কনডম বনাম স্যানিটারি প্যাড উবাচ

অনসূয়া যূথিকা:

ব্রিটেনের ব্যভিচারি রাজা পঞ্চম জর্জ। যৌনব্যাধি থেকে রাজাকে রক্ষা করতে তার একান্ত চিকিৎসক একটা আশ্চর্য আবিষ্কার করলেন। সেই ডাক্তারের নামানুসারেই তার বানানো লিঙ্গ আচ্ছাদনের নাম হলো কনডম। যদিও এর অনেক ডাকনামও আছে বটে। ডাকনাম না বলে স্ল্যাংও বলা চলে, যেমন রবার বুট!

প্রাচীন মিশরেও সঙ্গমের সময় পাতলা রেশমি রুমাল লিঙ্গ আচ্ছাদকের কাজ করতো। বস্তুত পৃথিবীর প্রায় সব সভ্যতায় যৌন সম্পর্কের সময় লিঙ্গ আচ্ছাদন ব্যবহার করার চল ছিল। সেইটে মাথায় রেখেই কনডমের জন্ম।
সারা পৃথিবীতে যাই হোক কিন্তু বাংলাদেশের পুরুষদের কাছে কনডম কখনোই জনপ্রিয় ছিলো না৷

অনুসূয়া যূথিকা

জন্মনিরোধকের ভূমিকা পালন করতে কনডম বরাবরই ব্যর্থ হয়েছে। বরং বাঙালি পুরুষের ধারণা কেবলমাত্র অনিরাপদ শারীরিক সংসর্গের সময়ই কনডম ব্যবহারের প্রয়োজন আছে, নচেৎ নয়। কমডম যৌনব্যাধি থেকে রক্ষা করে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। এতোকিছু সত্ত্বেও বিবাহিত পুরুষের কাছে কনডম গুরুত্ব পায় না৷
এমনিতেও নব্বই শতাংশ মুসলমানের দেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের চিন্তাটাই বড় কঠিন। বাড়ি বাড়ি রাজা কী প্যানথার কনডম, সুখী বড়ি বিলিয়েও কাজ হয় নাই।

পুরুষদের ভ্যাসেকটমি আর নারীর লাইগেশনকে উৎসাহিত করতে শাড়ি লুঙ্গি বিতরণ, বিজ্ঞাপন কোনটাই কাজে আসে নাই। গ্রামে বা শহরের বস্তি এলাকার বাচ্চাদের কাছে কনডম পরিচিত হয়েছে বেলুনের বিকল্প ফোটকা হিসেবে৷ লুকিয়ে কখনো কোন উঠতি তরুণের ব্যবহারে হয়তো লেগেছে, কিন্তু গোত্রে কুলীন হতে পারে নাই৷ সোশাল মার্কেটিংয়ের কনডমের যা দাম, সেটা মধ্যবিত্তের কাছে তাই ব্রাত্য।

কনডম কেনার একটা নির্দিষ্ট ক্রেতা আছে, আছেই। তবে এই ক্রেতাদের ঠিক সাধারণ কাতারে ফেলা যায় না, এরা কিছুটা এডভেঞ্চার প্রিয় বলা চলে। আর মধ্যবিত্ত পরিবারের পুরুষের কাছে কনডম আদতেই কখনো জনপ্রিয় ছিল না। ল্যাটেক্স আসার আগে পর্যন্ত কনডম তৈরির মূল উপাদান ছিল রাবার। এখন প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে কনডমের গায়েও৷ সরকার সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানির মাধ্যমে যে কনডম বাজারে ছাড়ে তার দাম এখনো ঠিক কম বলা চলে না। পুরুষের কাছে কনডম অস্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপছন্দের।

তাই সংসারে বাড়তি মুখের চাপ এড়ানোর দায়টা আরও বহু রকমের ঝক্কির মতো চেপে বসেছে নারীর কাঁধেই।

স্বাস্থ্য ঝুঁকি আছে জেনেও নারী ব্যবহার করে হরমোন ইঞ্জেকশন, পিল, কপারটি, এমনকি পিছপা নয় লাইগেশন করাতেও। পুরুষের ভ্যাসেকটমি জনপ্রিয় করাতে সবরকম পদক্ষেপ ব্যর্থ হয়েছে। দায়িত্বশীল পুরুষ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বা পরিবার ছোট রাখতে ভ্যাসেকটমি করে, এমন বিজ্ঞাপন কাজে আসে নাই। বিজ্ঞাপন হয়েছে কনডমেরও। কিন্তু বাংলাদেশে এমনকি রোহিঙ্গারাও কনডম ব্যবহারে উৎসাহী না। কেবল যে জনসংখ্যার চাপ বাড়ছে তা না, বাড়ছে যৌনবাহিত রোগের ঝুঁকিও।

