‘নিজের ব্যর্থতার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপাবেন না’

দিনা ফেরদৌস:

স্কুলে পড়ার সময় যাদের লেখা বা কথাবার্তা সময়ের চেয়ে অনেক এগোনো দেখতাম, তাদের প্রতি এক ধরনের মুগ্ধতা কাজ করতো। অনেক বড় মাপের মানুষ মনে করতাম তাদের। কিন্তু বড় হতে হতে জানাশোনার পরিধি যখন বাড়তে থাকলো তখন খেয়াল করলাম, সেইসব মানুষের কথা বা লেখা আর টানে না তেমন। কারণ তারা আর এগোননি, সময়ের সাথে সাথে তাদের যতোটা এগিয়ে থাকার কথা ছিল। ঝুড়ি থেকেও নতুন কিছু বের হয় না, শুধু অতীত নিয়ে কপচানি ছাড়া। এই সময়ে এসে অনুভব করলাম, মানুষের মুগ্ধ হওয়ার ক্ষমতা কমছে দিন দিন।

তিনদিন ধরেই দেখছি গুলতেকিন খানের বিয়ে নিয়ে প্রগতিশীলদের পক্ষে বিপক্ষে লিখা। অভিনন্দন আর শুভ কামনা ছাড়া বলার বিশেষ কিছু পাইনি আজও এইসব ক্ষেত্রে। কামনা টামনায় যদিও বিশ্বাসী না, নিজেকে ভালো নিজে না রাখতে না পারলে পীর ফকিরের দোয়ায় কিছু হওয়ার না। বিয়ে নিয়ে কথা বলার আগে ভাবা দরকার, বিয়েটা আসলে কী? অপর দুইজন মানুষের বিয়েতে আমাদের লাভ-ক্ষতিটাই বা কী? যে বিয়েটা শুধুই দু’জন দুজন ব্যক্তির খুবই ব্যক্তিগত একটি সামাজিক সম্পর্ক, সেখানে তৃতীয় ব্যক্তির ভূমিকাটাই বা কী?

কে, কখন, কাকে, কোথায়, কেনো, কীভাবে, কোন সময়ে বিয়ে করবে, (আইনত কোনো বাধা না থাকলে) তা একান্তই তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। সবার বিয়ে সুখকর হয় না যেমন ঠিক, তেমনি বিয়ে করে সবাই অসুখী নয় এটাও তো সত্যি। নিজে যদি বিয়ে করে সুখী না হই, তার দায় অবশ্যই আমার মনে করি।

যেই কারণে অসুখী ছিলাম সেখান থেকে বের হয়ে নিজেকে সুখী করার চেষ্টা করেছি কি? নাকি কান্না করেছি সমাজের ঘাড়ে সব দায় চাপিয়ে? বিয়ে নামক চুক্তিতে মোটা কাবিনের শর্ত ছাড়া, নিজের চাওয়া পাওয়ার আর কোনো শর্ত দিয়ে না থাকলে, পরে হাজার চেঁচায়েও লাভ হবে না এই ওই পেলাম না বলে। সবসময় ওই পক্ষ থেকে পাওয়ার আশা না করে নিজেকে নিজে কী দেয়া যায় তাই দিয়ে শুরুটা করা উচিত। আমি অনেক প্রগতিশীল নারীদের মুখে শুনি যে পুরুষরা কমবয়সী মেয়েদের পছন্দ করে, সুন্দরী মেয়েদের পছন্দ করে।

কথা হচ্ছে, ঘুরেফিরে ওই অন্যের অতি ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আপনারা কম কচলান না। কোনো পুরুষ যদি নিজের পছন্দসই মেয়ে পায় তো আপনার সমস্যা কী? যে মেয়ে বিয়ে করছে, আর যার পরিবার দিচ্ছে (যদি বাল্যবিবাহ না হয়ে থাকে) তারা কি না বুঝে করছে? এখন বলবেন সেই মেয়ে ও তার পরিবার লোভী?

সব বুঝলাম, কিন্তু আপনার আসল সমস্যাটা কোথায় বুঝলাম না। যাকে যার ভালো লাগবে তাকে সে বিয়ে করতেই পারে, যদি প্রাপ্তবয়স্ক দুজন মানুষের সম্মতি থাকে। আর আমি তো মনে করি অঞ্চল, দেশ, জাত, ধর্ম, বর্ণ, ধনী, গরীব, সাদা, কালো খুঁজতে গিয়ে আমাদের মতো কনজারভেটিভ মানুষের সঙ্গী জোগাড় করা কঠিন একটি ব্যাপার, এইসব ভেঙে এখন বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে।

