আত্মবিশ্বাসী হোন হে শিক্ষিত নারী

উপমা মাহবুব:

তিনি একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় স্বর্ণপদক প্রাপ্ত। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বনামধন্য একটি উন্নয়ন সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। শোবিজ জগতের পরিচিত মুখ – একই সঙ্গে মডেল, নায়িকা এবং গায়িকা। তার কিছু ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশ পেয়েছে। আর যায় কই, সেইসব ছবি নিয়ে হুড়োহুড়ি আর ছি ছি – দুটোই সমান তালে শুরু হলো। অবশ্য এগুলো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।

তাহলে নতুনটা কী? নতুন হলো সেই তরুণী সাইবার ক্রাইম ইউনিটে কেস ফাইল করেছেন। কেসটা শুধু এ্যাকাউন্ট হ্যাকারের বিরুদ্ধে না, যে সব গণমাধ্যম ইস্যুটিকে পুঁজি করে গল্প ছড়াচ্ছে, বানিয়ে বানিয়ে ওনার সাক্ষাতকার প্রকাশ করেছে তাদের বিরুদ্ধেও।

অন্যজন একজন বিখ্যাত লেখকের প্রাক্তন স্ত্রী। তিনি নিজেও ভালো গল্প এবং কবিতা লেখেন, তবে সেই পরিচয় লেখকের স্ত্রীর পরিচয়ের নিচে চাপা পড়ে ছিল। ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর সেই লেখক স্বত্তার প্রকাশ আমরা দেখতে পেয়েছি। তাঁর ক্ষেত্রে নতুন খবর হলো, তিনি সম্প্রতি আবার বিয়ে করছেন। ৫৬ বা তার বেশি বছর বয়সে এসে একজন ডিভোর্সি বাঙালী নারীর মনের মতো সঙ্গী খুঁজে পাওয়া এবং তাঁকে বিয়ে করা বেশ আনকোরা ঘটনাই বটে।

ঘটনা দুটো আলাদা, কিন্তু আমার মতে এখান থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয় একটাই – নিজের সম্মান, মর্যাদাসহ নিজ জীবনের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয়। নিজের সিদ্ধান্তও নিজেকেই নিতে হবে। পৃথিবী সবলদের জায়গা। আমি যত আত্মবিশ্বাসী ও স্বনির্ভর হবো, যত আমার নিজের অবস্থান শক্ত করতে পারবো, তত আমি দৃঢ়ভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারবো। স্রোতের বিপরীতে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবো। এটাই জগতের রুঢ় সত্য। ঠিক এ কারণেই মিথিলা বা গুলতেকিন সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। তারা অভিনন্দন এবং সমালোচনা কোনটাতেই ভেসে যাচ্ছেন না। ঠাণ্ডা মাথায়, চিন্তা করে প্রতিটা পদক্ষেপ নির্ধারণ করছেন। প্রচুর মানুষকে তারা পাশেও পাচ্ছেন।

আমি যদি দুর্বল হই তাহলে একটা সময় পর্যন্ত হয়তো কেউ আমাকে আগলে রাখবে, কিন্তু সারা জীবন তা সম্ভব হবে না। এ কারণেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যে গৃহবধূ প্রতিদিন মুখ বুঁজে মার সহ্য করেন, তার পরিবার তাকে বার বার বলে, মানিয়ে চলো। কেননা সে তো অবলা, তার পক্ষে দাঁড়ানো মানেই তার দায়িত্ব নিতে হবে। একজন গ্রামের প্রান্তিক নারী যখন অসহায় হয়, তখন তা মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু একজন শিক্ষিত নারী যখন অসহায়ের মতো আচরণ করেন, তখন তা মেনে নেওয়া কষ্টকর।

একটা উদাহরণ দেই, একবার একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকাকে তার স্বামী প্রচণ্ড মারধর করে আহত করেছেন – এ রকম একটা খবর নিয়ে সারা দেশে খুব হৈচৈ পড়ে গেলো। তখন নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করেন এ রকম এক বড় বোন আমাকে বলেছিলেন, এ রকম উচ্চশিক্ষিত, এলিট ব্যাকগ্রাউন্ডের কোনো নারী যদি পড়ে পড়ে মার খান, তার হয়ে সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে যদি আমাদের রাজপথে নামতে হয়, এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে।

