কেন পুরুষ দিবস নিয়ে আলোচনাটা জরুরি

উইমেন চ্যাপ্টার:

১৯ নভেম্বর ‘আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবস’। দিবসটি উদযাপনের ক্ষেত্রে পুরুষের অর্জন, অবদান, বিশেষ করে কমিউনিটি, পরিবার, বিয়ে এবং সন্তান লালন-পালনের দিকগুলি তুলে ধরাই ছিল মূল লক্ষ্য। আরও বিস্তৃতভাবে বলতে গেলে মৌলিক মানবিক গুণাবলীগুলোকে উন্নীত করাই ছিল দিবসটি উদযাপনের আসল উদ্দেশ্য। বিশ্বের আশিটিরও বেশি দেশে ১৯ নভেম্বর দিবসটি পালিত হয়। আর ঠিক পরদিনই পালিত হয় বৈশ্বিক শিশু দিবস। এতে করে ৪৮ ঘন্টাব্যাপী পুরুষ ও শিশু দিবস পালনের মওকা পায় বিশ্ববাসী।

১৯৯২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি টমাস ওয়েস্টার এই আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবস নামের একটি প্রজেক্ট শুরু করলেও এটি আসলে প্রস্তাব হিসেবে গৃহীত হয় আরও এক বছর আগে অর্থাৎ ১৯৯১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। পরবর্তিতে ১৯৯৯ সালে ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগোতে প্রজেক্টটি নতুনভাবে গৃহীত হয়। তবে বিশ্বে মাল্টাই একমাত্র দেশ, যে কিনা এই দিবসটি ১৯৯৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে পালন করে আসছে।
মোটামুটি এই ছিল শুরু।

বাংলাদেশে দিবসটি এখন পর্যন্ত তেমন করে জনপ্রিয়তা না পেলেও ধীরে ধীরে এটি আলোচনায় উঠে আসছে। এখনও বিষয়টি দক্ষিণ এশিয়ার পুরুষতান্ত্রিক সমাজে হাসির খোরাক জোগালেও এবং অধিকাংশ পুরুষই এই সমস্ত হাসিঠাট্টায় অংশ নিলেও সময়ের প্রয়োজনে দিবসটি উদযাপনের প্রয়োজনীয়তাও অনুভূত হচ্ছে ক্রমেই। পুরুষতন্ত্র যে কেবল নারীকেই আবদ্ধ করে না বা শারীরিক-মানসিকভাবে নির্যাতন করে না, পুরুষও এর শিকার হচ্ছে যুগের পর যুগ ধরে, তা নানান আলোচনার মধ্য দিয়েই উঠে আসছে। তবে এর অগ্রগতি খুবই ধীরলয়ে হচ্ছে, যতোটা আশা করা হয়েছিল, সেরকমটি হয়নি।

পুরুষ দিবস উপলক্ষে তিনজনের লেখা উইমেন চ্যাপ্টারে তুলে ধরা হলো:

মারজিয়া প্রভা:

মজার ব্যাপার কি জানেন, আমাদের এই অঞ্চলে পুরুষ দিবসকে জনপ্রিয় করে তোলা কিংবা জোরদারভাবে পুরুষ দিবসকে আন্তর্জাতিককরণের পেছনে যে মানুষটার কথা বার বার উঠে আসে তিনি কিন্তু একজন নারী! উমা চাল্লা। সেভ ফর দি ইন্ডিয়ান ফ্যামিলি ফাউন্ডেশনের কর্ণাধার উমা একজন আইনজীবী এবং সিংগেল মাদার। এই মানুষটাই প্রথম চিন্তা করেছে পুরুষ দিবসকে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন হিসেবে কাউন্ট করার জন্য। ২০০৭ সাল থেকে তিনি পুরুষ অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। পুরুষ বিরোধী আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি সোচ্চার থাকার মাধ্যমে এই দিবস নিয়ে কাজ করার প্রেরণা পান। এই দিবস পালনের মাধ্যমে উমার মূল উদ্দেশ্য ছিল আইনি প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ জেন্ডার নিরপেক্ষ করে তোলা।

