আপনার মা একা নয়তো?

কাজী সাবরিনা তাবাস্সুম:

প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরেই একটা বিষয় খুব অবহেলিত এবং অনেকটা গোপনীয় ! কেন ? তার উত্তর কেউ গুছিয়ে দিতে পারেনা । কারন আলোচিত বিষয়টির আসলেই কোন উত্তর আমাদের জানা নাই।
আমরা শুধু দেখে যাই, হজম করে যাই, একসময় মরে যাই। আমাদের সন্তানরাও তাই করে যা আমরা করি। দেখেও না দেখার ভান! আমরাই যে শেখাই তাদের। আমরা শিখেছি আমাদেরই আগের প্রজন্মের কাছে। চক্রাকারে ধারাটি চলছে তো চলছেই!
কী সেই ধারা? কী সেই বিষয়?

তাহলো – আমাদের মায়েদের যেন কোনো চাহিদা থাকতে নেই, শখ, আহ্লাদ, সাধ থাকতে নেই! তাঁদের যেন নিজের মনের কথা কারও সাথে শেয়ার করতে নেই! মায়ের যেন কাজ একটাই, পরিবারের সবার ইচ্ছেগুলো মনে রাখা। সেগুলো সফল করতে নিজেকে সঁপে দেয়া।
হোক সেই মা চাকুরিজীবী অথবা গৃহিনী! ডিভোর্সি অথবা বিধবা! সূত্র একটাই- “সবার খেয়াল রাখো”
আর নিজের খেয়াল? নিজের মনের খোরাক? নিজের কোন চাহিদা?

সেই প্রশ্ন অবান্তর।
এই আপনি, আমি, আমরা, খুব তো বলি যে আমি আমার মাকে ভীষণ ভালবাসি! ভালবাসাটা কিন্তু সত্যিই থাকে। তাতে আরও থাকে মায়ের পছন্দ অপছন্দের দিকে খেয়াল রাখা, মাকে একটুখানি সময় দেওয়া, মায়ের কাছে বায়না ধরা, সবই।

কিন্তু আমরা কি কখনও চিন্তা করেছি, নিজে থেকেই মায়ের খেয়াল রাখার অজুহাতে মায়ের আসল ইচ্ছে বা চাহিদাটা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে না তো? মা নিজ থেকে মুখ ফুটে আবদার করার স্বাধীনতাটা হারিয়ে ফেলছে না তো?
বাঙালি সমাজ বলুন আর বৈশ্বিক; সংখ্যাগরিষ্ঠ সকল মায়েরাই কিন্তু নিজেদেরকে চাহিদাশূন্য হিসেবে দেখাতে ভালবাসে। এর কারণও আছে। পুরো পরিবারের সব চাহিদা, স্বপ্নগুলোকে মাথায় রাখতে রাখতে নিজেরটা হারিয়ে যায়। সেটাই স্বাভাবিক। কিছু উচ্চাকাঙ্খি আত্মবিশ্বাসী মায়েরা অনেক সময় দমে যেতে চান না। কিন্তু মাতৃত্বের কাছে, স্বামীর কাছে, নিজের দায়িত্বটুকু তো আর এড়াতে পারেন না। অতএব ইচ্ছেটাকে তুলে রাখেন আগামী দিনের জন্য।

আফসোস! সেই আগামী দিনটি কখনোই আসে না।
দিনশেষে আমরা পরিবারের অন্য লোকগুলো সবাই সবার মতো ব্যস্ত হয়ে যাই, নিয়ম মেনে মাকে ফোন করি, খোঁজ নেই, জন্মদিনে মায়ের পছন্দের বইটি গিফ্টও করি, কিন্তু বোঝার চেষ্টাও করি না যে ভেতরে ভেতরে কতোটা নিঃসঙ্গ দিন কাটাচ্ছেন মায়েরা।

একজন মা একইসাথে স্ত্রীও বটে। সুতরাং যখন একজন মায়ের একাকিত্ব নিয়ে কথা ওঠে, স্ত্রী হিসেবেও তাঁর একাকিত্ব ফুটে ওঠে। স্ত্রীর এই একাকিত্বকে কিন্তু প্রলুব্ধ করছে তারই ভালবাসার স্বামীটি। মনের অজান্তেই অবাধ ভালবাসায় এমনভাবে বেঁধে রাখেন তাঁর স্ত্রীকে, যেসব ইচ্ছে বা স্বপ্নপূরণে স্বামী কিংবা পরিবারে একটু অনিয়ম হবার আশংকা থাকে, স্ত্রীটি পিছিয়ে যান। পরম ভালবাসার স্বামীটি জড়িয়ে ধরে কী ভীষণ শান্তির ঘুম দেন, স্ত্রীটি কেবল নির্ঘুম রাতের গভীরতায় হঠাৎ হঠাৎ একা বোধ করেন। ভয়ংকর একা!

