সন্তানের নিরাপত্তা না নিজের ক্যারিয়ার!

গোপা মল্লিক:

সম্প্রতি বিভিন্ন মিডিয়াতে ভাইরাল হওয়া একটা ভিডিও নিয়েই আজ কিছু বলবো। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে একজন গৃহকর্মীর হাতে দুই বছরের একটা শিশু নির্যাতিত হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই ঘটনাটা মর্মস্পর্শী ও হৃদয়বিদারক। এমন ঘটনা আমাদের যে কারোর সাথেই ঘটতে পারে। আর এটা ভেবেই শিশুদের নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে মনে প্রশ্ন আসে- আচ্ছা, তাহলে আমাদের করণীয় কী? শিশুর নিরাপত্তার স্বার্থে মেয়েরা কি তবে নিজের ক্যারিয়ার বিসর্জন দেবে? আর তাতেই কি বাচ্চার নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে?

ভিডিওটির কমেন্ট পড়তে গিয়ে দেখলাম প্রচুর নারী পুরুষ এমন মন্তব্য করেছেন – “কর্মজীবী নারীদের সন্তানদের সাথে তো এমনটাই হয়”, “এতো টাকা পয়সার লোভ যে দুজনকেই জব করতে হয়!”

তাদের উদ্দেশ্যে একটা কথা বলি- ডিয়ার ভাই ও বোনেরা, ঢাকাতে যারা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই জব করে তারা হাউসে করে না। একজনের ইনকামে ঢাকার বাজারে একটা সংসার চালানো অনেকের পক্ষেই মুশকিল। অবশ্য আপনার মতো বড়লোকরা কিংবা বড় মাথার লোকেরা এটা বুঝবেন না।

আজকে যে বাচ্চার জন্য মা নিজের ক্যারিয়ার স্যাক্রিফাইস করবে, ক’বছর বাদে সেই বাচ্চা ভালো স্কুলে যাবে, নামী কলেজে পড়বে, তখন তার চাহিদা বাড়বে; সেই সময় যে অর্থের প্রয়োজন পড়বে তার যোগান কি আপনি দিবেন? দিবেন না তো? তাহলে জ্ঞান দেয়াটাও বন্ধ করেন।

আর একটা কথা, যেসব মায়েরা কর্মজীবী নয়, তাদের বাচ্চারা কি নির্যাতনের শিকার হয় না? বাচ্চা খেলতে গিয়ে রেপ হচ্ছে নিকট আত্মীয়ের কাছে, ড্রাইভার-দারোয়ান-গৃহশিক্ষকদের হাতে নির্যাতিত হচ্ছে, স্কুলে/মাদ্রাসায় গিয়ে শিক্ষক, মৌলভীর হাতে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, এমন নিউজ আমরা প্রায়ই দেখি। এগুলোকে কীভাবে ঠেকাবেন?

শিশুর স্বার্থে নিজের ক্যারিয়ার বিসর্জন দেবার উদাহরণ আছে ভুরি ভুরি। কিন্তু তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্নে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা মায়েদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। কর্মক্ষেত্রে চাইল্ড কেয়ার সেন্টার চালু করার প্রস্তাবনা থাকলেও সেটা কার্যত হয়ে ওঠে না। আর এটা হয় আমাদের নারীবাদী সংগঠনগুলোর দুর্বল দাবী বা ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের অবহেলার ফল। যদি উপজেলাগুলোতে একটি করে হলেও এমন সেন্টার গড়ে তোলা সম্ভব হতো, তবে মায়েরা কিছুটা হলেও শিশুর ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারতো।

তবে সবচেয়ে অপ্রিয় সত্য কথা এই যে, আমাদের মূল্যবোধ আর বিবেক যতদিন না জাগ্রত হচ্ছে, ততদিন সমস্ত আইন-কানুন, উপায়-উপান্তর অন্ধকারেই হাতড়ে ফিরবে এই সমস্যা থেকে মুক্তির প্রকৃত পথ।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.