স্ববিরোধ কারাবাস

কাজী শবনম:

১ম পর্ব

সজল হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো, “আম্মা, আমার বাচ্চা কই?”
হাসিনা বেগম স্যান্ডেল ছুঁড়ে মারতে মারতে, “শুয়োরের বাচ্চা”…
সজল: মানে কী! এতো বড় হয়ে গেছি, এখনও স্যান্ডেল চালাও!!
হাসিনা বেগম: স্যান্ডেল চালাইয়াও তো মানুষ বানাইতে পারলাম না। বউটার ডেলিভারি… হাসপাতালে নিতে হইবো… রক্ত যোগাড় করতে হইবো…কত ঝামেলা…।
শুয়োরের বাচ্চা, ফোন বন্ধ কইরা বন্ধু-বান্ধব নিয়া মদ গিল্লা কই পইরা ছিলো, কে জানে! কোন কুক্ষণে যে তর মতো কুলাঙ্গার জন্ম দিসি!

সজল: আরেহ না। মদ খাই নাই। আমি কি দিন রাত মদ খাই নাকি! তুমি আর মৌমিতা মিল্লা তো আমারে ট্রেড মার্কড মাতাল বানায় দিছো। এমনিই ক্লাবে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আড্ডা দিতেছিলাম। ফোনের চার্জ শেষ হয়ে কখন যে বন্ধ হয়ে গেছে খেয়াল করি নাই। আড্ডা দিতে দিতে ক্লাবেই ঘুমায় গেছি। আশ্চর্য, তোমরা আমারে একটা খবর দিবা না! আমার বাচ্চাটারে সবার প্রথমে আমি কোলে নিতে চাইছিলাম… কই আমার বাপধন কই?

ছেলেকে কোলে নিয়ে মাকে বলছে, “দেখো, ঠিক আমার মতন হইছে দেখতে। আমার মতন চোখ, নাক… তাই না আম্মা? এরে আমি ক্রিকেটার বানামু।
… নাহ, অর যা ভাল্লাগে তাই হইবো, বাঁধা দিমু না।
ও স্বাধীনভাবে বড় হইবো”।

হাসিনা বেগম: এহ্ এতোক্ষণে আসছে বাপের দাবি নিয়া! স্যান্ডেল দিয়া দেওন দরকার তরে। পুরাডা জিন্দেগী আমার কলিজা ভাজা ভাজা কইরা খাইছে, এখন বউয়ের কলিজাডা…

সজল: এইতো আম্মা, এক্কেবারে ১৯৬২ সাল থেকে শুরু কইরা দিলা!
ছেলেকে কোলে নিয়ে খুশিতে আত্মহারা সজল। হঠাৎ মনে পড়লো মৌমিতার কাছে একবারও যাওয়া হয়নি। ওর সামনে দাঁড়ানোর মুখও অবশ্য নেই। যেই ব্লান্ডার করে ফেলেছে, সহজে মাফ পাওয়া যাবে না।
মৌমিতা ওর মতন চিতকার করে গালি গালাজ করে না, কিন্তু কোনো কিছু সহজে ভুলেও না, কষ্ট পুষে রাখে মনে।

সজল: (ইতস্তত করে)…ফোনের চার্জ শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে গেছিলো… সরি, ঐ সময় তোমার পাশে থাকা উচিত ছিলো… মাফ কইরা দাও প্লিজ…
মৌমিতা হাতের মুঠো শক্ত করে চোখের পানি আটকালো। কিছুতেই কাঁদবে না ও।
একবারের জন্যও সজলের দিকে তাকায়নি।
উঠে বসতে গিয়ে ব্যথায় কুঁকড়ে গেলো মৌমিতা।
সজল ধরতে গেলে হাত ছাড়িয়ে নিলো।
মৌমিতার কষ্ট দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেলো সজলের।
অপরাধী লাগছে নিজেকে।

হাসিনা বেগম: দে, বাবুরে দে। অর ক্ষুধা লাগছে।
সজল মৌমিতার কোলে বাবুকে দিয়ে অপেক্ষা করছে।
কেমন যেনো একটা টান অনুভব করছে বাচ্চাটার জন্য… এমন টানতো কখনো বাবা, মা, বউয়ের জন্য অনুভব করেনি। মনে হচ্ছে এক মুহূর্তের জন্যও বাচ্চাটাকে নিজের থেকে আলাদা না করে…
বাবুকে ফিড দেয়া শেষ হতেই সজল মৌমিতার কোল থেকে ছোঁ মেরে নিয়ে গল্প করা শুরু করলো ছেলের সাথে। সোফায় হেলান দিয়ে শুয়ে বাবুকে বুকের মধ্যে নিয়ে কত কথা যে বলছে… আর বাবুও আরাম করে বাবার বুকে ঘুমাচ্ছে।
সারাদিন নাওয়া খাওয়া নেই, বাবুকে কোলে নিয়েই পরে থাকলো। মনে হচ্ছিলো এই তাবত সংসারে ও আর ওর ছেলে ছাড়া আর কেউ নেই।
বিকেল থেকেই আত্মীয়স্বজনরা বাচ্চা দেখতে আসতে লাগলো।
একটা কাজ সজল খুব ভালো পারে, যে কোনো বিষয়ে জ্ঞান কপচানো।
রাজনীতি, পরিবেশ,খেলাধূলা, সাইকোলজি সব বিষয়ে লম্বা লম্বা লেকচার দিতে পারে। সেই লেকচার শুনে অল্প বয়সী ছেলেপেলে উনার ফ্যান হয়ে যায়।
খুব সুন্দর করে গুছিয়ে জ্ঞানের কথা বলে, উপদেশ দেয়। একদিন মৌমিতা বলেছিলো, “এইযে এতো জ্ঞানের বাণী/উপদেশ দেন, নিজের লাইফে এগুলো এপ্লাই করেন না কেন!”
নির্লজ্জের মতোন সজল বলেছিলো, “গাভী কভূ নাহি করে নিজ দুগ্ধ পান”

ওর সেই জ্ঞানের লেকচার শুনে কেউ বুঝবে না এই মানুষটা সারাদিন খায় আর ঘুমায়।
…আর বিগ বাজেটের বিজনেসের প্ল্যান করে। কোনোটাই কোটি টাকার নিচে না।
আজ অনেকক্ষণ তেমন লেকচার শুনে, বড় মামা আর সহ্য করতে পারলো না। ” এইযে এত লম্বা লম্বা লেকচার দেন, নিজে কিছু কাজ-টাজ করার কথা চিন্তা করছেন নাকি এইভাবেই জীবন পার করে দিবেন?”

