বিয়ের বয়স, বয়সের বিয়ে

শাহরিয়া দিনা:

এক বন্ধু যিনি ক্লাসমেটকে বিয়ে করেছেন। দাম্পত্য জীবনের এক যুগ পাড়ি দিয়ে তিনি এখন স্ত্রীর বয়স নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগছেন। সেদিন বললেন, বিয়েতে ছেলেমেয়েদের বয়সের ব্যবধান নিয়ে লিখতে পারো।
– কেমন?
– না মানে বলছিলাম, স্বামী-স্ত্রী সমবয়সী হলে অনেক সমস্যা। অন্তত ৫ -১০ বছরের ডিফারেন্স ভালো।
– কিন্তু অনেকেই সমবয়সী বিয়ে করে দারুণ বন্ধুত্বপূর্ণ দাম্পত্য জীবন কাটাচ্ছেন। দাম্পত্যে বয়স খুব বড় ব্যাপার বলে মনে হয়।

তিনি আমার কথায় খুশি হলেন না স্পষ্ট বুঝলাম। আমাদের সমাজে বিয়ের বয়স নিয়ে অনেক ধারণা প্রচলিত। এর মধ্যে মেয়েদের ইন্টারমিডিয়েট শেষ হলেই অভিভাবকদের তাকে বিয়ে দেবার ব্যাপারে হালকা প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। অনার্স ফার্স্ট ইয়ার বা সেকেন্ড ইয়ারে পাত্র খোঁজা শুরু হয়ে যায়। এক্ষেত্রে তারা অবশ্যই ক্যারিয়ারে ভালো স্টাবলিশ পাত্র চান। একটা ছেলে পড়ালেখা শেষ করে ক্যারিয়ার গোছাতে বয়সটা ত্রিশ ছাড়িয়ে যান অনেকেই মধ্য ত্রিশে পৌঁছে যান নিঃসন্দেহে। এটাই মোটামুটি প্রচলিত ফর্মেট।

এই চিরাচরিত নিয়মের বাইরে কিছু হইলেই বিপত্তি। বিপত্তিটা আপত্তিতে রূপ নেয় তখনই যখন কোনো ক্রমে মেয়ের বয়স ছেলেটার চাইতে বেশি হয়ে যায়। সুবর্ণা যখন ১৪ বছরের ছোট সৌদকে বিয়ে করে আমরা ছিঃ ছিঃ রব তুলি। বয়স ছাড়াও দেখতে বয়স্ক লাগে বলে আমরা ট্রল করি। ক্রিকেটার মিরাজ বা তাসকিন আন্টি বিয়ে করছে, মুমিনূল হক মা’র বয়সি মেয়েকে বিয়ে করেছে ইত্যাদি বলে। ক্রিকেট খেলে বলে তাদের জীবনসঙ্গী নির্ধারণেও যেন বাঙালি ফেইসবুকারদের মতামত নিতে হবে!

অথচ বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যান শচীন টেন্ডুলকারের স্ত্রী অঞ্জলি তার থেকে ছয় বছরের বড়। সবচেয়ে ঠাণ্ডা মাথার খেলোয়াড় এমএস ধোনীর স্ত্রী সাক্ষী সাত বছরের বড় তার থেকে। আয়েশা তো ১২ বছরের বড় শেখর ধাওয়ানের থেকে। এমনকি আনুশকাও সিনিয়র ভিরাটের থেকে।

অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কথা নাহয় বাদই দিলাম। প্রিয়াঙ্কা চোপড়া ১০ বছরের জুনিয়র নিক জোনাসকে বিয়ে করেছেন বলে আমাদের খোদ রাষ্ট্রপতিও রসিকতা করেছিলেন।

এক রাষ্ট্রপ্রধানের প্রেমের গল্প বলি, নাহ! সেই আমলের সপ্তম এডওয়ার্ডের ভালোবাসার মানুষের জন্য সিংহাসন ত্যাগের গল্প না বরং হাল আমলের গল্প এটি।

পনের বছর বয়সী হাই স্কুলের ছাত্র, যার স্বপ্ন ছিল একজন ঔপন্যাসিক হবার। স্কুলে জীবনে তিনি ছিলেন খুবই মেধাবী। উচ্ছল, প্রাণবন্ত এই কিশোর প্রেমে পড়েন ৩৯ বছর বয়সী তিন সন্তানের জননী, তারই স্কুলেরই ড্রামা টিচারের!

ছাত্রের এহেন ভালোবাসার কথা শুনে শিক্ষিকা যিনি তার থেকে ২৪ বছরের বড়, শুরুতে তিনি ভীষণ হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। তারপর সাময়িক মোহগ্রস্ততা ভেবে তেমন একটা আমলেও নেননি বিষয়টাকে। ভেবেছিলেন, কিছুদিন পরেই এই ভালবাসা হাওয়ায় মিশে যাবে। কিন্তু তা হয়নি, ভালবাসা বরং হাওয়ার না মিলিয়ে জাঁকিয়ে বসেছে মনের মধ্যে।

ছেলেটির পরিবার যখন জানতে পারেন এরকম একটা অসম সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন তখন তারা এটাকে থামাতে চেয়েছেন। তাকে শহর থেকে দূরে পাঠিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নেন। হাই স্কুল শেষ করে তিনি গ্র্যাজুয়েশন করতে চলে যান অন্য শহরে।

