কেন তোমাকেই বলে?

শাহরিয়া দিনা:

কেন তোমাকেই বলে? এই কথাটা জীবনে অনেক মেয়েই শুনে থাকে। শুনতে শুনতেই বড় হয়। বড় হলেই বলা থেমে যায় এমন না, বরং প্রশ্ন তোলা হয়:

১. কেন কেউ তোমাকে প্রপোজ করে? কই তোমার বয়সী অন্যদের বেলায় তো হয় না এমন! অবশ্যই এক্ষেত্রে তোমার দোষ।
২. কেউ কেন তোমার সাথে ফ্রেন্ডশিপ করার জন্য পাগলামি করে? কী এমন রূপবতী/গুণবতী তুমি? হুহ্!
৩. তোমারে মানুষ কেন পাম দেয়? কী এমন তুমি? আসলে বুঝতে পারে তোমার থেকে কিছু আদায় করা সম্ভব।
৪. তোমার বন্ধুদের স্ত্রী’র সন্দেহের তালিকায় কেন তুমি থাকো? অন্য বান্ধবীদের বেলায় তাদের বউয়েরা এমন চোখে তো দেখে না! সমস্যা তো তোমার মধ্যে।

এমন সব প্রশ্ন আমাদের আপনজনদের।

আসুন দেখি সমস্যা আসলে কার মধ্যে। সার্টিফিকেট থাকলেই সবাই শিক্ষিত হয় না এটা নিশ্চয়ই সবাই মানেন। এই সমাজে কিছু পরজীবী ধরনের মেয়ে যেমন আছে তেমনি কিছু সপ্রতিভ মেয়েও আছে। এই সপ্রতিভ মেয়েদের সব পুরুষ পছন্দ করে না, তেমনি সব নারীরাও খুব ভালোভাবে মানতে পারে না। নারী-পুরুষ শ্রেণিভেদ বাদ দিয়ে মানুষ হিসেবে বলি।

১.হ্যাঁ আমি সেই মানুষ, যাকে কথা বলার আগে এর গোপনীয়তা থাকবে কিনা তা ভাবতে হয় না।

২. আমি সেই মানুষ, নির্দ্বিধায় যার কাছে জীবনের কঠিন লজ্জা কিংবা অপমানের ঘটানাটা বলে হালকা হওয়া যায়। সে কখনও খোটা দিবে না, ছোটও করবে না এই নিয়ে।

৩. আমি তেমন মানুষ, যার অন্যের লাইফ স্টাইল নিয়ে মাথাব্যথা নেই। তোমার জীবন তোমার, আমার জীবন আমার। যা তোমার জন্য নির্ধারিত, যা তোমার অর্জন তাতে আমার ঈর্ষা নেই, নেই কোন অভিযোগ। আমি আমার নুন-ভাতে অভ্যস্ত।

৪. আমার কাছে বন্ধুত্বের কোন জেন্ডার নেই। যে মেয়েটা আমার কাছে শৈশবের না বুঝবার সময়ে আপনজনের কাছে মলেস্ট হবার কথাটা বলতে পারে, তেমনি আমি জানি আমার ছেলে বন্ধুটা কোথায় বলাৎকারের শিকার হয়েছিল।

৫. কখনও কারও বাড়িতে বেড়াতে যাবার মতো সময় সুযোগ হয় না। চা-কফি শপে আড্ডা দেওয়াও হয়ে উঠে না, ফলে সামনাসামনি দেখা হলে গোপন ক্ষতটি বলেছিলাম বলে কোন প্রকার বিব্রতকর অবস্থায়ও পড়তে হয় না।

এখন এসব কারণে কেউ আপন ভাবলে, অন্যদের চেয়ে ব্যতিক্রম মনে করলে, সম্মান দিলে, আগ্রহী হলে সেটাতে আমার সমস্যা কী? আমি তো কোনো অন্যায় করছি না বা কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছি না। এমনও না সেধে সেধে কারো ব্যক্তিগত কাহিনী শুনতে চাচ্ছি। তবু কেন বলে? কেন আসে?

এই প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত প্রত্যেকটা মানুষেরই একান্ত মনের একটা আশ্রয়ের দরকার হয়। নিজস্ব কিছু কথার, আবেগের ভার বহন সবসময় সম্ভব হয় না। এই রুটিন মাফিক ব্যস্ততার জীবনে মানুষ হাঁপিয়ে উঠে। তখন একটা শান্তির জায়গা চাই। নির্ভরযোগ্য একটা মনের আশ্রয়। যার ঘরে-পরিবারে এমন আশ্রয় আছে তার কাউকে খুঁজতে হয় না। কেউ কেউ মানসিক পরিপক্কতায় নিজেই হয়ে উঠেন নিজের আশ্রয়। নিজের ভেতর তৈরি করে নেয় একটা স্বচ্ছ জলের দীঘি। যেখানে ইচ্ছেমতো ভাসে অথবা সাঁতার কাটে অহর্নিশি।