সজল: এইতো মামা, খুব শীঘ্রই বিজনেস স্টার্ট করবো। এইবার যেই প্ল্যানটা করছি, সেইটা ইমপ্লিমেন্ট করতে পারলে রাতারাতি বিজনেস দাঁড়ায় যাবে। ইনিশিয়ালি কিছু টাকা লাগবে বাট একবার বিজনেস দাঁড়ায় গেলে ইনভেস্টররা ফান্ড নিয়ে আমার পিছনে ঘুরবে।
বড় মামা: আচ্ছা। আর মাঝরাতে যে বাসায় ফিরেন, পুলিশ মামারা ধরলে এই বড় মামাকে দয়া করে কল দিয়েন না, ঠিক আছে?

সজল: মামা, কী যে বলেন! ঠোলাদের এতো সাহস আমাকে কিছু বলবে!!
ও.সি., ডি.সি., মন্ত্রী-মিনিস্টার পকেটে নিয়ে ঘুরি।
শুধু আমার পাওয়ার শো অফ করি না। নাইলে…
বড় মামা: (রাগে দাঁত কড়মড় করতে করতে) তুই কি আমার সামনে থেকে যাবি নাকি বেল্ট খুলবো আমি?
সজল উঠে রান্নাঘরে গিয়ে মাকে বললো, “সারাজীবন এই কাজটাই করছো! নিজে যখন না পারো, ভাইরে ডাকো আমার বিচার করতে। পারছো আজ পর্যন্ত আমারে বদলাইতে! পারবাও না কোনোদিন।
তোমার উপর জিদ কইরা আমি আজকে এমন হইছি। ক্রিকেটার হইতে চাইছি। ডাক্তার বানাইতে চাইয়া দিন রাত পড়ার টেবিলে বসায় রাখছো।
জিদ করছি; তুমি মারছো।
নিজে না পারলে ভাইরে ডাক দিছো।
আমি আরো বেশি জিদ করছি।
নিজের লাইফ শেষ করছি।
পারছো আমারে সুবোধ বালক বানাইতে?”

হাসিনা বেগম: বাপ ঢাকা শহরের বুকে একটা তিনতলা বাড়ি রেখে গেছে বলে আপনার পেটে দানা পড়ে আর সেই দানা খেয়ে শক্তি বানায় আমার সাথে চিৎকার করতে আসেন। বাড়ি ভাড়াটুকু না থাকলে রিকশা চালাইতে হইতো আপনার। আর আমার উপর জিদ কইরা নিজের লাইফ শেষ কইরা কী বুদ্ধিমানের কাজটাই না করছেন!

সজল: শালা! থাকমুই না এই বাসায়।
বলে ধরাম করে দরজা বন্ধ করে বাইরে চলে গেলো সজল। নিচে নেমেই মনে হলো, “আমার বাচ্চা”!!
ধড়মড় করে সিঁড়ি দিয়ে উপড়ে উঠে বাচ্চাকে কোলে তুলে নিলো।
কত কথা ছেলের সাথে… মনে হয় এই একটা জায়গা যেখানে কেউ ওকে কাজ না করার জন্য কথা শোনাবে না…দায়িত্ব নিতে বলবে না…শুধু ওর সাথে গল্প করবে…ওকে ওর মতোন থাকতে দিবে।
ছেলেকে কোলে নিয়ে সোফায় হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো সজল।
রাত ৯ টায় ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো।

সজল: হ্যালো
বন্ধু: ক্লাবে আইবি?

সজল: হালার পো হালা! তগো মাথা ঠিক আছে? তগো পাল্লায় পইরা ঐদিন এতো বেশি খাইয়া সারা রাত বেহুঁশ পইড়া আছিলাম। আত্মীয়স্বজনরা আমার বউরে হাসপাতালে নিছে। বাচ্চার মুখ দেখলাম একদিন পরে।
আগামী কয়দিন বাসা থেকে বের হওয়া যাইবো না।
বন্ধু: হ, এখন তো তুই পুরা দস্তুর সংসারী মানুষ। তরে আর আমরা পাইছি!
সজল: কী কস এগুলা! বন্ধুগো লিগা আমার জান হাজির। তরা এইডা ভালো কইরা জানোস।
বন্ধু: না, ঠিক আছে, বউ বাচ্চারে টাইম দে। ঐ শফিক আসছে আরকি…অস্ট্রেলিয়া থেকে। আমরা সবাই ক্লাবে যাইতেছি। যেই জিনিস আনছে রে ভাই! চ্যাটরুমে ছবি দেখ। বোতল খুলতে যাইতেছি আমরা। তুই থাক, ফ্যামিলিরে টাইম দে।
সজল: উরিব্বাস, কী জিনিস আনছে। হালার পো হালা, তগো আজকেই বোতল খুলতে হইবো! ছবি দেইখা তো মাথা নষ্ট। খাড়া, আইতাসি।
বন্ধু: কেমনে আইবি? বাসায় ম্যানেজ করবি ক্যামনে?
সজল: মৌমিতা তো কথা কওয়াই বন্ধ করে দিছে। রাগ একটু না কমা পর্যন্ত মাফ চাওয়ার অবস্থাও নাই। আর আম্মা তো আম্মাই! ফাপড় দিয়া বাইর হইয়া যাইতে হইবো আরকি। ঝামেলা করলে ঐ পুরান থিওরি, পায়ে পাড়া দিয়া ঝগড়া বাঁধায় বাইর হইয়া যামু। দোষ দিমু উনার উপর।
বন্ধু: আয় তাইলে।
সজল: কামিং বাডি! পার্টি হবে পার্টি!!

পর্ব – ২

বিশাল সাইজের একটা লাউ, চারটা বাচ্চা মুরগি, হরেক রকম সবজি আর ফলমূল নিয়ে, দোয়া-দুরুদ পড়ে বুকে ফুঁ দিয়ে, দুইদিন পর সজল বাড়ি ফিরলো। চাইলে আগেই ফিরতে পারতো। ইচ্ছে করেই পুরো হ্যাংওভার দূর করে দুইদিন পরে সুফি বেশে বাড়ি ফিরেছে। এখন অনেক কাজ করতে হবে বাড়ির পরিস্থিতি নরমাল করতে। ঠাণ্ডা মাথায় হাসিমুখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এই ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত সজল। বাড়ির কার মন কীভাবে গলানো যায় এটা ওর খুব ভালো জানা।
একটা লম্বা সালাম দিয়ে বাসায় ঢুকলো সজল।
হাসিনা বেগম কোন উত্তর দেয় না।

