শত ইচ্ছাতেও পারিনি বদলাতে কিছুই!

সাবেরা আনোয়ার:

অনেকদিন ধরে লিখি লিখি করেও লেখা হয়নি। সেদিন গুলতেকিন খানের বিয়ের খবর দেখে লিখতে বসলাম। অনেক অভিনন্দন আপনাকে। ৫৭তে এসে আপনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদিও অনেক আগেই করতে পারতেন। হয়তো সঠিক সঙ্গী মেলেনি, তাই দেরি হলো। তারপরও হিন্দি সেই প্রবাদের মতো বলতে হয়, “দের আয়া লেকিন দুরস্থ আয়া” came late, came correct।

বাংগালি মেয়েরা কুড়িতে বুড়ি তা ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি। বাচ্চা হলে অল্প বয়সেই বুড়ি হয়ে যেতে হয়। শখ আহ্লাদ বাদ দিয়ে সংসারের যাঁতাকলে পিষে বুড়ি না হলেও আলগা বুড়ো হবার ভান করতে হয়। তিরিশ পার হয়েছে, অথচ বিয়ে হয়নি, এমন মেয়েদের তো জীবন শেষ – এমনই ভাবা হতো বা এখনও এমনি ভাবা হয়। সেখানে ৫৭তে এক পাবলিক ফিগারের দ্বিতীয় বিয়ে, তাও আবার মেয়েমানুষ, সেতো রীতিমতো দৃষ্টান্তমূলক সবার জন্য।

সাবেরা আনোয়ার

শাওনেরও এখন এনিয়ে ভাবা দরকার লোকে কী বলবে তা বাদ দিয়ে। অবশ্যই এটা উনার ব্যক্তিগত ব্যাপার, তাও মনে হয় অল্পবয়সী এক মেয়ে কী অপার বৈরাগ্য নিয়ে জীবনযাপন করছে, কারণ দেশভর্তি একদল হিংস্র মানুষ সরু চোখে তার সব কাজকারবার লক্ষ্য করছে। শাওনকে বলছি, আপনিও জীবনকে ভালোবাসবেন, ভুলে যাবেন না অন্যের ভয়ে।

মনে পড়লো ছোটবেলায় খেতে বসে কিছুতেই খাবার প্লেট চেঞ্জ করতাম না। লোকে বলতো আধ খাওয়া প্লেট বদলালে নাকি দুইটা বিয়ে হয় – সেই ভয়ে আরকি। ছোট মনে অনেক দাগ কেটেছিলো সেই কুসংস্কার।

এক গায়িকা ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতারের। অসাধারণ সুন্দরী। নজরুল সংগীত গাইতেন।
যেমন কিন্নর কন্ঠী, তেমনি সুন্দরি। এখনও গান গান। এখনও তাকে আমার তেমনি আহামরি সুন্দরী মনে হয়। উনাকে বিটিভিতে দেখলেই বড়দের কাছে শুনতাম, এই যে এই মহিলা একটার পর একটা বিয়ে করেই চলছে! বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে যেত। ভাবতাম, বাপরে কী মহিলারে বাবা! কীভাবে পারে এভাবে বিয়ে করতে লিজ টেলরের মতন, তাও আবার আমাদের সমাজে! আসলে এভাবেই আমাদের মাথায় ইঞ্জেক্ট করা হতো যে মেয়েদের জীবনে বিয়ে একবারই হয়। যারা দ্বিতীয় বিয়ে করেন তারা নিতান্তই দুশ্চরিত্র। আর উনি তো বেশ কয়েকবার করেছেন। তার মানে উনার আর চরিত্র বলতে কিছু নাই।

প্লেট নিয়ে আর একটা কুসংস্কার ছিল। জামাইয়ের এঁটো প্লেটে খেলে নাকি নেভার এন্ডিং ভালোবাসা হয় দুজনের মাঝে। লুকিয়ে চুরিয়ে সেই ভালবাসার লোভে কয়কবার এমন করে খেয়েছিও। কী লাভ হয়েছে জানি না, তবে আমার প্রথম বাচ্চা কন্সিভ করার পর থেকে আমি বুঝে গিয়েছি সে আশায় গুড়ে বালি।

নিজেকে মিথ্যা প্রবোধ দিয়ে প্রায় দুই যুগ কাটিয়ে দিয়েছি। তারপর বের হয়ে এসেছি। শুনেছি এটা নাকি আমাদের ফ্যামিলিতে ফার্স্ট ডিভোর্স। যাক বাবা তাও তো কিছুতে ফার্স্ট হয়েছি।

ছোটবেলায় পাহাড়ে থাকতাম। আব্বা এক ব্যাটালিয়ন কমান্ডার ছিলেন – রাঙামাটি থেকেও দূরের এক ক্যাম্পে। টুআইসি আংকেলের মেয়ে ইলোরা আমার অসম্ভব প্রিয় বান্ধবী ছিল। আমরা ডাকতাম ইলা। এতো সুন্দর মেয়ে আমি খুব কম দেখেছি। ওর ছোট ভাই ছিল আমার ছোট ভাই হাসিবের বন্ধু।