সমাজ মুখের কথায় পাল্টায় না, গুলতেকিন খানের মতো সাহসী পদক্ষেপেই পাল্টায়। তার মধ্যে আছে একজনের ব্যক্তিগত পছন্দ নিয়ে ঘরে-বাইরে মাতামাতি। এই মানুষগুলো যদি একবেলা না খেয়ে থাকে বা বিষন্নতায় ভোগে তবে সান্ত্বনা দিতে কেউ যাবেন না, যারা ঘাপটি মেরে বসে থাকেন নীতিবাক্য শোনাতে।
আজ আমার খুব প্রিয় ও যাকে এক সময় নিজের আদর্শ ভাবতাম এমন একজনের স্ট্যাটাস দেখে আর আশ্চর্য হইনি; যিনি বলেছেন, “বিয়া করাটার নাম নারী স্বাধীনতা না। বরং উল্টা। বিয়া না কইরা, ত্যাগ না কইরা, মাইনষের করুণার পাত্রী না হইয়া, পরনির্ভর না হইয়া, মাথা উঁচা কইরা বাঁচার নাম নারী স্বাধীনতা। ভুইলা গেলে চলবে না বিয়া জিনিসটাই নারী বিরোধী”।

সবই বুঝলাম, শুধু বুঝলাম না এতো নারী স্বাধীনতা বুঝে তিনি কেনো তিনবার বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলেন? কেউ লিভ টুগেদার করলে তার বিরুদ্ধে কথা বলাটাকে যেমন অসভ্যতা মনে করি, তেমনি কারও বিয়ে করা নিয়ে কথা বলাটাকেও অসভ্যতা মনে করি। দয়া করে আপনারা অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলাটা বাদ দেন, আপনাদের মুখে এইসব মানায় না। নিজের ব্যক্তি জীবনের ব্যর্থতা দিয়ে সবার জীবন মাপার কোন মানে হয় না। দিনশেষে ভালো থাকাটা অনেক বড় বিষয়, তা যে যেইভাবে পারে তার সেইভাবে থাকাটাই উচিত। কথাগুলা বলার কারণ আপনাদের মতো প্রগতিশীলদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি, প্লিজ আপনারা আর একটু কোমল হোন।

তর্কের খাতিরে তর্ক করাই যায়। কিন্তু দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা বলাটা প্রগতিশীল দাবি করা লোকদের মুখে চরম অশ্লীল লাগে। কথা তো সেই এক, আমারে নেয় না, তারে নেয়। তখন বলতে হয়, হোয়াই আর ইউ সো স্পেশাল? তোমাকে আরেকজনের নিতেই হবে কেনো? এতো ক্ষমতা থাকলে তুমি নিজের পছন্দসই কাউকে বেছে নাও। আর যদি না পাও সেটাও একান্ত তোমার ব্যর্থতা। এজন্য আরেকজন পেলে তাকে খুঁচিয়ে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়াটা, তোমার দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশই বটে। যে তোমাকে চায় না, তার কাছে তোমার সব যোগ্যতার মূল্য জিরো। আর যে তোমাকে চাইবে সে তোমার সব অযোগ্যতার মধ্যেও সৌন্দর্য খুঁজে পাবে।

চ্যাটাং চ্যাটাং কথা সবাই জানে, কথা জানলেই সব কথা বলতে হয় না, কোথায়, কখন কী বলা উচিৎ তা বুঝে বলার নামই কথা বলার স্বাধীনতা।

আমি মনে করি কারো বিয়ে, সংসার, বাচ্চা হওয়া এমনকি কেউ যদি লিভটুগেদারও করে তা নিয়ে কথা বলাটা চরম অসভ্যতা। আমার সেই প্রিয় ব্যক্তির লেখায় আরও উঠে এসেছে “এক মহিলার বুইড়া বয়সের বিয়া সমাজ মাইনা নিছে”। কে বুইড়া, কে কাইল্যা, কে আন্ধা এইসব নিয়ে কথা বলাটা চরম বর্ণবাদী। সমাজ তো তেনার এইসব কথাতেও লাইক দেয়। সমাজ কী মেনে নেয় আর নেয় না তা সমাজের ব্যাপার।

তিনি নিজেও কি খুব স্বাভাবিকভাবে নিয়েছেন ব্যাপারটিকে? কারও এজাতীয় কথা শুনে আমার রাগ হয় না, খারাপ লাগে। ভেতরে ভেতরে এইসব মানুষ কতোটা একা, কতোটা অসহায় হলে নিজেকে এতো ক্ষুদ্রভাবে প্রকাশ করে। তার জন্য সব দায় সমাজের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে হবে না, নিজেকে সময়মতো যুগোপযোগী করতে না পারার দায় কিছুটা নিজের উপরও বর্তায়।

শেয়ার করুন:
  • 184
  •  
  •  
  •  
  •  
    184
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.