সজল: আম্মা, সালাম দিছি তোমাকে।
হাসিনা বেগম রাগে, ঘৃণায় ছেলের দিকে তাকাচ্ছে না।

সজল: আম্মা শরীর ভালো তোমার? দেখো কী কী আনছি বাজার থেকে। মৌমিতার এখন কী কী খাওয়া দরকার সেই অনুযায়ী এখন থেকে বাজার করা হবে এই বাসায়। লাউ পারলে তিনবেলা খাওয়াবা ওরে। সকালে লাউ ভাজি, দুপুরে লাউ দিয়ে বাচ্চা মুরগির ঝোল রান্না করে দিবা। ডালেও লাউ দিবা। মোটকথা, এখন থেকে লাউ আমাদের বাসার জাতীয় সবজি। কালোজিরা আনছি ১ কেজি। আমি একটু পর বেছে দিবো, গুড়া করে রাখবা। মৌমিতাকে এই কালজিরা ভর্তা রোজ খাওয়াতে হবে। আচ্ছা আম্মা, ব্লেন্ডার মেশিনটা কি ঠিক আছে? সব রকমের ফল দিয়ে জুস বানায় দিতে হবে মৌমিতাকে। বাবুকে প্রতিবার ফিড দেওয়ার আগে দুই গ্লাস, ফিড দেওয়ার পরে দুই গ্লাস ফ্লুইড নিতে হবে ওর। আর ঝাল একেবারেই দেয়া যাবে না তরকারিতে। তাহলে বাবুর গ্যাস হবে।
আচ্ছা… (ইতস্তত করে)… আম্মা, বাবু কি আমাকে খুঁজছিলো এই দুই দিন?

হাসিনা বেগম আর সহ্য করতে পারলো না। স্যান্ডেল মারলো ছুঁড়ে।
সজল: আম্মা, স্যান্ডেল মারো কেন! তোমার জন্য ডেউয়া আর লটকান আনছি। ডায়াবেটিক রোগীদের রোজ টক ফল খেতে হয়।

হাসিনা বেগম: শুয়োরের বাচ্চা… তুই যা আমার চোখের সামনে থেকে। আর তোর ওই মদখোর বন্ধুগুলিরে পাইয়া নেই, সবডিরে স্যান্ডেল দিয়া পিটামু। না নিজেরা সংসার করে, না আমার পোলাডারে সংসার করতে দেয়।
অবস্থা বেগতিক দেখে সজল অবস্থান বদলালো।

রুমে ঢুকে দেখে বাবু ঘুমাচ্ছে। ঘুমের মধ্যে কী সুন্দর করে হাসি দিচ্ছে। সজল অপলক তাকিয়ে রইলো। শার্টের হাতা দিয়ে চোখ মুছলো। থাক, বাবু একটু ঘুমাক। এই ফাঁকে মৌমিতার রাগ ভাঙ্গানোর চেষ্টা, আসলে বৃথা চেষ্টা করে দেখা যায়।
সজল: মৌমিতা শোনো, গতকাল সারারাত আমি গুগোল এ সার্চ করে তোমার জন্য ডায়েট চার্ট তৈরি করছি।
(মাকে দেওয়া সেই ভাষণ আবার রিপিট করলো) মৌমিতা এমন ভাব করলো যে এই ঘরে ও আর বাবু ছাড়া আর কেউ নেই। এতোক্ষণ ও কিছু শোনেনি। একেবারেই নির্বিকার। এইবার ও একটা সিদ্ধান্তে আসবে। রাগের মাথায় কখনও সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। তাই ও একেবারে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে নিজেকে।
সজল নিজের ব্যাপারে ওভার কনফিডেন্ট। যতকিছুই হোক ও ওর সারাউন্ডিং পিপলদের কনভিন্স করতে পারে। এইবার যদিও অপরাধ অনেক বড়, তারপরও ওর ম্যাজিক কেন কাজ করছে না তাতে বিরক্ত হচ্ছে ও। মেজাজ চিড়চিড়া হয়ে যাচ্ছে। মৌমিতা বাবুকে নিয়ে রাত জেগে ক্লান্ত। ব্যথাও আছে অনেক। সজলকে টোটালি ইগনোর করে ঘুমিয়ে পড়লো মৌমিতা। বেশ অনেক্ষণ সজল তাকিয়ে রইলো মৌমিতার ঘুমন্ত মুখের দিকে। এতো সুন্দর কোন মুখ কি ও দেখেছে এর আগে! কী কষ্টই না দেয় মেয়েটাকে! তাতে কী! ভালোও তো বাসে।

সজল রান্নাঘরে গিয়ে ডেউয়া ফল ছিলে প্লেটে করে নিয়ে মায়ের ঘরে গিয়ে বললো, আম্মা রোজ কোনো না কোনো টক ফল খাবা। আমি মনে করে নিয়ে আসবো।

হাসিনা বেগম: আগামীকাল কি আপনার মনে থাকবে যে আপনার একজন মা আছে?
সজল: কী যে কওনা আম্মা! রেস্টুরেন্টের ছাইপাশ খেতে খেতে পেটে চর পড়ে গেছে। তোমার হাতের ডাল চচ্চরি আর আলু ভর্তা দিয়ে ভাত খাইতে মন চাইতেছে। কতক্ষণ লাগবে রান্না করতে? আমি গোসল কইরা আসি, পেট ভইরা ভাত খামু আজকে। কতদিন তোমার হাতে রান্না খাই না…
হাসিনা বেগম: পাগল একটা… যা গোসল কইরা আয়। সজল মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো অনেক্ষণ। হাসলে মাকে কী যে সুন্দর দেখায়! অথচ মা হাসির সুযোগ পায় কই!

মেজাজ বারবার চিড়চিড়া হয়ে যাচ্ছে। মানলাম দোষ বড়, কিন্তু সব কিছুরই তো একটা মাফ আছে। মৌমিতাকে কিছুতেই কনভিন্স করা যাচ্ছে না। হাসবেন্ড-ওয়াইফের মধ্যে মান-অভিমান কমাতে ফিজিক্যাল রিলেশন সাহায্য করে। কিন্তু এখন তো মৌমিতা অসুস্থ। ওকে টেক কেয়ার করার চেষ্টা করে যাচ্ছে সজল, কিন্তু কাজ হচ্ছে না।
বাবু আর মৌমিতা বেশ অনেক্ষণ ধরে ঘুমাচ্ছে।
হাসিনা বেগম অনেকদিন পর ছেলেকে সামনে বসিয়ে খাওয়ালো। সজল মায়ের হাতের রান্নার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। খেতে খেতে মায়ের কাছ থেকে সংসারের যাবতীয় সমস্যা, জমি-জমার ঝামেলা, খুব আগ্রহ নিয়ে শুনছিল। বারবার মাকে বলছিলো, তুমি এগুলো নিয়ে টেনশন করে না তো, আমি দেখতেছি।
পুরোটা সময় হাসিনা বেগমের মুখে স্মিত হাসির রেখা ফুটে রইলো। এই বয়সে সন্তান যখন এইভাবে আশ্বস্ত করে, কোন মায়ের না ভালো লাগে।

