গুলতেকিন খানের বিয়ে এবং নতুন সামাজিক পাঠ

জেরীন আফরীন:

মন খারাপের সময়ে ইথারের বাতাসে কখনও কখনও মন ভালো করা খবর ভাসে। গুলতেকিন খান এবং কবি আফতাব আহমেদ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন, তেমনি একটি মন ভালো করা খবর। সবচাইতে যেই বিষয়টা ভালো লাগলো সেটা হলো আমাদের মানসিকতার বদল।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে অধিকাংশ মানুষই গুলতেকিনের এই সিদ্ধান্তটিকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

জেরীন আফরীন

একজন সমাজ বিজ্ঞানী হিসেবে, বাংলাদেশী সংস্কৃতিতে লালিত নারীদের নিয়ে দীর্ঘদিনের সংরক্ষিত সামাজিক চিন্তা – মননে যুগান্তরী একটা বদল দেখতে পাচ্ছি। অনুভব করছি নারীরা নিজেদের কারও স্ত্রী কিংবা মা এই সীমাবদ্ধ পরিচয়ের বাইরে বের হয়ে নিজেদের মানুষ হিসেবে ভাববার ক্ষমতা রাখছে, তার নিজের জীবনে আনন্দ নিয়ে বেঁচে থাকবার বিষয়টাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এর অর্থ আমরা নারীরা নিজেদের সম্পূর্ণ নারী হিসেবে ভাবতে পারছি। এই দৃষ্টিভঙ্গিটিকে আমি বরং নারীকে নিয়ে সামাজিক ভাবনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বদল হিসেবেই দেখতে আগ্রহী।

পাঁচ বছর আগে দেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাসী হবার সময়টাতে একটা বিষয়ে খুব নাড়া খেয়েছিলাম। গল্পটা বলি, একজন সত্তর ঊর্দ্ধ বৃদ্ধার সাথে স্থানীয় কফির দোকানে দেখা হতো প্রতিদিন। তিনি আসতেন সকালের নাস্তা সারতে, টুকটাক কেনাকাটা করতে। বৃদ্ধা বয়সের ভারে ন্যুব্জ, সারাক্ষণই কাঁপছেন , ডায়াপার লিক করে যে প্যান্ট ভিজেছে সামান্য সেই অস্বস্তিটুকুও খেয়াল করতে পারছেন না। সুপার স্টোর থেকে আধা কেজির মতো মাংস আর একটা ব্রেড নিয়ে ট্রলি ঠেলে ঠেলে বাড়ি ফিরছেন। খানিক পর পরই ট্রলি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সিমেন্ট বাঁধানো পায়ে হাঁটার পথ ছেড়ে আটকে যাচ্ছে ঘাসের লনে। কিছুক্ষণ দেখবার পর আগ বাড়িয়েই গেলাম তাঁকে সাহায্য করতে। বৃদ্ধা ভীষণ বিরক্ত নিয়ে বললো, আমার নিজের কাজটুকু নিজে করতে পারলেই বরং খুশি হবো। সেদিন একটু অপমানিত হলেও বৃদ্ধার শক্ত মনোবল তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে বাধ্য করেছিল নিঃসন্দেহে।

কথা প্রসঙ্গে একদিন জানিয়েছিলেন তার কিছু একান্ত কথা। ছয় মাস আগে স্বামী হারিয়েছেন , সন্তানরা ব্যস্ত নিজেদের নিয়ে। বড় বাড়ি একা ম্যানেজ করতে না পেরে বাড়ি বিক্রি করে ওল্ড হোমে উঠেছেন। কারো প্রতি তার কোন আক্ষেপ নেই। নিজের মতো করে উপভোগ করছেন জীবন। প্রায় প্রতিদিনই দেখা হতো টলোমলো পায়ে হাটতে থাকা বৃদ্ধার সাথে। সামান্য হাসি বিনিময় হতো কিংবা হাই ,হ্যাল্লো।

এর কিছুদিন পর বৃদ্ধাকে দেখলাম তারই মতো একজন বয়স্ক পুরুষের মোবিলিটি বাইকের সামনে দাঁড়িয়ে সকালের নাস্তার জন্য কফি শপে আসতে। দুজনকেই ভীষণ প্রাণবন্ত দেখাতো, বছর খানেক তাদের একসাথে দেখবার পর সেই বৃদ্ধাকে আবারও দেখলাম একা। জানলাম তার পুরুষ বন্ধুটি ইহকালের মায়া ত্যাগ করেছেন সম্প্রতি। তারপর তাকে দেখেছি আনন্দময় সময় কাটাতে আরও একজন বৃদ্ধের সাথে। তাদের বয়স এবং শারীরিক পরিস্থিতি দেখে কখনোই মনে হয়নি বার্ধক্যে এই সম্পর্কগুলো গড়ে উঠবার পেছনে যৌনতা কোনোভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। বরং বাকি জীবনটা আনন্দময় কিংবা সঙ্গময় কাটবে বলে তারা এসেছেন একজন অন্যজনের কাছাকাছি। অথচ নারী – পুরুষের সম্পর্কের চূড়ান্ত পরিণতিতে আমাদের সমাজব্যবস্থায় যৌনতাকেই মুখ্য হিসেবে ধরা হয়।

গুলতেকিন খান এবং কবি আফতাব আহমেদ আপনাদের জানাই অভিনন্দন সাথে শ্রদ্ধা।
আমাদের বাংলাদেশী সমাজের পরিচিত নারী ব্যক্তিত্ব হিসেবে গুলতেকিন খানের এই সাহসী সিদ্ধান্ত অবশ্যই আমাদের নারীর জন্য প্রোথিত ট্যাবুগুলো ভাঙবে বলে আমি মনে করি। এবং তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে খুব স্পষ্টই উপলব্ধি করা যায় একজন নারী তার সন্তানের মা, কারো শাশুড়ী কারো নানী – দাদী কারো স্ত্রীর থেকেও বরং মাঝ বয়সে বেশী ভাবতে পারছেন তিনি একজন মানুষ এবং বেলা ফুরোলে একটি আনন্দময় জীবন কাটানোর অধিকার তাঁরও আছে।

শেয়ার করুন:
  • 532
  •  
  •  
  •  
  •  
    532
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.