৬০ এর দশক থেকেই আসলে “নারী দিবসের” মত করে একটি দিন পুরুষের হোক এই নিয়ে কথা চলে আসছে। কিন্তু ছোট ছোট ইভেন্ট আলাপ আলোচনা এসবের মধ্যেই পুরুষ দিবস বিষয়টি আসছিল না। বরং বেশি জোর দেওয়া হচ্ছিল ফাদারহুড বিষয়কে। ১৯৯৯ সালে ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্ট ইন্ডিজের জেরম তেলুকসিং প্রথমবারের মতো ত্রিনিদাদে এই দিবসটি উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেন। সবাই তখনও সেই ফাদারস ডে এর আদলেই বিষয়টি ভাবছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পুরুষ তো কেবল বাবা না! পুরুষ ছেলে হয়, বন্ধু হয়, সঙ্গী হয়। একটা সমাজে পুরুষের রোল আসলে কী হওয়া উচিত সেই জায়গা থেকে চিন্তা করেই জেরোম শুরু করলেন এই দিবসের কার্যক্রম।

জেরোমে একজন আফ্রো ক্যারিবিয়ান একটিভিস্ট। ক্যারিবিয়ান শ্রেনী রাজনীতি নিয়ে কাজ করা একজন বুদ্ধিজীবী। আফ্রিকায় শ্রমিকশ্রেণি এর সংগ্রাম নিয়ে কাজ করার মাধ্যমেই জেন্ডার,রেস নিয়ে তার চোখ খুলে গেছে। ১৯ নভেম্বর জেরোমের বাবার জন্মদিন। বাবা হচ্ছে তার জীবনে একজন প্রেরণাদায়ক পুরুষ। তাই রোল মডেল মানুষটার জন্মদিনকেই বেছে নেওয়া হয়েছিল পুরুষ দিবস পালন করার জন্য। আমরা মূলত জেরোমের বাবার জন্মদিনকেই সেলিব্রেট করছি আজ।

আমরা জানি পুরুষতন্ত্র পুরুষকেও কী করে গ্রাস করে। কীভাবে টাকা বানানোর মেশিন করে তুলে, কীভাবে মাচো ম্যান করে তোলার মাধ্যমে তাকে ডিহিউমানাইজড তথা অমানবিক করে তুলে। তাই পুরুষের জীবনে সামাজিক অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ন্যায্য অধিকারের আলোচনা নারীবাদের বাইরের কোন বিষয় নয়। যেহেতু জেন্ডার সমতা এবং ন্যায্যতা নিয়েই নারীবাদ কথা বলে আসছে। কোন প্রকার জেন্ডার (পুরুষ,নারী, ট্রান্স) বাদ দিয়ে জেন্ডারের সমতা এবং ন্যায্যতা কোনভাবেই সম্ভব নয়।

এই বিষয়টি উমা চাল্লা প্রমাণ করেছে। এবং জেরোম আরেকটা জিনিস প্রমাণ করেছে তার কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে, তা হচ্ছে জেন্ডার আন্দোলন আসলে শ্রেণি সংগ্রামের পৃথক কোন আন্দোলন না। কারণ শ্রেণি আন্দোলনের শ্রম বিভাগের যে বণ্টন তার একটা অংশ তৈরি হয়েছিল জেন্ডার রোলকে কেন্দ্র করে। গেরস্থালি কাজ মেয়েদের, ছেলেদের কাজ পাবলিক সেক্টরে। এই যে নারীর শ্রমকে অস্বীকার করার জায়গা এখান থেকেই প্রধানত নারীকে সাবঅর্ডিনেট করার সূচনা এবং পুরুষতন্ত্রের উৎপত্তি।

সেই উৎপত্তি হওয়া পুরুষতন্ত্র জেন্ডারে পুরুষকেও যখন নিঃশেষ করে ফেলছে তখন নিজেদের আলাদা আইডেন্টিটির জন্য একটা পৃথক দিবস থাকা দরকার। নারী দিবস যেমন সব জেন্ডারের জন্য, পুরুষ দিবসও তাই।

তাই শুধু পুরুষ বন্ধুদের নয়, একজন নারীবাদী হিসেবে আমি সবাইকে পুরুষ দিবসের শুভেচ্ছা জানাই। এই দিবসে আমি চাই লিঙ্গতান্ত্রিক এই সমাজ ব্যবস্থার পতন হোক। সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক লৈঙ্গিকপ্রাধান্যতা (institutionalized sexism) নিপাত যাক।

চলুন, আমরা সবাই মিলে জেন্ডার সমতার এবং ন্যায্যতার পৃথিবী গড়ে তুলি।

প্রমা ইসরাত:

