একা মানুষের কষ্টটা কি জানেন?

নাঈমাহ তানজিম:

আপনারা কেউ জয়া আহসান অভিনীত ‘বিসর্জন’ সিনেমাটা দেখেছেন? অথবা ঐশ্বরিয়া রাই অভিনীত ‘চোখের বালি’? দেখলে হয়তোবা বুঝতেন, একজন বিধবা/ডিভোর্সির কতোটা কষ্ট!

আচ্ছা, এগুলি নাহয় উপন্যাস-চলচ্চিত্রের চরিত্র। একটু বাস্তব জীবনে আসি?

আমার বাবা যখন মারা যান তখন আমার মায়ের বয়স খুব বেশি না। ৩৭-৩৮ হবে। এরপর কেটে গেছে ১৬ বছরেরও বেশি সময়।

কোনওদিন সাহস করে মাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি, “মা, তোমার একা লাগে না?”, “মা, তোমার কারোও সাথে গল্প করতে ইচ্ছা করে না? আমাকে তো আর সব কথা বলতে পারো না।”

একবার মনে আছে আমার এক কাজিনের গায়ে হলুদ হচ্ছে। কোনও কারণে বাসায় কারেন্ট নেই। আম্মু অন্ধকারে একটা শাড়ি পরে অন্যপক্ষের সাথে দেখা করতে গেলো। আম্মু হাসতে হাসতে বলছিলো, “অন্ধকারে যা পাইছি, তাইই পরে চলে আসছি।” অন্যপক্ষের এক আপু তখন খুব বিজ্ঞের মতোন বললো, “তাও তো আন্টি সাদা শাড়িটাই পেয়েছেন, অন্ধকারে যদি লাল শাড়িটা উঠে যেতো?”

এখন ওই আপুকে সামনে পেলে জিজ্ঞেস করতাম, “কেন? আমার মা লাল-কমলা-রানী গোলাপী যে রঙেরই শাড়ি পরুক, আপনার এমন কী ক্ষতি হচ্ছে? আপনার দুনিয়াটা তো এক আঙুলের সমান, নাহলে জানতেন, খ্রিস্টানরা সাদা রঙ পরে বিয়ে করে।”

সম্প্রতি কবি গুলতেকিন খান ৫৬ বছর বয়সে আবার বিয়ে করেছেন। এবং তার একমাত্র পুত্র নূহাশ অত্যন্ত গর্বের সাথে জানিয়েছেন যে তিনি নিজেই তার মায়ের আবার বিয়ে দিয়েছেন। কী সুন্দর! কী অসম্ভব সুন্দর! বাবা-মা যদি ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিতে পারেন, ছেলে-মেয়েরা কেন নিঃসঙ্গ বাবা অথবা মাকে বিয়ে দিতে পারবে না? বরং আরও বেশি পারবে। কারণ ছেলে-মেয়েরা বুঝে, ‘মা একা’, ‘বাবা একা’, ‘ওরও কাউকে দরকার হয় দুইটা কথা বলার জন্য’।

গুলতেকিন খানের আগে বিয়ে হয়েছিল লেখক হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে। তাঁর এই দ্বিতীয় বিয়ের পর অনেককে বলতে শুনেছি, “এখন আর বিয়ে করে কী লাভ? বাচ্চাও তো হবে না, যৌবনও তো গ্যাছেগা।”

ও, তার মানে ‘বিয়ে’ নামক সামাজিক প্রথা শুধুমাত্র বাচ্চা পয়দা করার জন্য? আর শুধুই আইনত শয্যাসঙ্গী পাওয়ার জন্য?

নাকি একটা বই পড়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে প্রিয় মানুষটাকে বলার জন্য? একটা গান শুনে আনমনা হয়ে একজন প্রিয় মানুষকে কল্পনা করার জন্য? একসাথে বৃষ্টিতে ভেজার জন্য নয়? একসাথে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখার জন্য নয়??

যদি আপনার উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে বলবো, আপনি বিয়ে মানে কী সেটাই বুঝেন না। কোনদিন বুঝবেনও না। আপনার হয়তোবা একজন স্বামী/স্ত্রী আছে, কিন্তু কোনও সঙ্গী নেই। আপনি একা।

এবার একটু আসি ‘ডিভোর্সি’ মেয়েদের কথায়। যাদেরকে বাংলায় বলাই হয়, ‘স্বামী পরিত্যক্তা’। বাহ! কী সুন্দর! যেন স্বামীই স্ত্রীকে পরিত্যাগ করতে পারেন, স্ত্রী পারেন না। ‘স্ত্রী পরিত্যক্তা’ শব্দটা শুনেছেন কখনো?