এমন সময় ফোন বেজে উঠলো। বন্ধুদের কল।
সজল তাড়াতাড়ি লাইন কেটে ফোন অফ করে দিলো। হাসিনা বেগম রাগ হয়ে উঠে যাচ্ছিলো, এমন সময় সজল বললো, আম্মা মিষ্টি কিছু আছে ফ্রিজে? পায়েস, পুডিং? তোমার হাতের পায়েস তো অমৃত…
হাসিনা বেগম এক বাটি পায়েস দিল ছেলেকে। আসলেই ও অমৃত মনে করে খেলো।
এমন সময় কান্নার শব্দ শুনে ধড়মড় করে দৌড়ে ঘরে গিয়ে বাবুকে কোলে নিলো। সাথে সাথে বাবুর কান্না থেমে গেল।
সজল: পাপা ঘুম হইছে? ক্ষুধা লাগছে পাপা?
মৌমিতা তোমার জন্য দুই গ্লাস জুস করে রাখছি। আগে সেটা খেয়ে নাও, তারপর বাবুকে ফিড দাও। আমি আছি বাসায়, একটু পর পর কোন না কোন ড্রিংক তৈরি করে দেবো তোমাকে। ডাইনিং টেবিলের উপরে জুস রাখছি, খেয়ে আসো। আমি ততক্ষণে বাবুর সাথে একটু গল্প করি।
মৌমিতা কর্পোরেট জব করে, ৯-৬ অফিস টাইম হলেও ফেরার পথে বাজার করে, পাবলিক ট্রান্সপোর্টে করে বাড়ি ফিরতে ৮-৯ টা বেজে যায়।
সারাদিন এতো পরিশ্রম করে বলে হাসিনা বেগম মৌমিতাকে ঘরের কোন কাজ করতে দেয় না। এখন তো অসুস্থ, আরও দিবে না।

সজল খেয়াল করে দেখলো, মৌমিতা বাবুকে ফিড দেয়, বাবুর সাথে ঘুমায়, আর বাকিটা সময় মুখের সামনে একটা বই ধরে শুয়ে-বসে থাকে। ও শিওর মৌমিতা বইয়ের একই পাতা সারাক্ষণ সামনে ধরে আছে। একবারও সজলের দিকে ফিরে তাকাচ্ছে না। মানে কী! ও তো কোনদিনই কেয়ারিং রেসপন্সিবল হাজবেন্ড ছিল না। তো, আজকে নতুন করে কী হলো! এইবার মৌমিতা নরমাল হয়ে যাচ্ছে না কেন!
ওর কি তাহলে অন্য কারো সাথে রিলেশন হয়েছে! দিনের পর দিন বন্ধুবান্ধব নিয়ে এখানে ওখানে, ক্লাবে, বারে পড়ে থাকে সজল। যখন ড্রিঙ্ক করে তখন ফোন অফ রাখে। মৌমিতার জন্য অন্য কারো সাথে রিলেশন করা কোন ব্যাপারই না। সজলের মাথা ঘুরে গেল।
ফোন চেক করতে হবে মৌমিতার।
ফোনটা নিয়ে ওর সামনে ধরে বললো, ফোনের লক খোলো।
মৌমিতা না শোনার ভাব করলো।

সজল: ফোনের লক খোলো।
মৌমিতা: কেন?
সজল: আই ডাউট ইউ।
মৌমিতা ফিরেও তাকালো না।
সজল: ওই… ফোনের লক খোল। আমি দিনের পর দিন বাসায় থাকি না। কার কার সাথে নষ্টামি করে বেড়াস, আমি এখন চেক করমু।
মৌমিতা: একই কথা আমিও তোমাকে বলতে পারি।

সজল: না পারোস না। কজ আমি যেখানেই থাকি তোর প্রতি লয়্যাল থাকি। বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডা দেই, মদ খাই, বাট আমি যে তোর প্রতি লয়্যাল, এটা তুই জানোস।
মৌমিতা: নাতো।
সজল: নাতো মানে!
মৌমিতা: আমি জানি না তুমি ফোন অফ করে একদিন/ দুইদিন কই থাকো।
সজল: ও… তুমি আমারে ডাউট করলা! এতো বছর ধরে তোমার প্রতি লয়্যাল থাইকা ভুল করছি তাইলে। শিট্ যার জন্য লয়্যাল থাকলাম আমি, সে আমারে ডাউট করে!
মৌমিতা: তুমিই তো প্রথমে আমাকে ডাউট করলে। তাই না? আর আমি থাকি তোমার বাড়িতে, তোমার মায়ের সাথে। আমার ফোন সারাক্ষণ ওপেন থাকে। আমার লোকেশন তোমার সাথে শেয়ার করা। আমার ফেসবুকের পাসওয়ার্ড নিয়ে তুমি লগইন করে বসে থাকো। আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসের খবর তুমি জানো। আর তোমার কিছুই আমি জানি না।
বাড়ির বাইরে একদিন/দুইদিন ফোন অফ করে কই থাকো, কী করো আমি জানি না।
তোমার ফোনে কী যে এতো গোপন জিনিস আছে তাও জানি না, একটা ছবি তুলতে হলেও তোমার ফোনটা টাচ করতে দাও না।
সজল: ওই… কাউন্সিলরের মতো ঠাণ্ডা মাথায় কথা বলবা না। ফোনের লক খোলো। নাইলে কেয়ামত হইয়া যাইবো আজকে।
মৌমিতা: আসো, দুইজন একসাথে যার যার ফোনের লক খুলি।
সজল: আমি আমার উত্তর পাইয়া গেছি। হারামজাদি, কয়দিন অফিসে যাইতে পারতেছোস না, তরে ছাড়া তর বসের কলিজা ভরতেছে না, তাই না! তর সব নষ্টামির সাক্ষী এই ফোন। কেমনে দিবি এই ফোন আমার হাতে! হারামজাদি, তুই মর।
বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল সজল।
মৌমিতা একটুও কাঁদলো না। এই সব গালিগালাজ শুনে অভ্যস্ত ও। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে এখন। মাথা গরম করে কোন সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না।
মৌমিতা ফোনটা হাতে নিলো।

মৌমিতা: হ্যালো… ফ্রি আছো? আসবো?

