ভেসে যায় আদরের নৌকো!

কামরুন নাহার রুমা:

মেঘ বৃষ্টির কথা মনে আছে? ‘এই শহরে মেয়েটিকে একা ছেড়ে দিলেন’ শিরোনামে আমার একটি লেখা ছিলো সেখানে বৃষ্টিরা কীভাবে মেঘেদের শরীর বেয়ে ঝরে পড়ে সেই কথা বলেছিলাম। আজ আবার মেঘ বৃষ্টিদের গল্প বলবো। মেঘ বৃষ্টি আপনার আমার সন্তান, শিক্ষার্থী, ভাইবোন, প্রেমিক-প্রেমিকা অথবা কেউ না অথবা সব। মেঘ বৃষ্টি আমাদের কেউ না হোক বা সব হোক তারপরও আমাদের তাদের গল্পগুলো জানা দরকার। তাদের গল্পগুলো পুরনো, আমরা সবাই জানি। আমি তাও আবার নতুন করে বলবো ।

সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমার প্রথম কাজ ছিলো ম্যাসেঞ্জারে এক শিক্ষার্থীর ম্যাসেজের উত্তর দেয়া এবং সেই উত্তরের প্রেক্ষিতে তার কাছ থেকে গালি খাওয়া ( না সরাসরি আমাকে সে গালি দেয়নি; কিন্তু পুরো প্রক্রিয়াটি ছিলো খুব সুন্দর অভিমান মাখানো গালির)। আমার কষ্ট হয়েছে কিন্তু আমি কিছু মনে করিনি। কারণ শিক্ষক হিসেবে তার প্রতি দায়িত্বে আমার কোথাওনা কোথাও অবহেলা ছিলো নিশ্চয়ই। তার চেয়েও বেশি অবহেলা ছিলো তার মা বাবার – যারা তাকে জন্ম দিয়ে লেখাপড়ার একটা পর্যায় শেষে এই শহরে কোন কিছু নিশ্চিত না করে একা ছেড়ে দিয়েছেন।

একা থাকা ২০ বছর বয়সী একজন ছেলে বা মেয়ে শুধু অসৎ সঙ্গে সিদ্ধান্তহীনতায় বা বোধের অভাবে ভালোবাসার ভুল সঙ্গীই নির্বাচন করে না, অসৎ সঙ্গে এডিক্টেডও হয়। ব্যাপারটা আপনারা জানেন, বোঝেন। আমরা জেনে বুঝেও না জানার না বোঝার ভান করে থাকি অথবা বোঝার চেষ্টাও করি না হয়তো অথবা এতোটাই ‘এমন’ যে বুঝি না।

আমি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন কিছু ছেলেমেয়েকে চিনি যারা এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে কিন্তু বাসায় জানে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়! কেমন মা বাবা আপনারা আপনাদের সন্তান কোথায় পড়ে সেটা জানেন না? আপনাদের নিজের সন্তানের বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে ইচ্ছে করে না? আপনাদের জানতে ইচ্ছে করে না আপনার সন্তানের শিক্ষকরা কেমন? জানতে ইচ্ছে করে না সে কোথায় থাকে, কার সাথে সাথে থাকে, কী খায়, ঠিকমতো লেখাপড়া করে কীনা! শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করতে চান, সন্তানের গর্বিত মা বাবা হতে চান? সত্যিকার মা বাবা হওয়া এতো সহজ?

এই শহরে ( সবখানেই আসলে) সত্যিকারের বন্ধু পাওয়া মুশকিল; সেই বন্ধু যে খুব বিপদে আপনাকে থাকতে দেবে দুটো রাত অথবা সাহায্য করবে আপনাকে নানানভাবে। এমন আছে কিন্তু সবাই তাদের বন্ধু হিসেবে পায়না! আপনার সন্তান দূর শহরে থাকার জায়গা পাচ্ছে না, খেতে পাচ্ছে না, তার হাতে টাকা নাই সেটা আপনি কেনো জানেন না? আপনার সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে দিনের পর দিন হতাশায় ভুগে আপনাকে তার পরিস্থিতির কথা জানাতে না পেরে অসৎ সঙ্গে পড়ে নেশার আশ্রয় নিয়ে তার হতাশা কষ্ট ভুলে থাকার চেষ্টা করছে – সেই খবর কি আপনারা সব মা বাবারা রাখেন? আপনার ছেলে মাদক ব্যবসায় জড়াচ্ছে কীনা, আপনার মেয়ে বাজে কোনো কাজে জড়িয়ে যাচ্ছে কীনা সেই খবর রাখেন আপনারা?

হ্যাঁ, শিক্ষকদের দায়িত্ব আছে বৈকি! কিন্তু সব শিক্ষক সেই দায়িত্ব নিতে চান না , অনেকে নিতে জানেন না, অনেকে নিতে চাইলেও নানান কারণে পারেন না, আবার অনেকেই সেই দায়িত্ব খুব আন্তরিকভাবেই নিয়ে থাকেন। কিন্তু তিনি সেটা অনেক ক্ষেত্রেই অনেক শিক্ষার্থীকে বোঝাতে ব্যর্থ হোন। সবসময় সবাই যে সব শেয়ার করতে চায় তাও না! আমি ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করতাম সময় দিতে, এখনও দেই। কিন্তু সবসময় কি একজন শিক্ষকের পক্ষে সম্ভব হয় সমাধান বা সময় দেয়ার! আমিও তেমনি পারিনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে এবং তার জন্য আজ আমি গালিও খাচ্ছি। গালিটা খাচ্ছি কারণ সে সত্যিই চেয়েছিলো আর কেউ না হোক অন্তত আমি যেনো তাকে একটু সময় দেই এবং অধিকারের জায়গা থেকেই চেয়েছিলো; আমি দিয়েছিও কিন্তু হয়তো পুরোপুরি পারিনি! দায় আমারও আছে! আমি দায় মাথা পেতে নিচ্ছি!

কিন্তু এই পরিস্থিতি উদ্ভুত হলো কেনো? কেনো সে তীব্র হতাশায় নেশার পথ বেছে নিয়েছিলো? কেনো তার জীবন থেকে কয়েকটি বছর ঝরে গেলো? তার বিপথগামী হবার দায় কি একার বিদ্যাপিঠের বা শিক্ষকের? আপনাদের মা-বাবাদের দায় নেই? এই ঢাকা শহরে বিশেষ করে আপনার সন্তান নিরাপদ নয়, সে বিভ্রান্ত হয় প্রতিনিয়ত! হারিয়ে যায়, গুঁড়িয়ে যায়, মরে যায়, ঝরে যায়! মা-বাবারা পাশে দাঁড়ান, শিক্ষকরাও দাঁড়ান। এতো আদরের সন্তানকে ভেসে যেতে দেবেন না! প্লিজ!!

শেয়ার করুন:
  • 636
  •  
  •  
  •  
  •  
    636
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.