নারীর আমৃত্যু নিঃসঙ্গতা: স্বার্থবাদী মনের প্রতিফলন

লতিফা আকতার:

পঞ্চাশোর্ধ একজন নারী বিয়ে করেছেন। আমাদের অনেকেরই ভালো লাগার তিনি। কিছু ভালো লাগা ব্যাখ্যার অতীত হয়। ওনার ক্ষেত্রেও তাই। একজন মানুষ বিয়ে করবেন, সংসার হবে। স্বাভাবিক নিয়ম। প্রয়োজনে ভালো না লাগলে স্থান ত্যাগ করে এগিয়ে যাবেন। যাকে আমরা মুভ করা বলি।

গতকাল রাতে নিউজটা পড়ে বেশ ভালো লাগা নিয়ে ঘুমাতে যাই। কিন্তু আজ সকাল হতে বিষয়টা ভাবিয়ে তোলে। কেন এতো আলোচনা!! কেন আমি বা আমার মতো অনেকেই খুশি! কেন একটা স্বস্তি কাজ করছে মনের মধ্যে? নিজের মনে উঁকি দিলে আসলে সমাজের অস্বাভাবিকতাটাই চোখে পড়ে।

একজন পঞ্চাশোর্ধ পুরুষ বিয়ে করলে তো এতো আলোচনা হতো না, হয় না। সে পুরুষ হোক সেলিব্রিটি বা সাধারণ। যে কোনো বয়সে, যে কোন পরিস্থিতিতে পুরুষ বিয়ে করতে পারে। তাঁর বিয়ে করা সমাজের দৃষ্টিতে স্বাভাবিক নিয়ম।

কোনো পুরুষের স্ত্রী অসুস্থ হলে, মারা গেলে প্রথম যে কথাটি আসে- কীভাবে থাকবে? কে দেখবে? দেখভাল করার জন্য ঘরভর্তি লোকজন থাকলেও এই কথার সুরটাই প্রথমে কানে বাজে। আসলে বড় হওয়ার পর বুঝেছি এই দেখার মানে হলো নিঃসঙ্গতা দূর করা।

অথচ নারী, সে যতো কম বয়সেই সঙ্গী হারাক না কেন, তার নিঃসঙ্গতা দূর করার জন্য এ ধরনের সুর শোনা যায় না। একা হয়ে ওঠা নারীর কষ্ট কারো নজরে পড়ে না। বরং হাজারও দায় মনে করিয়ে দেওয়া হয়। সেটা সন্তানের দায়, চলে যাওয়া স্বামী’র পরিবারের প্রতি দায়িত্ব। না হলেও নিদেনপক্ষে সবার সম্মানের আয়না দেখিয়ে, নারীর নিঃসঙ্গতাকে আষ্টেপৃষ্টে নারীর সঙ্গী করে রাখা হয়। নিজের নিঃসঙ্গতা বুঝে ওঠা উচিত কিনা, বুঝলেও তা প্রকাশ করা উচিত কিনা, তা নারী বুঝতে পারে না। আর বুঝতে পারলেও বা প্রকাশের শক্তি সঞ্চয় করতে করতে সময় পেরিয়ে যায়। এ সমাজে পুরুষ অসীম সময়ের জীবন নিয়ে জন্মেছে। নারীর মন, শরীর নির্ধারিত সময়ে, নির্ধারিত ছকে বাঁধা।

কিন্তু নারী জীবনের ভিন্ন ভিন্ন ধাপ আমাদের চোখে পড়ে। আমার ছেলে “নিনজা হাতুড়ি” নামক একটা কার্টুন দেখে। আমিও মাঝে মাঝে ওর সাথে দেখি। “ইউমিকো” ঐ কার্টুনের মেয়ে চরিত্র। তাকে মুগ্ধ করার আপ্রাণ চেষ্টা ঐ কার্টুনের ছেলে চরিত্র দুটির। হাসি পায়। নিজের নিকট অতীতে তাকিয়ে ভাবি, এই জীবন কমবেশি সব মেয়েদেরই এক সময় থাকে। নারী হয়ে ওঠার পর, বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর পুরা চিত্রই ভিন্ন। নারী নিজে তখন সবাইকে খুশি করার রেসে লেগে যায়।

কেন এমন হয়!! অনেক ভেবে দেখলাম – এই পৃথিবীর অধিকাংশ বন্ধনই নারীর উপর নির্ভরশীল। একজন নারী সবাইকে যে পরিমাণ সুযোগ, শান্তি দেয় তা আর কেউ দিতে পারে না। কিন্তু দুঃখের বিষয়, যে ভোগকারী সে এসব মনে রাখে না। বা মনে রাখতে না চাওয়ার কারণে নারীকেই আরও পাঁচটা চাপের মুখে রাখে।

পুরুষের নিঃসঙ্গতাকে যতোভাবে দেখা হয়, নারীরটা ততোভাবে হয় না। না দেখার অনেক কারণ আছে। সে আর এক সাতকাহন।

তবে একটা বিষয় বুঝেছি – নারীর নিঃসঙ্গতা স্বার্থপরতার কারণেই দূর হয় না। সে স্বার্থপরতা নানান সম্পর্কের। পিতৃকুল সন্তানসহ সঙ্গীহারা কন্যার নিঃসঙ্গতা দূর করতে এগিয়ে আসে না। পাছে ঐ নাতি’র দায়িত্ব নিতে হয়। সন্তানের মায়ের বিয়েতে অমত থাকে। পাছে ভালোবাসা হারাতে হয়। আবার নির্ভরতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া পুরুষ অনেক ক্ষেত্রে নারীকে ভালোবেসে স্বীকার করলেও ঐ নারীর সন্তানকে নয়।

তাই মা হয়ে ওঠা নারী, সন্তানের জন্য নিজেকে নিঃসঙ্গতার আঁচলেই মুড়ে রাখে জীবনভর। যদিও একটা সময় পর সন্তানও ভুলে যায়। আসলে সঙ্গীহারা নারীর জীবন একটা সময়ে, হিসাব কিতাবের খাতায় পরিণত হয়। সে খাতায় সবাই যার যার হিসাব চমৎকারভাবে মিলিয়ে নেয়। অথচ খাতা হয়ে ওঠা খোদ নারীর জীবনের হিসাবটাই অমীমাংসিত থেকে যায়।

শেয়ার করুন:
  • 7.5K
  •  
  •  
  •  
  •  
    7.5K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.