ছেলে শিশুদের উপর যৌন নির্যাতন হয়।
অনেক দিন ধরে হয়, এবং এই নির্যাতনের কথা তারা মুখ ফুটে কাওকে বলতেও পারে না।
নিজের সাথে ঘটে যাওয়া এই অপরাধের কথা চেপে রেখে, তাদের বড় হতে হয়।
আমার দুটো ছেলে, একটা মেয়ের খুব শখ ছিলো এটা অনেকেই বলে থাকেন, কিন্তু আমার দুটো মেয়ে একটা ছেলের খুব শখ এই কথা কেউই বলে না। ছেলে সন্তান, কামনাতে আরাধনাতে থাকে প্রয়োজন হিসেবে, আদরের জন্য শখের জন্য নয়।
ছেলে সন্তান, আরাধনার বস্তু কারণ, একজন ছেলের উপর সংসারের সমস্ত দায় দায়িত্ব দিয়ে দেয়া যাবে, ছেলে সন্তান একটা স্বস্তি।
এইভাবে আমাদের সমাজে, একজন ছেলে সন্তান কামনা করা হয়।
একটা ছেলে’র মাথা বা মন জুড়ে শুধুই অনিশ্চয়তা থাকে। কীসের ভয়?
নিজেকে অযোগ্য ভাবার ভয়, সমাজের আর দশটা মানুষের সাথে নিজেকে টিকিয়ে রাখার যে প্রতিযোগিতা, সেখানে হেরে যাবার ভয়।
যোগ্য পুরুষ হতে হলে শারীরিক সামর্থ্য, অর্থ, সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, রূপ সব কিছু থাকতে হবে পুরুষের। ভালো জায়গায় ভর্তি হতে হবে, ভালো চাকরি, টাকা থাকতে হবে, নিজের গাড়ি, বাড়ি, সংসার চালানো সব ঠিক রাখতে হবে। বউকে খাওয়াতে হবে, বাচ্চার দেখা শোনা করতে হবে।
এইভাবে একজন পুরুষের উপর যদি লোড দেয়া হয়, তাহলে সেই পুরুষ কি করে আর মানুষ থাকে, কেউ কি বলতে পারে?
সেই পুরুষ কে যদি স্ত্রীর সকল ভরণ পোষণ দেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়, সেই সাথে সন্তান, নিজের বাবা মা, ভাই বোন সকল কিছুর দায়ভার যদি তার থাকে, তাহলে তার মানসিক অবস্থা কি সব সময় সুন্দর থাকতে পারে?
একটা প্রতিযোগিতা নিজেকে আসল পুরুষ প্রমাণের,
-আসল পুরুষ কাঁদে না, মা-বাবা মরে গেলেও কাঁদে না।
-আসল পুরুষ স্ত্রী/প্রেমিকা/নারী কে বাগে রাখতে পারে।
-আসল পুরুষ ভয় পায় না।
-আসল পুরুষ গম্ভীর থাকে।
-আসল পুরুষ কে অনেক শক্তিশালী হতে হয়।

মানুষকে মানুষ হতে হয়, এই কথা শেখানোর আগে, পুরুষকে পুরুষ আর নারীকে নারী বানানোর এই জেন্ডার পলিটিক্স শেখানো সমাজে, পুরুষদের যন্ত্রণা, মানসিক কষ্ট, দুঃশ্চিন্তা, অস্থিরতা এগুলো নিয়ে কেউ ভাবে না, এগুলো নিয়ে কাজ করার চেষ্টাও করে না।
একজন বাবা, একজন ভাই, একজন স্বামী, একজন পুত্র, একজন প্রেমিক ইত্যাদি নির্ভরশীল, দায় দায়িত্ব ওয়ালা চরিত্রের আগে একজন পুরুষ একজন মানুষ। তার মন খারাপ হয়, তার আহ্লাদ করতে ইচ্ছা হয়, তার ক্লান্ত লাগে, তার অফিস শেষে বাসের সিটে বসে যেতে ইচ্ছা হয়, জানালার পাশের সিটটাতে তারও বসতে ইচ্ছে হয়। একটা ভালো শার্ট, জুতা জামা, নিজের চুল এইগুলো নিয়ে তারও ভাবতে ইচ্ছা হয়। নিজের চেহারা নিয়ে তাদেরও যথেষ্ট ইনফেরিয়রিটি কমপ্লেক্স আছে।

পুরুষেরও ভয় করে অন্ধকার ঘরে, তেলাপোকা, মাকড়শা কিংবা সাপ দেখলে। মুভিতে ইমোশনাল দৃশ্য দেখে তারও চোখে পানি চলে আসে। মন উদাস হয়ে যায়। পুরুষেরও ডিপ্রেশন হয়, মুড সুইং হয়।
পুরুষেরও লজ্জা লাগে, অস্বস্তি হয়।

তুমি কেমন পুরুষ মানুষ, এইটা অমুক তমুক পারো না, এই কথা বলার আগে, একটু ভাবুন, ব্যক্তিটি মানুষ।

আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবসে, পুরুষদের জন্য রইলো শুভেচ্ছা।

রোখসানা চৌধুরী: 

হুমায়ুন আজাদের উপন্যাস আমার পিএইচডি গবেষণার একটি অংশ ছিল।তাঁর প্রকাশিত বারোটি উপন্যাস নিয়ে কাজ করতে গিয়ে প্রথমে দীর্ঘদিন থমকে ছিলাম।কারণ আমার গবেষণার বিষয় নারীবাদ। অথচ তাঁর উপন্যাসগুলো প্রাথমিক দৃষ্টিতে ভয়ংকর পুরুষবাদী। দশটি উপন্যাসেরই প্রধান চরিত্রে পুরুষ এবং তারা নারীসহ চারপাশের সবকিছুর প্রতি বীতশ্রদ্ধ। নারীর প্রতি তাদের আচরণকে গ্রন্থবদ্ধ ভাষায় পুরুষতন্ত্রের ধারক-বাহক হিসেবে চিহ্নিত করে দেয়া যায়।

ক্রমশ টেক্সটের নিবিড় পাঠ আমাকে দেখালো, তাঁর উপন্যাসের নায়কেরা অতি শৈশব থেকে এক ধরনের ট্রমার ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠে যা বাংলাদেশের অধিকাংশ পুরুষের বেলায় প্রযোজ্য। পিডোফাইল(শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন) নির্ভর নির্যাতন তো রয়েছেই। এছাড়াও তারা তাদের মাকে প্রথম নারী হিসেবে প্রত্যক্ষ করে সমাজ ও পরিবারে নারীর অবস্থানকে।

কী দেখে সে? দেখে, একজন নারী সার্বক্ষণিকভাবে সবার দেখভাল করছে, কিন্তু তার পদমর্যাদা পিতারূপী কর্তা মহাশয়ের অধীনস্থ শোষিত-নির্যাতিত এক কর্মচারী ছাড়া কিছু না। যাকে খুশি হলে বোনাস দেয়া যায়, অখুশি হলে বলাই বাহুল্য। বালকটি দেখে মা গর্ভবতী হয়, কর্তারূপী পিতার কাছে তার অবস্থান আরও নেমে যায়। মা-কে তখন অপারগতায় আরো কুৎসিত মনে হয় বালক পুরুষটির কাছে। জন্ম প্রক্রিয়ার পুরো পদ্ধতির জন্য সে মায়ের কাছ থেকে আরো দূরে সরে যায়।

ক্রমশ প্রতিটি নারী তার কাছে অবজ্ঞা-ঘৃণা আর ভোগের বস্তু হয়ে ওঠে। ধর্ষকামী সমাজকে বুঝতে হলে এই দৃষ্টিকোণ থেকে পুরুষকে পাঠ করা অতীব জরুরি।
হুমায়ুন আজাদ পড়তে গিয়ে আরো জেনেছি, নারী যেমন নিজের শরীর সম্পর্কে অজ্ঞ, তেমনি পুরুষের শরীর সম্পর্কেও আছে নারীপুরুষ উভয়েরই অসংখ্য ট্যাবু।

বালকের এই বেড়ে ওঠার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে নারী-পুরুষ উভয়কেই সমানভাবে সচেতন হওয়া জরুরি। সমান দৃষ্টি থাকা জরুরি।

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, নারী যেমন একা, আবার একা বলেই বন্ধু মহলে সে র‌্যাগিংয়ের শিকারও হয় তুলনামূলকভাবে কম। (ফারুকীর ‘ক্যারাম’, ‘ঊনমানুষ’ নাটকে সূক্ষ্মভাবে বিষয়টি উপস্থাপিত হয়েছে।) পরিবারেও মেয়েরা কিছু বিষয়ে ছাড় পায়। ভবিষ্যত পরিবারের দায় পুরুষের বলেই পড়াশোনা কিংবা চাকরির অযোগ্যতা তাকে পরিবারে কোণঠাসা করে রাখে।

পুরুষের ঘাড়ে নির্ভর করে যে সমাজ গড়ে উঠেছে সেখানে নারীর ভূমিকা কোন অংশে কম নয়। ‘সোনার আংটি বাঁকাও ভাল’,’পুরুষ রাগলে বাদশা, নারী রাগলে বেশ্যা’– এই সব প্রবচনে নারীও কম বিশ্বাস রাখে না। কাজেই পুরুষ তার কাঁধে অতীত-বর্তমান সবকিছু বয়ে নিয়ে চলবে, আর আপনাকে পঙ্গু ভেবে অপমান করলে অপমানিতও হবেন না, এটা কাঁঠালের আমসত্ত্ব চাওয়ার মতো বিষয়।

