ঝিঁ ঝিঁ দম্পতি

মোহছেনা ঝর্ণা:

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে জেগে উঠলেন তাহেরা। স্বপ্ন দেখেছেন। ঠিক স্বপ্ন নয়, দুঃস্বপ্ন। বুকের ভেতর ধড়ফড় করছে। পানির তৃষ্ণা পেয়েছে খুব। পাশে ঘুমিয়ে থাকা স্বামী নাজমুলকে ডাকতে গিয়েও ডাকলেন না। বেচারা কেমন আরাম করে ঘুমাচ্ছে। দেখে মায়া লাগল ভীষণ। একটা সময় তাহেরা নিজেও বেশ আরাম করে ঘুমাতো। বিছানায় গা এলিয়ে দিলেই ঘুম। যেন ঘুমের রাজ্যে বসবাস। কতদিন এমন আরামের ঘুম নেই দু’চোখে! পানির তৃষ্ণা কমছে না। নিজেই বিছানা থেকে নেমে গেলেন। অন্ধকারে গ্লাস নেওয়ার জন্য টেবিল হাতড়াতে গিয়ে কাচের গ্লাসটা ফেলে দিলেন।

গ্লাস ভাঙার শব্দে নাজমুল ঘুম থেকে জেগে উঠেছেন। লাইট জ্বালিয়ে দেখেন তাহেরা অন্ধকারে বসে আছে। নাজমুলকে দেখে তাহেরা বললেন, পানি খাবো।
আমাকে ডাকোনি কেন?
তুমি এমন আরাম করে ঘুমুচ্ছিলে ডাকতে ইচ্ছে হল না।
পানি খাওয়ার পরও তাহেরা বসে আছে দেখে নাজমুল জিজ্ঞেস করলেন বসে আছ কেন? শোবে না?

ঘুম আসছে না। তুমি শোও। আমি বারান্দায় কিছুক্ষণ বসবো।

নাজমুল আর কিছু বললেন না। বলে লাভ হবে না। তাহেরা দিনে দিনে কেমন যেন অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। অথচ একটা সময় সারা বাড়ি জুড়ে তাহেরার চাঞ্চল্য ছিল। কিছুক্ষণ এখানে এ কাজ নিয়ে চিৎকার, কিছুক্ষণ ওখানে মজার কোনো ঘটনা নিয়ে হাসতে হাসতে বিষম খাওয়ার উপক্রম, ছেলেমেয়েদের সাথে গল্প, রান্না-বান্না, খুনসুঁটি, ভালোবাসা, অভিযোগ, অভিমান সময় যে কোনদিক দিয়ে কেটে যেতো টেরই পাওয়া যেত না। সেই দিনগুলো এখন কেবল স্বপ্নের মতো মনে হয় নাজমুলের কাছে।

তাহেরা তার দু’মেয়ে শিলা আর লোপার ঘরে গিয়ে মেয়েদের দেখে এলেন। ওদের গায়ে কাঁথা টেনে দিলেন। ফ্যানের রেগুলেটর কমিয়ে আবার ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। যখন ঘুম আসে না সারা ঘর জুড়ে হাঁটেন তিনি। কতক্ষণ এ ঘরে, কতক্ষণ ও ঘরে যেন ঘুমকে খুঁজে বেড়ান।

মেয়েদের ঘর থেকে বেরিয়ে শাহেদের ঘরে ঢুকলেন তাহেরা। পরিপাটি করে সাজানো সব জিনিসপত্র। শাহেদের নিজ হাতে তৈরি বাঁশের জিনিসগুলোতে ধূলাবালি জমেছে। তবুও তাহেরা কাউকে হাত লাগাতে দেন না। যখন সুস্থ থাকেন তখন নিজেই সবকিছু পরিষ্কার করে রাখেন। ধূলাবালি মোছেন। সাজিয়ে রাখেন যেমন করে সাজাতো শাহেদ।

বারান্দায় রাখা ইজি চেয়ারটাতে হেলান দিয়ে বসেন তাহেরা। অমাবস্যা চলছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার চারদিকে। তাহেরা চোখ বন্ধ করে আছেন। বুকের ভেতরে এখনো ধড়ফড় করছে। শাহেদ এসেছে। তাহেরার পায়ের কাছে বসে কোলে মাথা রেখে বললো, মা তুমি বাইরে বসে আছো কেন এতো রাতে? তোমার না ঠাণ্ডা লাগানো নিষেধ। ঠাণ্ডাতে না তোমার শ্বাসকষ্ট হয়? ভেতরে যাও মা।
বাবা, তুই ভালো আছিস?
না, মা। তোমাকে ছেড়ে কি ভালো থাকা যায়! তোমার কথা খুব মনে পড়ে। আমার খুব একা একা লাগে মা। ভয়ও লাগে। মা আমার গাছগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কেন?
তাহেরা বললেন, কোন গাছ বাবা?
অভিমানী সুরে শাহেদ বলে, সবগুলোই।

