বর-বৌ সম্পর্কটি গোপনীয় এবং অবহেলিত কেন?

মুমতাহানা ইয়াসমিন তন্বী:

ধরুন,
আপনি বন্ধু মহলে খুব জনপ্রিয়। সারাক্ষণ বন্ধুদের সাথে সময় কাটান, প্রায়ই ঘুরতে যান,রেস্তোরাঁতে খেতে যান। একই সাথে আপনি ফেসবুকেও খুব জনপ্রিয়। বন্ধুদের সাথে কাটানো সময়গুলোর ছবি, ভ্রমণ কাহিনী, জোকস এগুলো ফেসবুকে শেয়ারও দেন।

আপনি ফেসবুকীয় মিমসগুলো বন্ধুদের ট্যাগ করেন, সারাক্ষণ বন্ধুদের পঁচাতে থাকেন, আপনার বন্ধুরাও সুযোগ পেলেই ফেসবুকে আপনাকে পঁচায়, মজা করে। আপনাদের বন্ধুত্বের বন্ধন খুবই ঈর্ষণীয় বটে।

বা ধরুন,
আপনার জীবনে আপনার মায়ের ভূমিকা এতোই বেশি যে, আপনার কথাবার্তায় আপনার মায়ের গল্প চলে আসে। ফেসবুকেও আপনি মাকে নিয়ে প্রচুর গল্প লেখেন।

বা ধরুন,
আপনার জীবনে এমন একজন শিক্ষক আছেন, যাঁর কারণে আপনি আজ একটা লোভনীয় ক্যারিয়ার গড়তে পেরেছেন, আপনার জীবনের মতাদর্শ, দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে এই শিক্ষকের মারাত্মক ভূমিকা রয়েছে। আপনি কোথাও গেলে গল্পে গল্পে যেভাবেই হোক, আপনার কথায় ঐ শিক্ষকের কথা উঠে আসবেই।

এমন করে আমাদের সবার জীবনেই কেউ না কেউ থাকেই, যার দ্বারা আমরা প্রভাবিত হই। হয় সে আমাদের মা-বাবা,ভাই-বোন, মামা-চাচা,খালা-ফুফু, বন্ধু, শিক্ষক বা হোক সে এলাকার বড় ভাই, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বা কোন বই, কোন সিনেমা।

আমরা তাকে আমাদের জীবনে পাওয়ার জন্য গর্ব করি, মানুষের সাথে গল্প করি, এটা সম্ভবত সব মানুষেরই একটা স্বাভাবিক প্রবণতা।

কেউ কেউ আবার কোন একটা বিষয় দ্বারা প্রভাবিত, কেউ হয়তো ধর্ম দ্বারা, কেউ বিজ্ঞান-বিবর্তন-দর্শন ইত্যাদি দ্বারা। কারও আগ্রহ পদার্থ বিজ্ঞান তো কারও প্রাণীজগৎ, কারও হয়তো সমাজের অসাম্প্রদায়িকতা নিয়ে, কারও হয়তো লেখালিখি, কারও রাজনীতি ইত্যাদি ইত্যাদি।

আপনি যাবতীয় বিষয় নিয়ে, সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে পারেন, বাস্তবে আলোচনা করতে পারেন, ফেসবুকে লিখতে পারেন, কারও কোনো সমস্যা নাই।

সমস্যা কেবল একটা জায়গাতে। যদি আপনি আপনার বৌ/বরের কোনো বিষয় নিয়ে লেখেন, আপনি যদি আপনার বৌয়ের/বরের কোনো মজার ঘটনা, ছবি ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেন, তাহলেই প্রশ্ন আসবে:

— ঘরের কথা পরকে বলে লাভ কী?
— এতো ব্যক্তিগত কথা শেয়ার করার দরকার কী?
— প্রাইভেট কথা প্রাইভেট থাকাটাই ভালো
— সুখে থাকার ভান করে।
—লোক দেখানো ভালোবাসা।
— ঘরের বিষয় ঘরে থাকাই ভালো।
— ফেসবুকে মানুষকে জানান দিলেই কি ভালোবাসা বাড়ে নাকি?
— কী দরকার….
ইত্যাদি ইত্যাদি..

মানে মনুষ্য সমাজে বর-বৌ সম্পর্কটাই সবচেয়ে নিষিদ্ধ ও গোপনীয় সম্পর্ক। এই সম্পর্ক প্রয়োজনীয় এবং একই সাথে অবহেলিত। এটার কারণ কী?

