মাতৃত্বের সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় বলে কিছু নাই

তামান্না ইসলাম:

সেদিন এক পরিচিত মেয়ের সাথে কথা হচ্ছিল। কার কাছে যেন শুনেছিলাম ও দেশে যাচ্ছে। কথায় কথায় সেই গল্প চলে আসলো।

দেশে যাওয়ার কথা বলতে প্রবাসীরা সবাই ভালবাসে, খুশি হয়ে এই খবর দেয়। ওকে দেখলাম কেমন যেন একটা স্ট্রেসের মধ্যে আছে! আমি কিছু না বুঝতে পেরে এবং না ভেবেই জানতে চাইলাম, ও একা যাচ্ছে কিনা! ওর ছোট ছোট বাচ্চা আছে আমি জানি।

এইবার দেখলাম ও মহা বিরক্ত। এই প্রশ্নের উত্তরে শুধু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ না বলে ও অনেক কিছু বলতে শুরু করলো। সে একাই দেশে যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে এসব। বাচ্চাদের নিয়ে গেলে কী কী অসুবিধা হয়, ওর দেশের বাসার পরিস্থিতি কেমন ইত্যাদি অনেক কিছু।

ওকে বেশ অনেকদিন ধরে চিনি। এই সামান্য কথার সূত্র ধরে অকারণে কেউকে এতো ব্যাখ্যা দেওয়ার মেয়ে না। আমি এইবার বেশ বিস্মিত হলাম। ওকে বলেও ফেললাম সেই কথা যে, ও একা যাবে, নাকি বাচ্চাদের নিয়ে যাবে সেটা সে নিজেই সবচেয়ে ভালো বুঝবে। তখন জানতে পারলাম আসল রহস্য।

সে নাকি ইতিমধ্যেই ছোট বাচ্চা রেখে দেশে যাচ্ছে বলে অনেকের কাছ থেকেই অনেক উপদেশ শুনে ফেলেছে, অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এক কথায় সে কেমন মা, সেই প্রশ্ন তুলে ফেলেছে।

আমি ওর কথা শুনে ভাবছিলাম আমার নিজের মায়ের কথা। সত্তর দশকে আমার মা আমাদের তিন ভাইবোনকে বাংলাদেশে রেখে ইংল্যান্ডে চলে গিয়েছিলেন আমার বাবার কাছে ছয় মাসের জন্য। কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই। আমাদের তিনজনের বয়স তখন যথাক্রমে সাড়ে তিন, দুই এবং এক। মা চাকরিও করতেন। ছুটি নিয়ে চলে গিয়েছিলেন বিলাত দেখবেন বলে, বাবার সাথে বেড়াবেন বলে। ঢাকায় যে নানার বাড়ি বা দাদার বাড়ি ছিল, তাও না। ভাগাভাগি করে ভাইবোনদেরকে দেওয়া হয়েছিল আমাকে মামার বাসায়, ছোট দুই ভাইয়ের জন্য গ্রাম থেকে দাদি আর চাচাকে আনানো হয়েছিল। এইসব আধুনিক নারীরা নিশ্চয়ই এই গল্প শুনলে আঁতকে উঠবে, ভাববে কী পাষাণ আমার মা!

অথচ মা হিসাবে আমার মা একজন অত্যন্ত সফল মা, আমরা সন্তানরাও সেটা মনে করি, অন্য মানুষরাও এবং তার নিজের কোনো আফসোস আছে বলে আমার জানা নাই।

এর উল্টাটাও দেখা যায়। অনেক শিক্ষিত, উচ্চ শিক্ষিত নারীরাও সন্তানকে সময় দেবেন বলে চাকরি করেন না। তাদেরকেও অনেকে নানাভাবে ছোট করে কথা বলে।