সেই একাকিত্ব আরও গভীরে পৌঁছায় যখন দুর্ভাগ্যবশত স্বামীটি মারা যায়। অথবা পরম সুখের সংসারে কালো ছায়ার ধাক্কায় মনের অমিল, মতের অমিল হতে হতে সেপারেশান হয়ে যায়!
কোন না কোনভাবে স্ত্রীটি সন্তানদের আগলে রাখেন। জীবনের প্রয়োজনে নিজের একটা গতি করেও ফেলেন। সমাজ তাঁকে বাহবা দেয়। তিনি সবার জন্য একটা উদাহরণ হয়ে ওঠেন। তারপর সমাজের লোকগুলো যে যার নীড়ে ফিরে যায়। জীবনের ঘানি টানতে টানতে শেষ জীবনে স্ত্রী কিংবা মায়ের একাকিত্বটা আর কেউ বোধ করে না! বৃদ্ধ হতে হতে পুরো জীবনের না পাওয়া চাহিদাগুলো মাঝে মাঝে মনকে এতোটাই বিষিয়ে তুলে, মুখে শব্দটিও করেনি কোনোদিন, সেরকম নারীটিও বৃদ্ধবয়সে পাগল হয়ে যায়! আবোল তাবোল বকতে থাকে, মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে আরও কত কী!

আমারই অতি পরিচিত একজনকে দেখেছি, অকালে স্বামী হারিয়ে একা হাতে লড়াই করে মানুষ করেছেন ছয় ছয়টি ছেলে মেয়েকে । সন্তানেরা যখন পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত , মায়ের জন্য ভালবাসা মমতা দেখিয়েছে সাধ্যমত । মায়ের যেন কোন কষ্ট না হয় , সেইজন্য খেয়াল রেখেছে সর্বদা ।
কিন্তু ভদ্রমহিলার কপালটা হয়ত সুখকর ছিলনা। মৃত্যুর বছর দুয়েক আগে ডিমেনশিয়ায় ( স্মৃতিভ্রংশ ) ভুগে বেজায় কষ্ট পেয়েছেন । নিজের চাপা কষ্ট কিংবা চাহিদা ছিল কিনা কে জানে ; সব সময় মৃত স্বামীকে আশেপাশে দেখতেন আর যাচ্ছেতাই বলে বেড়াতেন!

সবাই বুঝেছিল তাঁর হুঁশ নেই; কিন্তু যে স্ত্রীটি সংসার জীবনে স্বামীকে উজাড় করে ভালবেসেছেন, স্বামীর ভালবাসার প্রশংসায় মেতেছেন , তিনি শেষ বয়সে এ কি বলছেন ! হয়ত খুব বেমানান , কিন্তু আদতে তা নয় ! বৃদ্ধাটির হয়ত অনেক কিছু বলার ছিল , অভিযোগ ছিল , আকাঙ্খা ছিল , পরিবারের কথা চিন্তা করতে করতে নিজের মনের গহীনে লুকিয়ে রেখেছিলেন নিজের কথা । আজ যখন সন্তানদের চিনতে পারছেননা, না বলা ঐ কথাগুলো গিলে খাচ্ছে তাঁকে । নিজের অস্তিত্ব যদি মেলে ধরার সুযোগ পেতেন , তবে হয়ত এত অভিমান জমতোই না !
এ সমাজের প্রতিটি ঘরে ঘরে এই চিত্র ! আমার মায়ের মনের চাপা কষ্টটি আমি জানিনা ! কখনো জানার চেষ্টাও করিনা । আমার মায়ের সর্বক্ষন হাসিমুখে আমি প্রশান্তি খুঁজে পাই। আমি হাসতে হাসতে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাই!

কিন্তু হঠাৎ এতো কথা কেন ? কারণ এই আমরাই হুট করে সমাজে কোনো মা কিংবা স্ত্রীকে তার নিজের চাহিদা মতো একটা কাজ করতে দেখলে ক্ষেপে যাই! সোশ্যাল মিডিয়া, যেখানে আমাদের নিজস্ব এ্যাকাউন্টে আমরা যা ইচ্ছে তা বলার অবাধ অধিকার রাখি, সেখানে কোমর বেঁধে হাস্যকর সামাজিক আন্দোলনে নেমে পড়ি !

