‘পিরিয়ড পোভার্টি’ থেকে মুক্তি মিলবে কবে?

নাহিদ দীপা:

যেদিন সকালে আমার কাছে কেউ একটা মেসেজ পাঠায়, ‘আপু, আপনার কাছে কৃতজ্ঞতা আমাকে মেন্সট্রুয়াল কাপের সন্ধান দেয়ার জন্য।‘ আমার দিনটা বদলে যায়।

যখন আমার গ্রুপে কেউ তার অভিজ্ঞতায় লেখে, ‘কেন এতদিন ভয়ে পিছিয়ে ছিলাম এই মেন্সট্রুয়াল কাপ ব্যবহার না করে, সেটা ভেবে আফসোস হয়’-আমি নতুন করে স্বপ্ন বুনি।

মাঝরাতে মোবাইলের মেসেজ টোন, খুলে দেখি একজন মেসেজ পাঠিয়েছে, ‘আপু, জেগে আছেন? আমার তো পিরিয়ড হলো মাত্রই, কীভাবে ইউজ করবো?’ আমি মুচকি হেসে তাকে নিজের করা ভিডিও আর নিজের লেখা ‘ব্যবহারবিধি’ পাঠাই।
কাপ নেই জেনেও যারা বিকাশে টাকা পাঠিয়ে দিয়ে বলে, ‘আপু এলেই আমারটা যেন সবার আগে পাই’।

আমি দিন গুনতে থাকি কবে আসবে সেগুলো?

নাহিদ দীপা

এর বিপরীতে, বিমানবন্দরের কাস্টমস যখন আমাকে বলে আপনার আনা এই মেন্সট্রুয়াল হাইজিন পণ্যের উপর ১২৭% ট্যাক্স ধরা হয়েছে, আমি পিছিয়ে যাই। পিছিয়ে যেতে যেতে ভাবি, থাক, যা গেছে গেছে! ছাড়িয়ে আনবো না। তখনই আমার বর আমাকে মনে করিয়ে দেয়, ‘দিপ্য, তুমি না অন্তত: ২০ জনকে বলেছো সপ্তাহ খানেকের মধ্যে কাপ দেবে তার কী হবে?’
আমি আবার ভাবি, তাই তো!!
চেনা জানা সব জায়গায় ধর্ণা দেই, কেন একটা হাইজিন পন্যের উপর ১২৭% ট্যাক্স ধরা হবে? কেন এটা বিলাসী পণ্য হবে?

সংবিধান অনুযায়ী, স্বাস্থ্য নাকি আমাদের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের একটি। তাহলে, মেয়েদের প্রজনন স্বাস্থ্য, তার সুরক্ষা-নিরাপত্তা কেন বিলাসিতার কাতারে? গত বাজেট অধিবেশনে স্যানিটারি প্যাডের উপর আরো ভ্যাট বসানোর প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছিল। প্রবল আপত্তির মুখে তা ঠেকানো গেছে। তাই আগের ভ্যাটই প্রযোজ্য হয়। কিন্তু আমদানিতে তা বিলাসী পণ্যের তালিকায় রয়ে গেছে।

আর এই বিলাসিতার খেসারত দিতে গিয়ে বাংলাদেশের ৮৫ শতাংশ মেয়ে এখনও কাপড় ব্যবহারে বাধ্য হয়। স্কুল কামাই করে, তাদের উৎপাদনশীলতার গতি হ্রাস পায়। আমরা যদিও মুখে মুখে বলছি, মেয়েদের প্রজনন স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে হবে, কমমূল্যে মেয়েদের হাতে তুলে দিতে হবে, সেই কথাগুলো এই ভ্যাট-ট্যাক্সের চক্করে কেবল ‘বুলি আওড়ানো’ মনে হয়।

পাশের দেশে ভারতে দুই রুপীতে পাঁচটা প্যাডের একটা সেট পাওয়া যায়। তবু তারা ঘরে ঘরে পৌঁছাতে পারেনি। আর আমরা? সর্বনিম্ন ৬০ টাকা রাখি আট পিসের এক প্যাকেট স্যানিটারি প্যাডে। পাঁচ দিনের পিরিয়ড সামাল দিতে এক মাসেই বেরিয়ে যাবে দুই/তিনশ টাকা। কজনের সামর্থ্য আছে এই টাকা জোগাড়ের? যেখানে তার নেই কোন আয়ের উৎস? চেয়ে থাকতে হবে বাবা-ভাই-স্বামীর রোজগারের উপর? এটা তো তাহলে বিলাসী পণ্যই, তাই না? তার জন্য তো তবে কাপড়ই ভালো।

টাকার অভাব, খাবারের অভাব, বিনোদনের অভাব, সুচিকিৎসার অভাবের পাশাপাশি, পিরিয়ডের এই সময়টার অর্থের টানাটানি বা সংস্থান করতে না পারাকে তাই আভিধানিক আর বিলাসী নাম দেয়া হয়েছে ‘পিরিয়ড পোভার্টি’।

আর এইখানেই আমার ভাবনার জায়গা। যদি একটা মেন্সট্রুয়াল কাপ দিয়ে ১০ বছর নিশ্চিন্তে কাটানো যায়, তাহলে নয় কেন? কেন তাতেও ১২৭% ট্যাক্স দিয়ে আনতে হবে বাইরে থেকে?

তবু আমি পিছিয়ে যাই না। হ্যাঁ, গুটি কয়েক মানুষকে আগাম কথা দিয়ে তা রাখার জন্যই আমি ১২৭% ট্যাক্স দিয়েই মাল ছাড়িয়ে আনছি। সরকারি কোষাগারের কোথাও না কোথাও সেই টাকা তো জমছে!

আমার আয় সীমিত। তাই জমার পরিমাণ তাই আরও সীমিত। তা দিয়েই এই দুর্গম গিরি পার হবো একদিন। যেদিন আমার পাশে আরো কয়েকজন মানুষকে পাবো, যারা আমার মতো স্বেচ্ছায় ‘এডভোকেট’ হবে মেন্সট্রুয়াল কাপের প্রচার এবং প্রসারের জন্য। এই যাত্রা তবু অব্যাহত থাকবে।

শেয়ার করুন:
  • 63
  •  
  •  
  •  
  •  
    63
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.