আমার জানা মতে, আমাদের দেশে আধুনিক শিক্ষিত পরিবারগুলোতে শাশুড়ি বউ দ্বন্দ্বের একটা বড় কারণ হলো সন্তানকে কীভাবে লালন পালন করতে হবে, কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক সে ব্যাপারে অনেক শাশুড়ি অতিরিক্ত নাক গলান।

অথচ সন্তান পালনের ব্যাপারে প্রতিটা মায়ের নিজস্ব কিছু পদ্ধতি থাকে, স্বপ্ন থাকে, ইচ্ছা থাকে। নতুন মায়েরা ভুল করতে পারে, উপদেশ চাইলে উপদেশ দেওয়াটাও ভালো, কিন্তু তাকে সারাক্ষণ সমালোচনা করা বা জোর করাটা ঠিক না। এমনকি নিজের মা হলেও না। নিজের মায়ের ক্ষেত্রে মেয়েরা হয়তো উপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু শাশুড়ির ক্ষেত্রে সেটা সহজ নয়।

এতো গেল মা, শাশুড়ি বা মুরুব্বি স্থানীয়দের কথা। কিন্তু বন্ধু, প্রতিবেশী, সমবয়সী বা নিছক পরিচিতরাও উপদেশ দিতে বা কথা শোনাতে ছাড়েন মা।
আমরা মায়েরা এবং মেয়েরাই কিন্তু এই কাজটা সবচেয়ে বেশি করে থাকি। ‘আমার বাচ্চাকে আমি এই করি না।’ আমার বাচ্চা হলে এই কাজ কখনোই করতাম না।’ ‘কেমন মা যে এটা করতে পারলো?’ ‘আমার বাচ্চাকে আমি মুখে তুলে খাওয়াই।’ ‘আমার বাচ্চা অনেক স্বাবলম্বী।’ ‘আমার বাচ্চা আমার সাথে ঘুমিয়েছে দশ বছর পর্যন্ত।’ ‘আমার বাচ্চা জন্ম থেকেই আলাদা শোয়।’ ‘এইভাবে খাওয়াও কেন?’ ‘এইভাবে পড়াও কেন?’ ‘এতো আহ্লাদ দিও না।’ ‘এমন নিষ্ঠুর মা।’

যাই করেন না কেন, তাতেই সমস্যা। সন্তান দুষ্টু, রোগা, পড়ালেখায় ভালো না হলে তো কথাই নাই। ব্যাপারটা এমন যে আমি যেটা করছি সেটাই ঠিক, বাকি সব ভুল। আমি যেটা করছি, আমার বুদ্ধি অনুসারে, আমার বাচ্চার চাহিদা অনুসারে সেটা ঠিক। অন্যের জন্য সেটা ঠিক নাও হতে পারে। সন্তান মানুষের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা।

মাতৃত্ব এক বিরাট দায়িত্ব, মায়েদের জীবনের সম্ভবত সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং কাজ। একেকজন সেটা একেকভাবে করে। বিশেষ করে শিক্ষিত ও পরিণত বয়সের মায়েরা। তাকে সেভাবেই সেটা করতে দিন।

আর একারণেই এই ছবিটা আমার এতো পছন্দ। বোঝাটা একই, ভারও এক। কিন্তু একেক জন মেয়ে সেটা একেকভাবে বহন করছে। সন্তান লালন পালন করা এই সামান্য বোঝা বহনের চেয়ে শতগুণ কঠিন কাজ। একেক মায়ের চিন্তা ভাবনা, জীবনের লক্ষ্য, পরিস্থিতি একেক রকম।

আমাদের সন্তানরাও একেকজন ভিন্ন ভিন্ন মানুষ। এমনকি এক মায়ের সন্তানরাও আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাই তাদেরকে লালন পালনের ধরন আলাদা হতেই পারে।

মাতৃত্বের সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় বলে কিছু নাই। যার সন্তান, তার পদ্ধতি তার জন্য শ্রেষ্ঠ।

শেয়ার করুন:
  • 519
  •  
  •  
  •  
  •  
    519
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.