বর/বৌয়ের সাথে সেক্সুয়াল সম্পর্ক তাই?
কেন মনে করছি বর-বৌ মানেই গোপন কিছু?
বর/বৌ মানেই বিছানা/ঘর/সংসার/বাজার/বাচ্চাকাচ্চা পালন এইসব কিছু। এটাও তো আর দশটা সম্পর্কের মতো স্বাভাবিক, চিরন্তন সম্পর্ক।

আপনি আপনার বন্ধুর সাথে ছবি দিলে কেউ বলছে না প্রদর্শন করছেন। অথচ বর/বৌকে নিয়ে কিছু লিখলে, ছবি দিলেই মনে হচ্ছে প্রদর্শন করছে?

বন্ধুদের সাথে মজা করে বেড়ালে কেউ বলছে না আদিখ্যেতা, অথচ
বর-বৌ মজা করে বেড়ালে আদিখ্যেতা হচ্ছে। লোক দেখানো হচ্ছে।

বর/বৌ বন্ধু হতে পারে না?

আপনার বর/বৌ আপনার কাছে শুধুমাত্র বিছানাসঙ্গী বলে সবাই সবার বর/বৌকে বিছানা সঙ্গী মনে করবে, এটা মনে করার কোন কারণ আছে কি?

জাহিদ একাধারে আমার বন্ধু, আমার প্রেমিক, বর, আমার রুমমেট, আমার ব্যাডমিন্টন খেলার প্রতিদ্বন্দ্বী, আমার ফটোগ্রাফার, সাইকেল চালানোর সঙ্গী, ভ্রমণ সঙ্গী, আমার শিক্ষক, আমি ওর থেকে স্ট্যাটিসটিকস, অংক, বিবর্তন, ধর্ম, সমাজ, রাজনীতি সবকিছুই শিখি/শেখাইও।

এমনকি আমার সাইকেল চালানো শেখার হাতেখড়ি জাহিদের কাছেই।

এমনকি সে আমার সবচেয়ে বড় সমালোচকও বটে।

বিয়েটা অল্প বয়সে করেছিলাম। মাত্র একুশ বছর বয়সে, তাই স্বাভাবিকভাবেই আমার মতাদর্শ, আমার নারীবাদের শিক্ষা, আমার সামাজিকীকরণ সবটাই জাহিদের হাতে হাত ধরে হয়েছে।

আমাদের সম্পর্কটাই এমন যে, দিনের মধ্যে ১০ বার জাহিদ আমাকে বলে, মেরে তোর দাঁত-মুখ ভেঙে দেবো।

আমি দিনে ৫০ বার জাহিদকে বলি, লাত্থি মেরে তোর পেটের নাড়িভুঁড়ি বের করে দেবো।

আমি ক্লাসের পড়া পারি না, বসে বসে কান্নাকাটি করি, জাহিদ ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে ইউটিউবে আমার পড়ার ভিডিও লেকচার দেখে, নিজে বুঝে তারপর আমাকে বুঝায়।

জাহিদ সারাদিনে দুনিয়ার খেলা দেখে, ডকুমেন্টারি দেখে, আমার আগ্রহ হলে একসাথে দেখি, নইলে ও ওর মতো ডকুমেন্টারি দেখে, আমি আমার পড়া পড়ি। তারপর দিনশেষে ও কী শিখলো, তাই আমাকে শেখায়, আমিও তাই।

এমনকি জাহিদ আমাকে মাঝে মাঝে রান্নাও শেখায়। আমি ওকে কাপড় ইস্ত্রি করা শেখাই।

দিনের ভেতর শতবার আমাকে ডেকে ডেকে এটা দেখায়, ওটা দেখায়, আমিও যা কিছু মজার, যা কিছু বিরক্তিকর, যা কিছু গোপন, যা কিছু নিষিদ্ধ সবকিছুই জাহিদকে শেয়ার করি।

আমার জীবনে যদি কারো বড় ধরনের কোন অবদান থাকে সে জাহিদ। (বাবা/মায়ের যে অবদান এটাকে আমি স্বাভাবিক বলেই ধরে নিচ্ছি) আমি জানি এমন অনেক ছেলে আছে, যাদের জীবনে পরিবার, বন্ধু সব ছাড়িয়ে তার বৌ/প্রেমিকার অবদান অনেক বেশি থাকে। আবার অনেক মেয়ের ক্ষেত্রেও বিষয়টা তাই।