উদাহরণ হিসেবে বলা যায় একজন ডিভোর্সি পঞ্চাশোর্ধ আত্মনির্ভরশীল নারী কেন দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছে সেই সংবাদ আমরা অনেকেই মেনে নিতে পারিনি। যদিও আমজনতার মেনে নেওয়া না নেওয়া নিয়ে আলোচিত ভদ্রমহিলার কিছুই যায় আসে না ! তবু বিষয়টার গভীরে গেলে বোঝা যায় তাঁর সন্তানেরা নিজ নিজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত, ব্যস্ত ! দিনশেষে মা’টা যে বড্ড একা !

হয়তো তাঁর ওই একাকিত্বের ওষুধ একজন সার্বক্ষণিক সঙ্গীর চাহিদা ! আমরা যেন বুঝেও বিষয়টি বুঝি না! জেনেও না জানার চেষ্টা করি ! নিজেদের খুব প্রগতিশীল নাগরিক দাবি করি। আমরা কখনোই বুঝতে পারি না বয়স যত বাড়ে মানুষ তত নিঃসঙ্গ হয়ে যায়। একাকিত্ব রোগটি প্রচণ্ড মারাত্মক। পুরো জীবনের সব ত্যাগ মিথ্যা হয়ে যায় এই রোগের কাছে !

আমি বলছি না সব মানুষের একাকিত্বের ওষুধ “সঙ্গ”! ব্যক্তিভেদে চাহিদা, মনের খোরাক,  স্বপ্ন সব কিছুই ভিন্ন হবে। আমি শুধু বলতে চাই, মায়ের আকুতিটি শুনুন। মাকে বোঝান যে তিনি স্বাধীন। তাঁর যে কোনো সিদ্ধান্তে বাহবা দিন। যে মায়ের গর্ভে আপনার জন্ম, সেই মায়ের সিদ্ধান্ত আপনার কাছে ভুল ঠেকে কীভাবে?

একবার মনে করে দেখুন তো, আপনি যেভাবে মায়ের কাছে গিয়ে নিজের দুঃখটা খুলে বলেন, আপনার বাবা যেভাবে অফিসের ঝামেলা আপনার মায়ের সাথে শেয়ার করে হালকা হয় , আপনার মা কি আপনাদের কারো সাথে নিজের কোন কষ্ট বা অভিমান এভাবে শেয়ার করেছে? অধিকাংশ মায়েরা এটা নিজ থেকে করবে না, তাঁদের কাছ থেকে মনের কথাটি আদায় করতে হবে। তাঁদের বোঝাতে হবে , তাঁদের কথাও শুনতে আমরা প্রস্তুত। হয়তো তখন আর তিনি একাকিত্বের ভারে নুয়ে পড়বেন না।

সাধুবাদ জানান প্রতিটা স্ত্রী এবং মায়েদের । তাঁদেরকে অতিরিক্ত ভালবাসার ভারে হারিয়ে যেতে দিবেন না । কারন কাল আপনি যদি কোন কারনে আগের দিনের মত ভালবাসতে না পারেন , মা কিংবা স্ত্রী কিন্তু তার দায়িত্বটি পালন করেই যাবে। তাই তাঁদেরকে তাঁদের নিজেদের জন্য ভাবার সুযোগ করে দিতে হবে আমাদের।

বিশ্বাস করুন, আমরা সুযোগ না দিলে তাঁরা নিজের জন্য নিজের পছন্দের কিংবা শখের একটা কাজও খুঁজে বের করবে না। মায়েরা যে প্রচণ্ড আত্মাভিমানী হয়!

বেলাশেষে আমার কথাটি শুধু আপনাদের জন্যই নয়; আমার নিজের জন্যও! একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন, আমরা সবাই পাশে থাকা সত্ত্বেও আমাদের মায়েরা কি একাকিত্বের ধাক্কায় কুঁকড়ে যাচ্ছে?
আমরা সন্তানেরা কিংবা স্বামীরা চাহিদা থেকেও বেশি ভালবাসা আর সম্মান দেই আর না দেই, আমাদের উচিত মা কিংবা স্ত্রীদেরকে নিজের জন্য একটু সময় বের করাতে উদ্বুদ্ধ করা। তাঁর নিজের কোন সাধ আহ্লাদ যাতে মন খুলে বলতে পারে তাঁর পরিবারের লোকদের। যেন পৃথিবীর প্রতিটা নারী গভীর রাতে পরিবারের সবার ঘুমের পর নিজেকে একা ভাবতে ভাবতে একা হয়ে না পড়ে! সে তো একটা আলাদা সত্ত্বা। সারাক্ষণ কেন সে নিজেকে ভুলে শুধু পরিবার আর সমাজের কথা ভাববে বলুন তো?

শেয়ার করুন:
  • 315
  •  
  •  
  •  
  •  
    315
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.