পর্ব- ৩

সজল বাড়ি থেকে বের হতেই গেটের সামনে কুকুরের সাথে ধাক্কা খেলো। ইচ্ছামতন গালি দিলো ও কুকুরকে, যেন কুকুর ওর সব কথার মানে বুঝতে পারছে। রিক্সাওয়ালার সাথে ফাইট করলো। সিগারেট কিনতে গিয়ে দোকানদারের সাথে ফাইট করলো।
এখন ফুটপাতে বসে ফোন হাতড়ে পুরনো গার্লফ্রেন্ডদের নাম্বার খুঁজে বের করতে লাগলো। কাকে কল দেয়া যায়। মেসেঞ্জারও চেক করলো। পিচ্চি পিচ্চি কতগুলো মেয়ের সাথে চ্যাটিং হয়, জাস্ট জোকস্ ফানি ভিডিও এক্সচেঞ্জ, হালকি ফুলকি টাইপ রিলেশন। এইসব করলে নিজের পারফরম্যান্স টেস্ট করা যায়। এখনো পিচ্চি পিচ্চি মেয়েরা পটে তাহলে আমার দ্বারা। ওয়াও ম্যান! প্রোফাইল পিকচারে সুঠাম দেহের ছবি আর ম্যারিটাল স্ট্যাটাস সিংগেল দেখে অনেক মেয়েই কাত হয় এখনও। কে জানে প্রফাইল প্রফেশনে বিজনেসম্যান লেখা সুঠাম দেহের অধিকারী হ্যান্ডসাম হাঙ্ক, বাস্তব জীবনে চাকরিজীবী বউয়ের টাকায় বসে খায়।
আবার অনেক মেয়ে ওকে শুধু একবারের জন্য চায়। ডিরেক্ট প্রপোজ করে! কী জমানা আসলো!
ও কিছুদিন চ্যাটিং এ মজা নিয়ে ব্লক দিয়ে দেয়।
ইম্পালসিভনেসের কারণে বেশি দিন কাউকে ভালো লাগে না ওর। জীবনে শত শত প্রেম করলেও কারো সাথেই ২-৩ সপ্তাহের বেশি সম্পর্ক টেকেনি। ও গার্লফ্রেন্ড এর উপর দাবি করবে, ডমিনেট করবে, কিন্তু গার্লফ্রেন্ড ওর উপরে কোন দাবি রাখতে পারবে না। দায়িত্ব নিতে বলতে পারবে না। কয়েকটা প্রেম অবশ্য ২-৪ মাস করে টিকেছিল, মেয়েগুলোর অসীম ধৈর্যের কারণে। ওকে মানুষ বানাতে চেয়েছিল। হয়নি ও মানুষ। এই (দীর্ঘমেয়াদি ওর হিসেবে) প্রেমগুলোর ক্ষেত্রে ওর ফোন নাম্বার চেঞ্জ করতে হয়েছে ব্রেক-আপের পরে। একদিন হঠাৎ এক বিয়ের দাওয়াতে গিয়ে মৌমিতাকে দেখে অপলক চোখে তাকিয়েছিলো সজল। বিয়ে বাড়িতে বাকি মেয়েদেরকে যেখানে মেকাপের আড়ালে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, সেখানে মৌমিতার সাজ বলতে ছিল শুধু চোখের কাজল। অবশ্য কাজল না পরলেও চলতো। এমনিতেই ওর গভীর কালো চোখ। উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের কাটা কাটা চেহারার একটা মেয়ে। কেমন শান্ত, ধীর-স্থির। পুরোটা সময় ও দূর থেকে মৌমিতাকে লক্ষ্য করলো। সজল যতখানি অস্থির, মৌমিতা ঠিক ততখানি স্থির। জীবনে এই প্রথম ওর মনে হলো, এখানে আমি নোঙ্গর গাড়তে পারি। মাকে গিয়ে বললো, “আম্মা আমি এই মাইয়ারে বিয়া করতে চাই”।
মা যার পর নাই খুশি।
সাত দিনের মাথায় মৌমিতা এই বাড়ির বউ হয়ে এলো।

“শিল্পী” – হ্যাঁ, ওকে কল দেয়া যায়। এক সময় পাগল ছিল সজলের জন্য। বহুদিন মেসেঞ্জারে নক দিয়ে মিট করতে চেয়েছে সজল রাজি হয়নি। আজ মাথায় রক্ত উঠে আছে। মৌমিতা কী মনে করে নিজেকে! ও অন্য কারো সাথে রিলেশনে ইনভলভ হতে পারে, আমি পারি না! আরেহ, এখনো আওয়াজ দিলে এক্স/কারেন্ট সব গার্লফ্রেন্ডরা রাজি হয়ে যাবে। আমার মতো প্লেবয় তিন বছর বউয়ের প্রতি লয়্যাল থেকে পেলাম জাস্ট চিটিং। আই ডোন্ট ডিজার্ভ দিস। মাঝে মধ্যে দুই/একদিন ফোন বন্ধ করে বন্ধু বান্ধবদের সাথে বাইরে কী থাকি, অমনি সে তো চান্স পেয়ে গেছে! বসের সাথে এক্কেবারে সেট হয়ে গেছে। আমি কি হাতের ফাঁক দিয়ে পড়ে গেছি নাকি!

সজল: হ্যালো
শিল্পী: সজল! এতো বছর পর!
সজল: মিট করতে চাও?
শিল্পী: মানে কী!
সজল: মিট করতে চাও কিনা বলো?
শিল্পী: কখন, কোথায়!!
সজল: এখন। তোমার বাসায় সম্ভব?
শিল্পী: হুম। আমার হাজব্যান্ড ট্যুরে গেছে। মানে, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। এতো বছর পর হঠাৎ করে! কতবার আমি নক দিয়েছি, তুমি রেসপন্স করো নাই।

সজল: এতো কথা বলার সময় নেই। আমি আসছি। সজলের এখন নিজের উপর কন্ট্রোল নেই।
কোনো কথাবার্তা, কুশল বিনিময়, ফোরপ্লে কিছু না। জাস্ট চোখ বন্ধ করে একটা লং সেক্স। একবারের জন্য তাকায়নি কার সাথে আছে ও।
সজল ড্রেস পরতে পরতে শিল্পীকে বললো, আমার নিজের উপর কন্ট্রোল ছিল না। জীবনে বহুবার রাগের মাথায় অনেক বড় বড় ভুল করেছি। তাই আজ আমার জীবনটা এমন- আনসাকসেসফুল, আনস্ট্যাবল। আবার ভুল করলাম আজ।
আজকের পর আমাকে আর কল দিও না। আমি তোমার নাম্বারটা ব্লক করে দিচ্ছি।