তো যে ব্যক্তি একাধারে আমার বন্ধু, আমার শিক্ষক, আমার সমালোচক, তাকে আমি শুধু বিছানাসঙ্গী ভানতে চাইনি কোনকালেই। এটা অবশ্যই তার প্রতি বিরাট অন্যায়।

যখন আমি নতুন নতুন নারীবাদ সম্পর্কে জানতে শুরু করেছি, তখন মারাত্মক একটা দোটানায় ছিলাম। জাহিদের কাছ থেকে কোন ধরনের সাহায্য নিতে নিজের আত্মসম্মানে লাগতো। সেটা আর্থিক হোক, পড়াশুনা বা জার্মানিতে নতুন আসার পর ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত কোন বিষয় হোক।

কলেজ পাশের পর থেকে নিজেই নিজের অর্থসরবরাহ করতাম, এইজন্য জার্মানিতে হুট করে চলে এসে জাহিদের থেকে আর্থিক সহায়তা নিতেও আমার খুব বাধতো। বন্ধুদের থেকে সাহায্য নিতাম, তবুও ভুলেও জাহিদকে বলতাম না।

জাহিদ এটা বুঝতে পারে।

আমাকে একদিন বোঝায়, নারীবাদ মানে তো এইও নয় যে তুমি তোমার বরকে/প্রেমিককে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবো। যে সাহায্য আমি বন্ধুর থেকে নিচ্ছি, সেই সাহায্য আমি জাহিদের থেকে নিতে কেন অস্বস্তিবোধ করছি? আমি কেন জাহিদকে শুধুমাত্র পুরুষ মনে করে আমাদের মাঝে দূরত্ব তৈরি করছি?

আমি ভেবে দেখলাম তাইতো। অনেকের মতো নারীবাদকে আমিও ভুল ব্যাখ্যা করছিলাম। ভুল ব্যবহার করছিলাম।

তারপর থেকে জাহিদের সাথে কাটানো প্রতিটা সময় আমার কাছে নতুনের মতো। কারণ জাহিদকে আমি নতুন নতুন পরিচয় দিই। জাহিদকে নতুন নতুনভাবে আবিষ্কার করি।

ও আমার কাছে শুধুমাত্র একজন পুরুষ মানুষ তো নয়ই, বরং আমাদের ভেতর কখনও আমি নারী ও পুরুষ এই বোধটাই আসেনি। আমরা দুজন শুধু দুজনের সঙ্গীই মনে করি। এখানে লিঙ্গ বোধটাই কখনও আসেনি।

আমরা তুমুল মারামারি করি, লাথালাথি করি, তুমুল তর্ক করি, তুমুলভাবে একে অন্যকে পঁচাই, সমালোচনা করি নিজেদের, ঝগড়া করি, বিরহ করি, ছাড়াছাড়ি করি, ডিভোর্স করি মাসে মাসে, তবুও জাহিদ আমার জীবনের ধ্রুবতারা।

আমি এমন বহু দম্পতিকে চিনি যারা আমাদের মতো করে ভাবে। তাদের জগতের একটা বড় অংশ জুড়ে তাদের ভালোবাসার মানুষ।

যার সঙ্গে জীবনের অধিকাংশ সময় কাটাই, তাকে কেবল ঘরের বলে গোপন করে রাখা এবং সেটা শুধুমাত্র বিছানাসঙ্গী পরিচয়ে আবদ্ধ রাখাটা কতটুকু যৌক্তিক আমি জানি না।

বরং এই সম্পর্কটা হতে পারে বিশাল আকাশের মতো। তাহলে বিবাহিত জীবন নিয়ে মানুষের দমবন্ধ যে ভাবটা আছে, সেটা হয়তো থাকবে না।(অবশ্যই আমি এখানে বিয়ের গুণ গাইছি না)

আমার মনে হয়, আমরা প্রাইভেসি আর গোগনীয়তার মাঝে যে পার্থক্য আছে, সেটা গুলিয়ে ফেলি।

তাই বর/বৌ/প্রেমিক/প্রেমিকা এই সম্পর্কটাকে গোপনীয়তার বেড়াজালে আবদ্ধ করে ফেলি।

শেয়ার করুন:
  • 360
  •  
  •  
  •  
  •  
    360
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.