এদের জীবনটা আরও অদ্ভুত। এদের সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবীরাই এদের নিয়ে গসিপ করে। এরা নিজের পরিবারের সাথে বেড়াতে গেলেও দেখা যায়, পাশের রুমে খালা-মামীরা গুজগুজ করছে, “আচ্ছা, ওর বিয়েটা কেন ভাঙলো? কী সমস্যা ছিলো?” যেন গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা, ওজোনস্তর ছিদ্র হয়ে যাওয়া থেকেও আপাতদৃষ্টিতে এইটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমস্যা।

যে নারী ৩০ বছর বয়সে বিধবা হোন, তার বাকি ৩০/৩৫/৪০ বা ৫০ বছর কীভাবে কাটবে? কেউ ভেবেছেন? আচ্ছা এখনকার মেয়েরা নাহয় শিক্ষিত, নিজেরাই চাকরি করতে পারে। অথবা মা-বাবার কাছ থেকে অর্থনৈতিক সাহায্য পেতে পারে। কিন্তু মন? কিন্তু রিকশার পাশের খালি জায়গাটা? কিন্তু বাচ্চার স্কুলের ফর্মে ‘পিতার নাম’ লেখা জায়গাটা? সেটা কীভাবে পূরণ হয়?

আমার মা এবং আমার একজন খালা বিধবা। আমি জানি আমার গায়ে হলুদে উনারা আমাকে হলুদ ছোঁয়াবেন না। কারণ উনারা নিজেরাই নিজেদের ‘অশুভ’ ভাবেন, নিজেদের সবরকম ‘শুভ’ থেকে দূরে রাখেন।

কিন্তু সত্যি বলছি, আমার জীবনে এই দুই নারীর থেকে শক্তিশালী এবং শুভ নারী আমি আর দেখিনি। আমার মা তার ১৬টা বছর আমার বাবা ছাড়া একা একা এই নিষ্ঠুর, নোংরা সমাজের সাথে লড়াই করে যাচ্ছেন, এবং যাবেন। তার কোন ‘পুত্রসন্তান’ও দরকার হয়নি। সে একাই একশ। আমার জীবনের অন্যতম অনুপ্রেরণা এই দুই নারী। আমাকে ‘আমি’ বানাতে অনেকখানি অবদান রেখেছেন এই বিশেষ দুই নারী।

আর ডিভোর্সিরা? তারা তো দেবী দূর্গার থেকেও বেশি শক্তিশালী। সমাজের বাঁকা দৃষ্টি অগ্রাহ্য করে, সন্তানসহ অথবা সন্তানছাড়া তাদেরকে মাথা উঁচু করে গটগট করে হেঁটে যেতে দেখেছি। কাউকে পাত্তা না দিয়ে নিজেকে নিজের পরিচয়কে বানাতে দেখেছি।

আপনাদের ধারণা নারী একা চলতে পারে না বলে আবার বিয়ে করে? না। কোনওভাবেই না। বরং নারী তখনই আবার বিয়ে করে যখন সে অনুভব করে যে সে নিজে তো চলতে পারবেই, এবং সে এখন আরেকটা সম্পর্কের জন্যও তৈরি। বিধবা হলে আগের মানুষটার স্মৃতিকে বুকে নিয়ে, নতুন আরেকজনের হাত ধরে। আর ডিভোর্সি হলে, পুরানো ক্ষত সারিয়ে উঠে, ফিনিক্স পাখির মতোন আবার উঠে দাঁড়িয়ে নতুনভাবে সব শুরু করার সাহস করতে পারে।

আমার বাবা যখন মারা যান, আমি অনেক ছোট। ১২-১৩ বছর বয়স। এই প্রশ্নগুলা যদি তখন বা, তার আর ২-৩ বছর পরেও আমার মাথায় আসতো, আমি সত্যি আমার মায়ের আবার বিয়ে দিতাম। সমাজ যাইই বলুক, যতই ছিঃ ছিঃ করুক, সত্যিই দিতাম।

আমার মায়ের বুকের মধ্যে জমে থাকা ‘বিধবা’ ডাক শোনার কষ্ট, আমার মায়ের কারো গায়ে হলুদে না যাওয়া, আমার মাকে আর সব রঙ বাদ দিয়ে শুধু ‘সাদা শাড়ি’ গিফট দেওয়া, এইসবকিছুর উপযুক্ত জবাব দেওয়া হতো তখন।

শেয়ার করুন:
  • 716
  •  
  •  
  •  
  •  
    716
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.