শিল্পী: মানে কী! বউয়ের সাথে ঝগড়া করে আমার কাছে এসেছিলে জাস্ট একবারের জন্য!
সজল: বট গাছের শিকড় দেখেছো কখনও? অনেক গভীর পর্যন্ত যার ভিত। দৃঢ়, মজবুত। মৌমিতার সাথে আমার সম্পর্কটা ঐরকম। আমার মতো অস্থির, দায়িত্বজ্ঞানহীন ছেলের জন্য মৌমিতা একটা নির্ভরতার জায়গা। আমার পুরো পরিবারকে আগলে রাখে ও। ওর মতন বউ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। এক অর্থে আমি ওর যোগ্য না। আজ আমি ওর বিশ্বাস নষ্ট করলাম। নিজের কাছে সারাজীবনের জন্য অপরাধী হয়ে গেলাম।
শিল্পী: এতোক্ষণ আমার ইমোশন নিয়ে খেললে কেন? তুমি তো জানো আমি এখনও তোমাকে ভালবাসি। আর এতো লম্বা বুলি আওড়ালে, ভালো মানুষ বউটার সাথে তো চিটিং ই করলে!!
সজল: চিটিং করিনি। আমি আমার রাগ কন্ট্রোল করতে পারিনি। রাগের মাথায় অনেক বড় একটা ভুল করেছি। আই লাভ হার আ লট। এন্ড আই এ্যাম অবসেসিভ এ্যাবাউট হার। সরি।
শিল্পী: একই ভুল তোমার ওয়াইফ করলে মাফ করতে?
সজল: নো। আই উড শ্যুট হার। এন্ড ইউ নো সামথিং, শী উইল নেভার ডু লাইক দ্যাট। সি ইজ মাই প্রাইড।

জুতো পায়ে দিয়ে গেট খুলে বাইরে চলে এলো সজল। একবারও পিছনে ফিরে তাকালো না।
পুরোটা পথ ঠিক করলো, বাড়ি ফিরে মৌমিতার কাছে কনফেস করবে। পায়ে ধরে বসে থাকবে, যতক্ষণ না মাফ করে। বিশ্বাস নষ্ট করেছে ওর। মাফ তো চাইতেই হবে। বাচ্চার জন্য সজল পাগল ছিলো, মৌমিতা নিতে চায়নি। সেই বাচ্চার জন্মের সময়ও পাশে ছিলো না ওর। কিচ্ছু দেয়নি ওকে, শুধু দুঃখ ছাড়া। কিন্তু ছেড়ে যায়নি মৌমিতা। এতো অত্যাচার সহ্য করেও সজলকে, সজলের মাকে ছেড়ে যায়নি। ছেলে হয়ে ওর যত দায়িত্ব পালন করার কথা, মেয়ে হয়ে মৌমিতা সেই সব করে গেছে, সব সময়।
সজল কাঁদছে… হাউমাউ করে কাঁদছে…
বাড়ি ফিরে দেখে মৌমিতা বাসায় নেই।
মাকে জিগ্যেস করলো। মা বললো জানে না। মুখ দেখে মনে হচ্ছিলো, মা মিথ্যা বলছে। এদের শাশুড়ি-বউয়ের টিউনিং আলাদা।
সজল: আম্মা, তুমি কি সত্যি করে বলবা মৌমিতা কই? কখন গেছে?
হাসিনা বেগম: আরেহ, গেছে মনে হয় আশেপাশে কোথাও। তুই বয়, আমি চা দেই।
সজল: আম্মা, আমার সিক্সথ সেন্স আমাকে কখনো ধোঁকা দেয় না। কিছু একটা ব্যাপার আছে এবং তুমি সেইটা জানো।
সজল মোবাইল, টিভির রিমোট আছড়ায় ভাঙ্গলো।
চিৎকার করে বলছে, “এই দুনিয়ায় কেউ আমার আপন নাই। সব ধোঁকাবাজ। নিজের মা পর্যন্ত মিথ্যা বলে।
এমন সময় বন্ধু কল দিলো।
সজল: দোস্ত, তরা কই? আমার তগো দরকার। এই দুনিয়াতে তরা ছাড়া আমার আপন কেউ নাই।
আইজ মাতাল হওয়ার মতন মদ খামু।
তরা থাক, আমি আইতাছি।

৪র্থ এবং শেষ পর্ব

কাউন্সিলর: বোসো।
মৌমিতা: থ্যাংকস।
কাউন্সিলর: বাচ্চা কার কাছে রেখে এসেছো?
মৌমিতা: আমার শাশুড়ির কাছে। উনি জানেন আমি কোথায় এসেছি।
কাউন্সিলর: বহু বছর পরে দেখা। সেই কলেজ লাইফের পরে আর দেখা হয়নি।
মৌমিতা: হুম।
কাউন্সিলর: চা খাবে?
মৌমিতা: না।
কাউন্সিলর: তুমি কি ভালো করে ভেবে দেখেছো, নাকি আরও সময় নিতে চাও?
মৌমিতা: আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শুধু তোমার সাথে কথা বলে নিজেকে একটু হালকা করতে চাচ্ছিলাম। কাউন্সিলর: হুম, তাহলে আমরা একটু আলাপ করি। হয়তো তোমার মনটা হালকা হবে। আচ্ছা মৌমিতা, কেন তুমি সজলের থেকে আলাদা হয়ে যেতে চাচ্ছো? খুব স্পেসিফিক্যালি রিজনগুলো কী কী?
মৌমিতা: বিজনেস করে বললেও সজল আসলে কখনোই তেমন কিছু করেনি। বাড়ি ভাড়ার টাকায় ওদের সংসার ভালোমতো চলে গেলেও সারাক্ষণ ঘরে বসে থাকার কারণে ব্রেইন তো কোন প্রোডাক্টিভ কাজে বিজি থাকে না। তখন ছোটখাট ব্যাপারে অশান্তি করে, সন্দেহ করে। বন্ধু অন্ত:প্রাণ একজন মানুষ সজল। বাবা মায়ের চেয়েও মনে হয় বন্ধুদের বেশি ভালোবাসে ও। সব ধরনের দায়িত্ব থেকে অনেক ঊর্ধ্বে রাখে নিজেকে। এমনকি অফিস শেষে কাঁচাবাজারও আমারই করতে হয়। আমার চাকরি করাটা ওর পছন্দ না, কিন্তু আমার বেতনটা পছন্দ। মুখ খারাপ। খুবই শর্ট টেম্পার্ড একজন মানুষ। সারাক্ষণ চিড়চিড়া হয়ে থাকে। রেগুলার ড্রিঙ্ক করে। বন্ধুরা ডাক দিলে কোনোদিকে না তাকিয়ে চলে যাবে ওদের সাথে। বাড়িতে মা অসুস্থ নাকি বউ এর কোনো দরকার, একটুও চিন্তা করবে না। কখনো হয়তো রাতে ফিরলোই না। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে রাত পার করে দিলো, ফোন বন্ধ করে একপাশে রেখে। টেনশনে রাত জেগে না ঘুমিয়ে অফিস করতে করতে অসুস্থ হয়ে গেছি আমি। এমনকি প্রেগনেন্সিতেও আমাকে একটু টেনশন ফ্রি রাখেনি। অথচ বাচ্চা নেয়ার জন্য পাগল ছিলো সজলই। আমার উপর ওর দাবি থাকবে, কিন্তু ওর উপর আমি কোন দাবি রাখতে পারবো না। দিনে কতবার যে একটা মানুষ ব্লাস্ট হতে পারে! ওর জীবনের যত ব্যর্থতা এবং দায়িত্ব না নেওয়ার দায়ভার, সব কাছের মানুষগুলোর উপর চাপিয়ে দেয়। আমার ডেলিভারির সময় পর্যন্ত আমার পাশে ছিল না ও। বন্ধুদের সাথে ড্রিঙ্ক করে ক্লাবে পড়েছিলো। ফোন ছিলো বন্ধ। এইবার না আমি আর নিতে পারছি না। হাসপাতাল থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি সজলের থেকে আলাদা হয়ে যাবার। ডেলিভারির একদিন পর বাসায় ফিরে, সেই রাতেই আবার বন্ধুদের ডাকে মদের আসরে চলে গেলো। ফিরলো দুইদিন পরে। এরপর আর একসাথে থাকার কোনো কারণই বাঁচে না। জানো, ও আসলে কাউকে ভালোবাসে না, কাউকেই না। এমনকি নিজেকেও না। নিজেকে ভালবাসলে তো এটলিস্ট নিজের লাইফটা শেষ করতো না। একেক সময় ও নিজেকে অনেক বড় মনে করে, একেক সময় লুজার। জানো, অনেক সময় মাঝরাতে ঘুম ভেঙে দেখি বারান্দায় শূন্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে চেয়ে আছে। ওই সময় এক অন্য সজলকে দেখা যায়। যতই বন্ধুবেষ্টিত থাকুক, দিনশেষে ও কিন্তু একাকি অসহায়। কথায় কথায় চিৎকার চেঁচামেচি করা, সন্দেহ করা মানুষের জন্য অনেক সময় আমারও আর মায়া লাগে না।