ইলার বাবা তিনটা বিয়ে করেছিল ওর মাকে ডিভোর্স দিয়ে। আশির দশকে ডিভোর্সের কথা এতো সহজে শোনা যেত না। ছোট ইলা সারাক্ষণ ভয়ে ত্রস্ত হরিণের মতো থাকতো। ঠিকভাবে ওর সৎমা ওদের খেতে দিত না। বাবার স্নেহ দূরে থাক, তার অত্যাচারে ওরা কাঁপতে থাকতো। এতো ভয়াবহ ছোটবেলা যেন কোনো বাচ্চার না হয়, সবসময় তা ভাবতাম। আরও ভাবতাম আমার বাবা এমন করলে, মানে বিয়ে করলে আমার বাবার কপালে খারাপি আছে। যাইহোক ওরা কাউকে কিছু বলতো না। ওর মা স্কুলের টিচার ছিলেন। বাচ্চাদের নিজের কাছে রাখার অনেক চেষ্টা করেছেন। পাষণ্ড লোকটা ওদের একবারও আন্টির সাথে দেখা করতে দিত না। একবার আন্টি রাঙামাটি এসেছিলেন বাচ্চাদের সাথে দেখা করতে। পারেননি। এতো অস্থির হয়ে যেতে ওদের আমি আগে কখনও দেখিনি। মনে আছে ইলা আমাদের কাজুবাদাম গাছের নিচে লুকিয়ে সারাবেলা কেঁদেছিল। পরে আন্টি ম্যানেজ করে কাউকে দিয়ে ওদের জন্য আনা কিছু কাপড় আর পুতুল পাঠিয়েছিলেন। ওই গিফটগুলো কর্ণফুলি নদীতে ফেলে দিয়েছিল সেই ‘অভদ্রলোক’।

সেই সময় স্টেশনারি দোকানে একটা ভ্যানিশিং ক্রিম এসেছিল। নাম ছিল ইলা। আমি আর ইলা গিয়ে ক্রিমের ডিব্বা খুলে ঘ্রাণ নিয়ে চলে আসতাম বাসায়। গন্ধটা এখনও নাকে আর মনে লেগে আছে।

সুগন্ধি আমাকে বরাবরই টানে। টাকা হাতে না থাকলেও পারফিউম কিনে ফেলি। গতবছর ব্যাংকক থেকে একটা হেয়ার ক্রিম এনেছিলাম। আরগান অয়েল আর হানিযুক্ত এ ক্রিম ভেজা চুলে দিয়ে ৫ মিনিট বসে থাকতে হয়, চুল সফট হয়। দারুণ এক ঘ্রাণ হয় চুলে। অবিশ্বাস্যভাবে ছোটবেলার সেই ক্রিমের ঘ্রাণ এই হেয়ার ক্রিমে। থিকনেসও প্রায় একই। আমি শাওয়ার নিতে গিয়ে ভেজা চুলে হেয়ার ক্রিম মাখিয়ে ছোটবেলায় হারিয়ে যাই। হেয়ার ক্রিমের ডিব্বায় আঙুল ডুবিয়ে ভাবি, আহ আমার সেই ছোট ইলা আর সেই সুগন্ধি ক্রিম কেমন আছে এখন? জীবন কি তোমার প্রতি সদয় হয়েছে পরবর্তিতে? চুলের মতো আমার মনও ভিজে আসে এসব ভেবে ভেবে।

ক্লাস ফোরে পড়ি, নওগাঁয় থাকি। আমার স্কুলের এক মেয়ে আর তার ভাই আমাকে ধরলো কিছু বলবে। আমার বাবা তখন নওগাঁর পুলিশ সুপার। ছোট বাচ্চা দুটার কোথাও যাবার জায়গা নাই। মা মৃত। ওদের বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেছে। সৎমায়ের অত্যাচারের লিস্ট সিন্ডারেলার কাহিনিও ফেইল করবে। ভেবেছিলাম জীবনেও আমার বাবাকে কখনও মাফ করবো না এমন কিছু করলে।

তার ঠিক দুবছরের মাথায় আমরা যখন ঢাকায়, আব্বা লুকিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেন তার কর্মস্থল শেরপুরে। আম্মা পাগল হয়ে গিয়েছিলেন সেই শোকে, অপমানে। শুরুর দিকে বাসায় অনেকদিন ঝগড়া দেখেছি আব্বার সাথে আম্মার। আম্মা আমাদের জন্য তার লাইফ স্যাক্রিফাইস করেছেন। ভীষণ কড়া আর নিত্য নতুন নিয়ম বের করা মা আমার পুরো উদাসীন, নরম আর অসচেতন হয়ে যেতে থাকলেন এরপর থেকে। আবার নিজেকে বললাম, আমার সাথে আমার জামাই এমন করলে তার নিস্তার নাই। বাবাকে সামলাতে পারলাম না, কিন্তু নিজের জামাইকে তো পারবো।