এমনিতেই বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্হানের কারণে এইডসের ঝুঁকি বেশি। আরও কিছু রোগের মতো জানা যাচ্ছে, ডেঙ্গু ও জিকা ভাইরাসও যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়ায়, যদিও এর সত্যতা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরিস্থিতি এমন যে কনডম ব্যবহারে পুরুষদের উৎসাহিত করার জন্য ব্যবস্হা নেয়া জরুরি। দাম কমিয়ে প্রয়োজন ভর্তুকি দিয়ে হলেও সরকারের উচিত হতো এর ব্যবহারকারী বাড়ানো৷

বাংলাদেশে আরো কিছু ক্যানসারের মতো জরায়ু মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি ভয়াবহ। বছরে ছয় হাজার নারী মারা যান এই রোগে। প্রতি বছর নতুন করে আরও বারো হাজার নারী আক্রান্ত হচ্ছেন। কেবল যে অপরিচ্ছন্নতা বা সচেতনতার অভাবে এই রোগে নারী আক্রান্ত হচ্ছেন, তা না, জরায়ু মুখের ক্যান্সারে অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক একটা বড় কারণ। সঙ্গে মাসিকের সময়ে অপরিষ্কার কাপড় ব্যবহার, প্রসবকালীন পরিচ্ছন্নতার অভাব তো আছেই।

গ্রামের মেয়েদের কাছে হুইসপার বা সেনোরা সহজলভ্য না। এমনকি তারা মোনালিসাও ব্যবহারের স্বপ্ন দেখে না। শহরের মোড়ে মোড়ে যেমন বিভিন্ন কোম্পানিগুলো প্রচারের স্বার্থে বাই ওয়ান গেট ওয়ান ফ্রি বলে দুই প্যাকেট হুইসপার বিক্রি করে গ্রামে সেই সুযোগ নাই। তবে গ্রামের মেয়েরাও স্যানিটারি প্যাড ব্যবহারের আওতায় এসেছে এখন। আর সেনোরা না, তারা কেনে জয়া বা জলি। স্কুল কলেজের অবিবাহিত মেয়েরাই এসব ব্যবহারের আহ্লাদ করতে পারে। আর বিবাহিত নারীদের কথা যদি জানেন, তবে সেটা যথেষ্ট রকম ভয়াবহ।

গ্রাম দেশে সমস্ত ফার্মেসিতে একজন করে গ্রাম্য ডাক্তার নামের বুজরুক বসে। আর বিবাহিত নারীরা হলো তাদের প্রধান টার্গেট। সংসারের খরচ কমাতে এবং জন্ম নিয়ন্ত্রণের উপায় হিসেবে তারা ব্যবহার করে তিন মাস মেয়াদি ইঞ্জেকশন ডিপো প্রভেরা। পঞ্চাশ টাকায় চলে যাবে মাস তিনেক, নিয়মমতো। আর সত্যি হিসাব হলো একবার এই ইঞ্জেকশন দিলে ফের মাসিক চালু হবে প্রায় পাঁচ মাস পরে। আর তাই বিবাহিত নারীরা হিসাব করে সারা বছর ধরে ইঞ্জেকশন নেয়।

যেখানে ডাক্তারি শাস্ত্র মতে সারা বছর মানে বারো মাসে কম করে তিনবার মাসিক হওয়া জরুরি, সেখানে এদেশের গ্রামের নারীদের বছরের পরে বছর ধরে মাসিক বন্ধ রাখার চল চালু আছে। এদেশে স্যানিটারি প্যাডকে বিলাস পণ্য মেনে ভ্যাট বসানো হয়, দামও কমিয়ে আনার পদক্ষেপ নাই।

শহরের বিবাহিত নারীদের একটা বড় অংশ নিজের মিন্সট্রুয়েশন পিরিয়ড নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন সারা বছর। আমি মনে করি, কনডম এবং স্যানিটারি প্যাডের উপরে সমস্ত রকম ভ্যাট প্রত্যাহার করা হোক। পাশাপাশি নারীর স্বাচ্ছন্দ্যের কথা চিন্তা করে মেন্সট্রুয়েশন ক্যাপ এবং ট্যাম্পন আমদানি করা হোক।

শেয়ার করুন:
  • 443
  •  
  •  
  •  
  •  
    443
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.