কাউন্সিলর: হুম…
মৌমিতা: বাচ্চার জন্য খুব মায়া দেখায় বাসায় থাকলে। বাচ্চার কাস্টডি নিয়ে ঝামেলা করবে না তো? কাউন্সিলর: না। সজল তোমার ব্যাপারে যেমন অবসেসিভ, তেমনি বাচ্চার ব্যাপারেও অবসেসিভ। অবসেশন আর লাভিং এক জিনিস না। ও বাচ্চার জন্য কাঁদবে, যেদিন বেশি ড্রিঙ্ক করবে, সেই দিন ইমোশনাল হয়ে কাঁদবে। কিন্তু নিজের মধ্যে রেস্পন্সিবিলিটি এনে বাচ্চার দায়িত্ব নিতে আসবে না। এমনকি ও তোমার জন্যও কাঁদবে। তবে নিজেকে শুধরে তোমাকে ফিরিয়ে নিতে আসবে না। বার বার নতুন সম্পর্কে জড়াবে, শান্তি খুঁজে ফিরবে, কিন্তু কোনো সম্পর্কই টিকিয়ে রাখতে পারবে না।

মৌমিতা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে… ওর কি কখনো রিয়েলাইজেশন হবে না? মানে ওকে কাউন্সিলিং দিয়ে কী…..
কাউন্সিলর: প্রথম কথা Borderline personalityর মানুষগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঠিক হয় না। এদের অনেকের জীবনের শেষ বয়সে এসে রিয়েলাইজেশন হয়। কেউ কেউ মরার আগ পর্যন্ত নিজের অসফলতার জন্য আপনজনদের দায়ী করতে থাকে। আর তোমার হাজব্যান্ড তো নিজেকে বিরাট জ্ঞানী মনে করে, ওকে কাউন্সেলিং নেয়ার জন্য রাজি করানোই তো যাবে না। দেখো, তুমি নিজে থেকে আমার কাছে এসেছো। আমি তোমাকে জোর করে ধরে আনিনি। সেইজন্য তুমি মন দিয়ে আমার কথাগুলো শুনছো, বোঝার চেষ্টা করছো। আচ্ছা, আমাকে কি একটু সজলের ছোটবেলার কথা বলতে পারবে? জানো কিছু? কেমন ছিল ওর শৈশব, তারুণ্য?

মৌমিতা: আমার শাশুড়ি আমার সাথে খুব ফ্রেন্ডলি। ও ছোটবেলা থেকেই খুব জেদি ছিল। ওর বাবাকে দেখেছে ক্লাব থেকে রাত করে বাড়ি ফিরতে। ওয়াইফের সাথে মিসবিহেভ করতে। ওর ভেতরে এটা গেঁথে গেছে। শুধু মা বা বউ কেনো, কোনো মেয়েকেই মানুষ হিসেবে যে সম্মান দেখানোর একটা ব্যাপার থাকে, এটা সজলের মধ্যে নেই বললেই চলে। ছোটবেলায় বাবা একটা চাইলে দশটা খেলনা কিনে দিতো ওকে। আর বাবা বহির্গামী ছিলো বলে মায়ের মনে ছিল ভয়, ছেলে যেনো বাবার মতো না হয়। অতিরিক্ত শাসন করেছে সজলকে। যার ফল হয়েছে উল্টো। আরও বেশি জেদি হয়েছে। হতে চেয়েছে ক্রিকেটার, মা জোর করে বানাতে চেয়েছে ডাক্তার। জিদ করে লাঠির বারি খেয়েছে কিন্তু হোম ওয়ার্ক করেনি। কলেজ লাইফের প্রথম প্রেম মেনে নেয়নি মা। বাড়িতে বন্দি করে রেখেছিল সজলকে। মাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল আজ ঘরে তালা দিয়ে রেখেছো, ১০০ প্রেম করে দেখাবো তোমাকে। ওই মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর শুরু করে ড্রাগস্ আর ড্রিংকস্। সজলের জিদের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে মায়ের শাসন। মা আসলে চায়নি বাবার মতো ছেলেও বহির্গামী হোক। কিন্তু ছেলে তো বাবাকেও ছাড়িয়ে গেছে। আমার বিয়ের পর দেখেছি মা -ছেলের মধ্যে দা-কুমড়া সম্পর্ক। আমার চেষ্টায় সে সম্পর্ক কিছুটা ঠিক হয়েছে ইদানিং।