মধ্য তিরিশের কোঠায় থাকা লাবণ্যময়ী আমার মা সারাজীবন একা কাটিয়ে দিলেন বাচ্চাদের জন্য। এই বয়সেও যার যখন লাগে আম্মাকে ডাকি আর উনি আমাদের সংসার, সন্তান পাহারা দিতে চলে আসেন। বা উনার বাসায় রেখে আসি। আমার বাসার খাবারটাও উনার বাসা থেকে আসে। ভীষণ গিল্টি ফিলিংস হয়। মনে হয় একটা মানুষ কোনো শেয়ারিং ছাড়া জীবনের শেষ প্রান্তে চলে এসেছেন। কিছুই কি করার নাই তার জন্য আমাদের? আমরা এতো স্বার্থপর শুধু নিজেদের স্বার্থটাই দেখে গেলাম!

এক কনসার্টে দেখা হয়েছিল আমার সাথে তার। অসম্ভব সুন্দর, কিছুটা গ্রিকদের মতো। আমরা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে গেলাম। মাত্র ১৮ বছর বয়সে বিয়ে করলাম অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে। অনেক কাহিনী করে একসাথে থাকা শুরু করলাম মাস্টার্সের পর। তিন মাসের মধ্যেই ভাঙ্গন। কিন্ত বের হতে পনেরোটা বছর লেগে গেলো। না তাকেও ফেরাতে পারিনি। বলা সহজ যে এটা করে ফেলবো, ওটা করে ফেলবো। কিন্ত আদতে মনের উপর কন্ট্রোল করার সাধ্যি কারও নাই।

আগে খুব জাজমেন্টাল ছিলাম। কেন একটা মেয়ে দ্বিতীয়বার বিয়ে করলো, কেন সংসার ছেড়ে গেল, কেন বুড়া বয়সে বিয়ে করতে হবে, ঐ মেয়ে কেন একা থাকে, লিভ টুগেদার করে, বাচ্চা নেয় না, উনি কেন বয়স অনুযায়ী কাপড় পরে না বা সাজে না, উনি কেন বয়স অনুযায়ী গম্ভীর না, এখনও ইয়াং মেয়েদের মতো রংঢং করেন- এমন অনেক ভাবনাই আমরা ভাবি। কিন্ত আমরা কেউ কিন্তু উনাদের জুতো পায়ে হেঁটে দেখিনি। তাই খুব সহজে একটা কমেন্ট করে ফেলি।

আবার পাছে লোকে কিছু বলে তা নিয়ে ভেবে কারও কি কোন উপকার হয়েছে? জাজ করবে যেসব মানুষ, তারা কখনো কিন্তু আপনার বিপদে কাজে আসবে না।

সঙ্গীর সাথে মিল না হলে সারাজীবন কেন এক ছাদের নিচে সমাজকে সুখী হবার ভান করে কাটিয়ে দিতে হবে? সবার চোখে আদর্শ কাপল সেজে জীবন ফুরিয়ে দিলে কি লাভ হবে? জীবন তো একটাই, তাই না? দ্বিতীয় মানুষের সাথে মত বা কোন কিছুর মিল হলো না, তাহলে সে তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম বিয়ে করতেই পারে। সমাজের চোখে যা ‘ব্যভিচার’, তা তো সে করছে না। আইন বা ধর্মে কিন্তু ডিভোর্স দিয়ে এভাবে বিয়ে করাতে বাধা নেই। সব বাধা আমাদের মনে।

সমাজবিজ্ঞান বলে মানুষ সমাজবদ্ধ জীব, মানুষ একা থাকতে পারে না। অনন্তকাল ধরে মানুষ সঙ্গী খুঁজে নিয়েছে। সঙ্গী থাকা মানেই সেক্স না, বা রিপ্রডাশন না। সঙ্গী থাকা মানে আশ্রয়, বন্ধুত্ব, নির্ভার হওয়া, শেয়ারিং, দিনশেষে ঘরে ফেরার আনন্দ যে কেউ আমারও জন্য অপেক্ষায় আছে।

একটা কথা এখন আমার খুব মনে হয় যে মনের কখনো এজিং হয় না। শারীরিকভাবে এজিং হলেও, মন বিশের কোঠায়ই রয়ে যায় বেশিরভাগ মানুষের। তাই আত্মা অবিনশ্বর। দেহের ক্ষয় আছে। তাই হয়তো থুরথুরে বুড়ো হলেও কাপড়ের রং আর মনের রং কখনো ফিকে হয়ে যায় না। শুধু অভিজ্ঞতা বাড়ে, চুল সাদা হয়, চামড়া কুঁচকে যায়, জরা আসে। কিন্ত মনের দুনিয়া রঙিনই থেকে যায়।

সেই হিন্দি গানের মতো –

দিল তো বাচ্চা হ্যায় জী,
থোরা কাচ্চা হ্যায় জী

শেয়ার করুন:
  • 741
  •  
  •  
  •  
  •  
    741
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.