দিবস সম্পর্কে যারা নাক কুঁচকে থাকেন, তাদের জন্য এটুকু বলার যে, দিবস এলে অন্তত কিছু আলোচনা হয়। যত বেশি কথা হবে, ততোই দূরত্ব ঘুচবে মূর্খতা, অজ্ঞতা থেকে। কমবে বৈষম্য, ট্যাবুর আড়াল যাবে ভেঙে।

সবশেষে পুরুষ দিবসে সকল পুরুষের প্রতি শুভ কামনা রইলো, একটি সুস্থ সুন্দর ভবিষ্যত পৃথিবী গড়তে এখনও আপনাদের দায়িত্ব অগ্রবর্তী, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কানিজ আকলিমা সুলতানা:

শুধু নারীই পুরুষতন্ত্রের শিকার নয়, পুরুষও পুরুষতন্ত্রের শিকার। পুরুষতন্ত্র একটা আধিপত্যবাদি সিস্টেম। সেই সিস্টেমকে চালু রাখতে জন্মকাল থেকেই পুরুষের কোমলতা ও মানবতার দ্বার রুদ্ধ করে দেয়া হয় এবং তাকে ভারবাহী মানুষরূপে একটা কঠিন জীবনে ঠেলে দেয়া হয়।

পুরুষতন্ত্র পুরুষকে শেখায় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভার পুরুষের উপর। নির্দেশ করে পারিবারিক দায়িত্ব পালনের জন্য প্রতিটি আর্থিক প্রয়োজনের ভারও তার উপর। তাকে শিক্ষায় ও কর্মে পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করতে হবে। বংশ রক্ষার দায় মিটাতে হবে। নারী স্বজনদের চেয়ে শিক্ষায় ও উপার্জনে উপরের কাতারে থাকতে হবে।

পুরুষতন্ত্র শেখায় সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স, ইগো, বাহুবল, লোভ, অনধিকার চর্চা, নারীকে বঞ্চিত করার ফর্মুলা ও মুঠোয় ভরার ফন্দি।

পুরুষতন্ত্রে পুরুষের জন্য কান্না নিষেধ। পুরুষের কোমল সত্ত্বার বহিঃপ্রকাশ নিষেধ। দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক গৃহস্থালী কর্মগুলোর প্রতি তার আগ্রহ থাকা নিষেধ। এই সিস্টেমে পিতামাতা, স্ত্রী ও সন্তানের দেখভাল থেকে মালামাল বহনের দায় তার। মাথার উপর ছাদের ব্যবস্থা থেকে এ্যাম্বুলেন্স ডাকার দায়িত্ব তার।

বাল্যকাল থেকে পুরুষকে ঠেলে উপরে উঠিয়ে তার মই কেড়ে নেয়া হয়। শৌর্য বীর্যে অনন্যতা প্রতিষ্ঠিত করতে সে বাঁধা পড়ে কঠিন নিগড়ে। সন্ধান পায়না নিঃশর্ত আনন্দের। সে কখনও হয়ে উঠে রূঢ়, কখনও হতাশ, কখনও কেবলই ছুটে বেড়ায় পথ থেকে আরেক পথে।

জমি দখলের কালে, যুদ্ধের কালে, আধিপত্য বিস্তারের কালে পুরুষ তার মাসল ব্যবহার করে জয়ী হতে চেয়েছে। বিরোধী পক্ষের নারীদের ধর্ষণ করার মাধ্যমে গোষ্ঠীগত বিজয় নিশ্চিত করেছে। আজ যখন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত, এক ইঞ্চি জমিও এখন দখল করা যায়না, তবে কেন পুরুষকে এই নিষ্ঠুর সিস্টেমে বেঁধে রাখা হয়েছে?

আমার চারপাশের পুরুষরা মানবিক। তারা আনন্দের সাথে সমাজে বাস করতে চায়। যূথবদ্ধ জীবনে নারীর হাতে হাত রেখে চলে। কিন্তু সমাজ তাদেরকে মুক্তি দেয়না। চাপিয়ে দেয় বোঝার পর বোঝা।

আজ পুরুষ দিবসে পুরুষের শপথ হোক সকল অচলায়তন ভেঙ্গে স্বাভাবিক মানব সমাজ গড়ার। ভার শেয়ার করে, নারীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পথ চলার। নারী পুরুষ মুক্ত হোক তন্ত্র মন্ত্র থেকে, যুক্ত হোক নিঃশর্ত আনন্দে।

শেয়ার করুন:
  • 242
  •  
  •  
  •  
  •  
    242
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.