অর্থনীতিতে একটা টার্ম আছে প্রদর্শন প্রভাব। সহজ ভাষায়, একজনের ভোগব্যয় সমাজের অন্যান্যদের ভোগব্যয় দ্বারা প্রভাবিত হলে তাকে বলা হয় প্রদর্শন প্রভাব। এই প্রদর্শন প্রভাব এখন নিয়ন্ত্রণ করছে আমাদের মস্তিষ্কের অনেকটা। ফলে আমরা একজন এই রেস্টুরেন্টে খেতে গেছে বলে আমারও যেতে হবে, সে ওখানে ঘুরতে গেছে বলে আমারও যেতে হবে, তিনি এভাবে ছবি তুলে আপলোড দিয়েছে, তাই আমারও তাই করতে হবে। এমনকি সেক্সুয়াল লাইফেও পর্নের প্রভাব যোগ হচ্ছে। আসলেই ঐ জায়গাটায় যাওয়ার মতো সময় আমার আছে কিনা, সেই রেস্টুরেন্টে খাওয়ার মতো যথেষ্ট সামর্থ্য আছে কিনা বা ঐ স্টাইলের ছবিতে আমাকে মানাচ্ছে কিনা সর্বোপরি, আমি উপভোগ করছি কিনা সেটা ভাবি না। নিজের এই প্রদর্শন প্রভাবজনিত উদ্ভুত চাহিদাটা একা পূরণ সম্ভব হয় না ফলে অন্যের উপর জোর খাটাই। এতে অন্যরা সমান উৎসাহিত হবে এমন না। ফলাফল সম্পর্কে তিক্ততা।

কিছু ব্যাপার যেমন অন্যকে বোঝানো যায় না, তেমনি বোঝা বয়ে বেড়ানোও সম্ভব হয় না। উন্নত দেশগুলোতে যা হয়, মানসিক ডাক্তারে কাছে চলে যায় মানুষ। কাউন্সিলিং করে। পয়সা দিয়ে সময় কিনে মনের ভেতর জমে থাকা বিষাক্ত জিনিস উগড়ে দিয়ে নিজের মনের পাথরটাকে হালকা করে আসে। আমাদের এখানে মানসিক ডাক্তারের কাছে কেউ গেছে শুনলে নেতিবাচক ভাবা হয়। এককথায় পাগল বলে দেয়। অথচ শরীরের মতো মনের স্বাস্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ।

এইতো সেদিনই রিপোর্টে দেখা গেল, এই দেশের দুই কোটি মানুষ মেন্টালি চ্যালেঞ্জড। যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংখ্যাটা আরও বেশি। অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণতা, অন্যের লাইফস্টাইলে ঈর্ষাকাতর হওয়া ইত্যাদি আমরা তেমন পাত্তা না দিলেও তা জীবন দুর্বিষহ করার জন্য যথেষ্ট।

কিছু মানুষের সাথে কথা বললে মনে হয় সময় কত দ্রুত যায় আর কারো সামনে বসলে মনে হয় সময় থমকে গেছে অনন্ত নক্ষত্রবিথীতে। একজন সপ্রতিভ রসবোধ সম্পন্ন মানুষ সঙ্গী হিসেবে যে কারোরই কাম্য। দিনশেষে রুপ-গুণ বিচার-বিশ্লেষণ করে আর যাই হোক, হিংসুক, পরনিন্দাকারী, পরচর্চাকারী কারোরই ভালো লাগে না। ঘৃণার চাইতে ভালোবাসা শক্তিশালী। নিজের জন্য, নিজের ভালো থাকার জন্য অন্যের পিছনে না লেগে নিজেকেই নিজের দায়িত্ব নিতে হয়।

প্রতারককে পাহারা দিয়ে রাখা যায় না, তাহলে জেলখানায় এতো আসামী থাকতো না। কারো পাহারাদার হবার জন্য আপনার জন্ম হয়নি, আপনার জন্ম হয়েছে নিজের জীবনটাকে যাপন করার জন্য। সেই জীবন-যাপনে মানুষ মাত্রেই একে-অপরের উপর নির্ভরশীল, কিন্তু সেই নির্ভরতার একটা মাত্রা থাকবে। নিজে কারো উপর এতোটা নির্ভর করার আগে ভাবতে হবে নিজেকে আমি কতটা নির্ভরযোগ্য গড়ে তুলতে পেরেছি। আপনি মানুষ, আপনি অনন্য, তাই ভাবুন নিজেকে নিয়ে। অন্যের প্রতি আঙুল তুলে নয় বাঁচুন মাথা উঁচু করে।

শেয়ার করুন:
  • 42
  •  
  •  
  •  
  •  
    42
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.