কাউন্সিলর: কোনো কোনো মানুষ জন্মগতভাবে জেদি হয়। তাদেরকে একটু সফিস্টিকেটেডলি হ্যান্ডেল করতে পারলে অনেক সময় ওরা নিজের স্ট্রাবর্ননেস থেকে ওভারকাম করতে পারে।

মৌমিতা: বিয়ের পর মনে হয়েছে আমি এ কোথায় এসে পড়লাম! মনে হতো ভোরবেলা সবাই ঘুমিয়ে থাকলে পালিয়ে চলে যাই। এমন মানুষের সাথে এক মুহূর্ত সংসার করা সম্ভব না। আস্তে আস্তে ওকে বুঝতে শুরু করলাম। ওর জন্য মায়া হতে লাগলো। এই বদ মেজাজী, গোয়ার, দায়িত্ব জ্ঞানহীন মানুষটা দিন শেষে একেবারে একাকী অসহায়। শূন্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। অথবা মা নামাজ পড়তে পড়তে জায়নামাজে ঘুমিয়ে পড়লে চুপ করে মায়ের পাশে বসে থাকে। অনেক সময় ঘুম থেকে জেগে দেখি সজল আমার মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। মুখে স্মিত হাসির রেখা, চোখ ভরা ভালোবাসা আমার জন্য। এ ভালোবাসায় অন্য কিছু নেই, শুধুই ভালোবাসা।

কাউন্সিলর: এদের থেকে একটা ফ্লাশ আসে, যা দিয়ে এরা আশেপাশের মানুষদেরকে এট্রাক্ট করতে পারে। এজন্য আশেপাশের মানুষগুলো এদের ছেড়ে যেতে গিয়েও যায় না। তবে মানুষের প্রতি এদের ইন্টারেস্ট ভেরি শর্ট স্প্যান অফ টাইমের জন্য থাকে এবং ইন্টেন্সও কম থাকে।

মৌমিতা: ২৪ ঘন্টার মধ্যে হয়তো আধা ঘন্টা আমাকে এমন হ্যাপি মোমেন্ট দিবে যে একেবারে সাত আসমানে নিয়ে যাবে। বাকি সাড়ে ২৩ ঘণ্টা আমার কথা হয়তো মনেও থাকবে না। কান্নার মধ্যও আমাকে হাসাতে পারে। সেই ম্যাজিক ও জানে। এটা ও ওর মায়ের ক্ষেত্রেও করতে পারে। বন্ধুদের আড্ডা ওকে ছাড়া জমে না। কিন্তু ওর মতো মানুষের সাথে আসলে সংসার করা যায় না। হয়তো এখনই সাত আসমান থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে এসে ধপাস করে জমিনে ফেলে দিবে। অনেক ভালো মুহূর্ত উপহার দেয়ার একটু পরেই এমন অকথ্য গালিগালাজ করতে পারে যে বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম আমি!

কাউন্সিলর: এদের সাথে থাকতে থাকতে এদের ফ্যামিলি মেম্বাররাও টক্সিক হয়ে যায়। মৌমিতা, তোমাকে একটা কথা বলবো। একটা রিলেশন শেষ করে আরেকটা রিলেশন শুরু করার মাঝে মিনিমাম দুই বছর গ্যাপ নিতে হয়। না হলে আগের রিলেশনের বিটার এক্সপেরিয়েন্স পরের রিলেশনে প্রভাব ফেলে।

মৌমিতা: মনে হয় আমি আর নতুন করে লাইফ শুরু করবো না। আমি সজলকে অনেক ভালবেসেছি। এখন চেষ্টা করবো আমার সন্তানকে মানুষ করতে। ওর মধ্যে যেন সজলের খারাপ দিকগুলো না আসে। তবে আমি আমার শাশুড়ির ভুলগুলো রিপিট করবো না।

কাউন্সিলর: আই এম প্রাউড অফ ইউ। ইউ আর আ ব্রেভ লেডি। বি সেফ এন্ড টেক কেয়ার।

মৌমিতা কাউন্সিলরের অফিস থেকে বের হয়ে একটা রিকশা  নিয়ে ওর অফিসের এলাকায় বাড়ি খুঁজতে বের হলো। একটা দুই কামরার ফ্ল্যাট পেয়েও গেলো।

বাড়িওয়ালা: বাড়িতে সদস্য সংখ্যা কয়জন?
মৌমিতা: দুইজন এডাল্ট, একজন ইনফ্যান্ট।

বাড়িওয়ালা: স্বামী-স্ত্রী-সন্তান বললেই তো পারতেন না!

মৌমিতা: আমি ডিভোর্সড।
বাড়িওয়ালা: ও তাহলে বাড়িতে গার্ডিয়ান কে? স্বামী ছাড়া তো বাড়ি ভাড়া দেয়া যাবে না।
মৌমিতা: স্বামীর চেয়ে বড় গার্ডিয়ান নিশ্চয় তার মা, তাই নয় কি? আর বাড়ির ভাড়া তো দেবো আমি। অ্যাডভান্স করবো?

বাড়ি ফিরতেই হাসিনা বেগম অস্থির হয়ে মৌমিতাকে বলছে কিছুক্ষণ আগে বাড়িতে বয়ে যাওয়া ঝড়ের কথা।
মৌমিতা একটুও বিচলিত হচ্ছে না। সিদ্ধান্ত নেয়াই ছিল। তবু এতোদিনের জমানো দুঃখ কষ্টগুলো আজ কাউন্সিলরের সাথে শেয়ার করে নিজেকে হালকা করা, এই আরকি।
দুই কাপ চা বানালো মৌমিতা।

মৌমিতা: আম্মা, আজ পর্যন্ত আপনি সবসময় আমার পাশে ছিলেন। ছেলের বিপক্ষে গিয়ে আমাকে সাপোর্ট দিয়ে আসছেন। আসেন, বাকি জীবনটা মা-মেয়ে একসাথে কাটিয়ে দেই। আপনি সজলের মা। সজলের আপনার ওপর দাবি বেশি। কিন্তু ওর ভরসায় আপনাকে রেখে যেতে আমার মন সায় দিচ্ছে না। বন্ধুদের পেলে ও ভুলেই যাবে বাড়িতে মা আছে। চলেন আম্মা আমাদের সাথে। সৃজনকেও তো মানুষ করতে হবে।
হাসিনা বেগম: ধন্য তোমার মায়ের গর্ভ। তোমার মতো বউমা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।
মৌমিতা: আসেন আম্মা, কাপড় চোপড় গুছাই…।

(শেষ)

শেয়ার করুন:
  • 425
  •  
  •  
  •  
  •  
    425
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.