অসহায় নারীদের জন্য বাংলাদেশে অনেক সংস্থা কাজ করে। সরকার নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে আমার মনে হয় সবচেয়ে প্রয়োজনীয় যে উদ্যোগ সেটাতে আমরা এখনও পিছিয়ে আছি। নারীদের যোগ্য এবং আত্মবিশ্বাসী হয়ে বেড়ে উঠার, সমাজে নিজের জায়গা তৈরি করার কোনো বিকল্প নেই। সমাজে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর নারী সদস্যদের সুরক্ষায়, তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমাদের আরও দীর্ঘ সময় কাজ করে যেতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রতিবছর যে বিপুলসংখ্যক নারী স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করছেন তাদের বড় অংশই এখনও মনের দিক থেকে দুর্বল। তারা আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভোগেন। নইলে নারী শিক্ষার দিক আমরা অগ্রগামী আবার পারিবারিক সহিংসতার হারও বেশি – এ রকম অসমাঞ্জস্য বাংলাদেশে বিদ্যমান থাকার কথা না।

রুঢ় হলেও সত্য, সাহসী ও শক্তিশালীর পাশে সবাই সাথে। মিথিলা বা গুলতেকিন যদি সমাজে প্রতিষ্ঠিত নারী না হয়ে নিম্নবিত্ত পরিবারের অতিসাধারণ দুজন সদস্য হতেন, তাহলে তারা সহজেই এতো বোল্ড সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। আজকে এতো মানুষ তাদের পক্ষ হয়ে সমালোচকদের বিরুদ্ধে কথা বলতো না।

মুশকিল হলো, আমরা এখন পর্যন্ত – নারীর পক্ষে দাঁড়াতে হবে, তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে, এই ক্যাম্পেইনেই বেশি জোর দিচ্ছি। অথচ একটু ভেবে দেখুন, শিক্ষিত নারীরা যদি নিজেদের জীবনের দায়িত্ব নিজেরাই নিতে পারেন, তারা যদি সাহসী এবং আত্মবিশ্বাসী হোন, তাহলে – সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে, এ রকম নারীর সংখ্যা কতটা কমে যাবে!

শিক্ষিত সমাজ তাদের কন্যাদের পড়ালেখার বিষয়ে যতটা যত্নশীল, কন্যাদের আত্মবিশ্বাসী এবং স্বনির্ভর করার বিষয়ে ততটা নন। আমরা মনে করি আমরা আমাদের কন্যাকে নিরাপত্তার বলয় দিয়ে ঘিরে রাখব। বিয়ের পর তার স্বামী তাকে নিরাপদ এবং নিশ্চিত জীবন দেবে। এই চিন্তার কারণে আমাদের সমাজে শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-গরীবভেদে নারীরা দুর্বল মানসিকতার অধিকারী হয়ে বড় হচ্ছে। বিপদের সময়, সহিংসতার শিকার হলে বা সমাজের বিপরীতে গিয়ে ব্যক্তিগত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হলে অনেকেই আপনজনদেরও পাশে পান না। পেলেও একজন মানুষকে দীর্ঘমেয়াদে সহযোগিতা করার মতো অবস্থা সেই মেয়েটির পরিবার, নারীর অধিকার নিয়ে কর্মরত সংগঠন বা রাষ্ট্র কারই নেই। দুর্বলের প্রতি সেই দায় কেউ বোধও করে না।

তাই আপনার কন্যাকে সাহসী এবং আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলুন। তার জীবনের দায়িত্ব তাকেই নিতে উৎসাহিত করুন। দেখবেন তার প্রয়োজনের সময় অনেক মানুষ তার পাশে দাঁড়াবে। তার একটা সাহসী সিদ্ধান্ত আর পাঁচটি মেয়ের জন্য উদাহরণ হবে। আর, সমাজ ও রাষ্ট্র সত্যিই যে নারীদের সহায়তা প্রয়োজন সেই প্রান্তিক নারীদের পাশে বেশি করে দাঁড়ানোর ফুসরত পাবে।

অধিকার কে কাকে দেয়?
পৃথিবীর ইতিহাসে কবে কোন অধিকার বিনা সংগ্রামে শুধু চেয়ে পাওয়া যায়?
কখনোই নয়। কোনদিনও নয়।
অধিকার কেড়ে নিতে হয়, লড়ে নিতে হয়।

মুক্তির অধিকার, মানুষের মতো করে বাঁচবার অধিকার।
শিক্ষার অধিকার। হক কথা সোচ্চারে বলবার অধিকার।
শান্তির অধিকার। শিশু শিশু কুঁড়িদের ফুটবার অধিকার।।

এসব তো আমাদের জন্মগত।। তবে কেন এত হাহাকার!
ঘরে বসে বসে ক্রন্দনে নয়, অধিকার চিনে নিতে হয়। রক্তে কিনে নিতে হয়।।

পৃথিবীর ইতিহাসে কবে কোন অধিকার বিনা সংগ্রামে শুধু চেয়ে পাওয়া যায়?
কখনোই নয়। কোনদিনও নয়।
অধিকার কেড়ে নিতে হয়, লড়ে নিতে হয়।

(সলীল চৌধুরী)

শেয়ার করুন:
  • 3.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    3.1K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.