স্কুল ছেড়ে যাবার পর তাদের দু’জনের মধ্যে টেলিফোনে দীর্ঘ কথোপকথন হতো। ধীরে-ধীরে শিক্ষিকার মন জয় করেন ছাত্র। দু’জনের মধ্যে যখন প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে, তখন শিক্ষিকা ছিলেন বিবাহিতা এবং তিন সন্তানের জননী।

তিনি গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে নিজের শহরে ফিরে আসেন। নিজের ক্যারিয়ার তৈরি করে তারপর বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। কৈশোরের ক্রাশ, তারুণ্যের প্রেমিকাই যৌবনে তার স্ত্রী। ২০০৭ সালে কিছুটা আড়ম্বরভাবেই তাদের বিয়ে হয়।

তার নিজের ভাষায় – আমি তার সামনে, তার সাথে বেড়ে উঠেছি! আমার জীবনের প্রতিটা মুখ্য এবং গৌণ মুহুর্তে আমি তাকে পাশে পেয়েছি। সে আমার ফ্রেন্ড, ফিলসফার, গাইড। আমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তার অবদান অসামান্য। সে না থাকলে আমি আজ ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হতাম না! তিনি না থাকলে আমি, আমি হতাম না……

ফ্রান্সের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ৪০ বছর বয়সী ইমানুয়েল ম্যাক্রন আর ফার্স্টলেডি ৬৪ বছর বয়সী ব্রিজিত ম্যাক্রন। এটা তাদের প্রেমকাহিনী।

মি: ম্যাক্রন যখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য মনস্থির করেন, তখন তারা অনেক বেশি জনসম্মুখে আসেন। তাদের দু’জনের বয়সের ব্যবধান নিয়ে অনেক কথা শুনতে হয়েছে ম্যাক্রন এবং ব্রিজিথকে। মাঝেমধ্যে এসব সমালোচনার জবাবও দিয়েছেন মি: ম্যাক্রন।

একবার তিনি বলেছিলেন, “বয়সের ব্যবধানটা যদি উল্টো হতো, অর্থাৎ আমি যদি আমার স্ত্রীর চেয়ে ২৪ বছরের বড় হতাম, তাহলে বিষয়টিকে কেউ অস্বাভাবিক বলতো না। মানুষ ভিন্ন কিছু দেখে অভ্যস্ত নয়।”

জাতি হিসাবে আমরা মিশ্র কিছুটা মুখোশধারী। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ বলে যেকোন ইস্যুতের ধর্ম টেনে ঝাপিয়ে পরি তবে ধর্ম কতটা ধারণ করি তা প্রশ্নবিদ্ধ নিঃসন্দেহে। নবীজি প্রথম বিয়ে করেছিলেন ২৫ বছর বয়সে যখন তার স্ত্রী খাদিজা’র বয়স ৪০। খাদিজা জীবিত থাকাকালে তিনি আর বিয়ে করেননি। একজন ছাড়া বাকিসব সন্তানের জন্ম খাদিজার গর্ভে। একবার ভাবুন কোন ছেলে এমন বয়সের একজন মহিলাকে বিয়ে করলে এই সমাজে তার মুখ দেখানো কতটা দায় হবে! আপনার বিশ্বাস আপনার চিন্তা সবই ঠিক, শুধু জাজমেন্টাল অন্যের বেলায় তাই না? আসলে বয়সে বড় মেয়েদের বিয়ে করতে গ্যাটস লাগে সেটা সবার থাকে না।

আবার একটা বয়সে পৌঁছানোর পর রুনা লায়লা-আলমগীর কিংবা গুলতেকিন-আফতাব আহমেদ বিয়ে করলে তা-ও আমদের দৃষ্টিকটু লাগে। বয়স হয়ে গেছে এখন মরার জন্য প্রস্তুতি নাও ধারণার বাইরে একটা পৃথিবী থাকে বুঝতে চেষ্টা করি না। সন্তানরা বড় হয়ে গেলে তাদের আলাদা জগৎ তৈরি হলে একাকিত্ব চেপে ধরা মানুষের একজন কথা বলার সঙ্গী দরকার, পাশাপাশি হাঁটার জন্য একটা হাতের অভাব বোধ করে। সেই একাকিত্ব ঘুচানোর জন্য কেউ সঙ্গী পেলে তাতে মন্দ কী!

কে কাকে বিয়ে করবে, কে কার সাথে থাকবে একান্তই তার চয়েস। দুইটা মানুষ যদি সিদ্ধান্ত নেয় তারা একত্রে থাকবে, সেটাতে অন্যদের মাথাব্যাথার কিছু নাইতো। মানসিকতায় মিল হলে বয়সের হিসাব অর্থহীন। বয়স মানুষের শরীরে থাকে মনে না, যেমন সৃষ্টিকর্তা অন্তরে থাকেন, উপাসনালয়ে না। জীবনে সম্পর্ককে সবসময় অংকের সূত্র বা ব্যকরণের নিয়ম মেনে চালাতে চাইলেই চালানো যায় না।

শেয়ার করুন:
  • 6K
  •  
  •  
  •  
  •  
    6K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.