বাড়ির সামনে ছোট্ট এক টুকরো উঠানে শাহেদ কত যে গাছ লাগিয়েছে! পেয়ারা গাছ, বরই গাছ, জাম্বুরা গাছ। একটা বনসাঁইও করার চেষ্টা করেছিল। বনসাঁইটা এখনো আছে। কিছুদিন আগেও মনে হয়েছিল মরে যাবে। কিন্তু গত দু’চারদিন ধরে তাহেরা খেয়াল করলেন বনসাঁইটিতে নতুন পাতা গজাচ্ছে। ছোট্ট বাগানটাতে কী করে জানি একটা চালতা গাছ হয়েছিল। এতো ছোট্ট জায়গাতে চালতা গাছ বাঁচবে না শুধু শুধু অন্য গাছের ওপর ছায়া ফেলবে বলে ওর বাবা কেটে ফেলতে চেয়েছিল। শাহেদ কাটতে দেয়নি। বলেছিল, দেখি না বাবা আর কিছুটা সময়। এখন তো আমাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তবু গাছটা যদি বেঁচেই যায়।

শাহেদদের ছোট্ট একতলা বাড়িতে ঢুকলে যে কেউই মুগ্ধ হয়ে যেত তার ছোট্ট বাগানে অসাধারণ সব গাছের মেলা আর ক্যাকটাসের বিশাল সংগ্রহ দেখে। কত দুর্লভ প্রজাতির ক্যাকটাস যে সংগ্রহ করেছে ও। তাহেরা মাঝে মাঝে বিরক্ত হতেন। বলতেন, কী সব জংলি কাটাকুটা দিয়ে বাড়িটা ভরিয়ে ফেলছিস। শাহেদ মার কথা শুনে বলতো, এগুলো যে কত মূল্যবান তা তুমি জানো না। জানবে, জানবে আমি আছি না। আমি তোমাকে সব জানিয়ে দেব।

শাহেদ এখন নেই।

তাহেরা ডাকলেন শাহেদ, কথা বলছিস না কেন বাবা? শাহেদ, শাহেদ, তাহেরার চিৎকার শুনে নাজমুল ভেতর থেকে ছুটে এলেন।
কী হয়েছে? এমন চিৎকার করছ কেন?
তাহেরা বললেন জানো, শাহেদ এসেছে। আমার ছোট্ট বাবুটা এসেছে। ওর ওখানে খুব ভয় লাগছে। আমার ছেলেটা খুব কষ্ট পাচ্ছে।
তোমাকে না বলেছি শুয়ে থাকতে। কেন যে এমন করো! নাজমুল তাহেরাকে ভেতরে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেন। তাহেরা গোঙাতে গোঙাতে বলে, আমার ছেলেটাকে কেন ওরা মেরে ফেললো, বল না! কেন মেরে ফেললো?

নাজমুল কোনো কথা বললেন না, কথা বলার কোনো ভাষা খুঁজে পান না। চোখের পানি মোছেন হাতের তালুতে। তাহেরার সামনে যন্ত্রণাটাকে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তাইতো ওর সামনে সংযত রাখতে হয় কঠিন মানুষের মুখোশের আড়ালে। এতো বিশাল কষ্টটাকে তিনি পাথর চাপা দিয়ে রাখতে কী অসম্ভব চেষ্টাটাই না করেন। তবু যেন তাহেরা নিজেকে একটু বোঝাতে পারে!

শাহেদ বলেছিল, মা, আর একটা পরীক্ষা আছে। পরীক্ষা যেদিন শেষ হবে সে রাতেই চলে আসবো। কতদিন তোমাকে দেখি না, মা! এবার অনেকদিন থাকবো।

পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই শাহেদ বাড়ি এসেছে। মাথায় গুলি লেগেছে। প্রচুর রক্তক্ষরণে চেহারাটা একেবারেই বদলে গেছে। চোখ দুটো খোলা ছিল। যেন মাকে দেখার শেষ আকুতি। বড্ড মা ন্যাওটা ছিল। সারাক্ষণ শুধু মা আর মা।
কোনো দলাদলির মধ্যে না থেকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’গ্রুপের ছাত্রদের মারামারির সময় ক্রসফায়ারে পড়ে শাহেদ।

তাহেরা গেটে যেন কীসের শব্দ শুনতে পেলেন। এই ঘুটঘুটে অন্ধকারেও তিনি কী যেন দেখতে পেলেন। ঝাপসা। অস্পষ্ট। তিনি উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে আছেন গেটের দিকে। নাজমুলও। সন্তানহারা দু’জন বাবা মা এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঝিঁ ঝিঁ দম্পতির মতো পথ চেয়ে আছেন। তারা দু’জনেই জানেন তাদের সন্তান আর ফিরে আসবে না। তারপরও প্রতীক্ষা। অলৌকিক কতকিছুই তো ঘটে পৃথিবীতে। যদি সেরকম অলৌকিক কিছু ঘটে যায়!

শেয়ার করুন:
  • 366
  •  
  •  
  •  
  •  
    366
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.