মেয়েদের ওয়ালে গেলেও জানবে যে ওদেরকে আমরা মেয়েরা রাত দিন ‘উস্টাই’।

আগে আমার এমন উস্টা মার্কা স্ট্যাটাস পড়ে বন্ধুদের অনেকেই অবাক হয়েছে, আমাকে তো কেউ এভাবে রাগতে দেখেনি।

একবার তো ভাস্কর দাদা “ছিঃ মিঠু’ বলে মৃদু ভর্ৎসনা করেছে।

আমিও বলেছি, দাদা গো, আমাকে ছি ছ্যা বলে লাভ নেই, আমি সহজে রাগি না, তাই বলে রাগবো না, এমন কথা তো ছিল না। তোমরা বুঝবে কী করে, নারীর অন্তরে কী ব্যথা ঝরে! পারো তো না, বদমাশদের ঠ্যাঙাতে! নিজেরা ভদ্র সেজে বসে থাকলে কি ওদের বদমায়েশি ভালো হয়ে যাবে! যে রোগের যে ওষুধ তাকে তা দিয়েই ঠাণ্ডা করতে হয়!

বাংলা ভাষা কত মধুর ভাষা, এই মধুর ভাষাকে যারা এভাবে প্রতিনিয়ত বলাৎকার করে চলেছে, তারা ছেলেই হোক বা মেয়েই হোক, অপরাধী।

নীরবতা অপরাধপ্রবণ হতে উসকে দেয়। নীরবতা নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব হোন।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.