‘কণ্ঠ’ ছবিটা দেখলাম, এবং স্পিচলেস

আনন্দময়ী মজুমদার:

১) ‘কণ্ঠ’ ছবিটা দেখে স্পিচলেস হয়ে ফিরলাম। ভাইয়ের প্রিয় রসের কথা ছিল, ‘আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি, তাই কিছুই বলতে পারছি না।’ আমাদের খানিকটা সেই দশা।

ভালো লেগেছে আর দশবার দেখবো কিছু কিছু জায়গা, এটা বলতে ইচ্ছে করে। তাই যা লিখবো তা খুব নিখুঁত নিরাবেগ স্মার্ট আলোচনা হবে না নিশ্চয়ই।

২) আমি ভাই জয়া আহসানের ফ্যান। তাকে সব রকমভাবে আমার ভালো লাগে। বিশেষ করে তার এনার্জি। এই এনার্জি যে সমস্ত রোলে দরকার হয়, সেই রোলে তাকে মানায় বেশি, এমন মনে হয়। কিন্তু গেরিলা, বিসর্জন ইত্যাদিসহ যে সকল ছবি দেখেছি, তার মধ্যে এই ছবিতে তার অভিনয় আর ফিটিং সবচেয়ে ভালো লেগেছে। যেন এই রোলটা তার জন্য তৈরি।

একজন স্পিচ প্যাথোলজিস্ট-এর ভূমিকায় তাকে অনেকটা সাউন্ড অফ মিউজিকের মারিয়ার মতো সজীব, সহৃদয় আর সদসাহসী লাগছিল।

কঠিন রোল, যা আমি অন্য কেউ এতো সহজে করতে পারে ভাবতে পারছি না। জয়া আহসান স্ক্রিন জুড়ে ছিলেন যেমন তার রোল দাবি করে, আর যেমন তার ডাইনামিক ব্যক্তিত্ব।

৩) পাওলি দামের অভিনয় একটু সে তুলনায় প্রাণহীন লাগে। তবু বেশ ভালো করলেন। দুইজন বাচিক শিল্পীর একজনের ভূমিকায় তাকে কর্ণ কুন্তী সংলাপ থেকে পড়তে হয়েছে। তার কণ্ঠস্বর বাচিক শিল্পীর নমনীয়তা আর বলিষ্ঠতা এক সঙ্গে বর্তমান। এর আগে তাকে যথেষ্ট ভালো কোনো ছবিতে দেখিনি। তাই এই জরুরি রোলে ভালো লাগলো। যদিও পুত্র আর পিসির সঙ্গে তার প্রাণরসায়ন তত বাস্তব মনে হয়নি। অথবা সুযোগ ছিল না।

আর একটু জটিলতাও ছিল। সেই জটিলতার জায়গাটা তিনি ভালো ধরতে পেরেছেন মনে হলো।

তাকে কোথাও কোথাও দেখতে সুচিত্রা সেনের মতো লাগছিল। ব্যাপারটা আমাদের মতো পুরোনো ছবি দেখা পাবলিকের কাছে নস্টালজিক আর রোমহর্ষক।

৪) পিসির রোল ইচ্ছাকৃত হিউমার আনার জন্য। বরিশালের মহিলা কিন্তু বরিশালের ভাষা বুঝতে পারলেন না। সেটা একটা খটকা। আর এ যুগের আধুনিক পিসির পক্ষে বড়ো বেশি সেকেলে আর অবাস্তব। আর পিসি ভূমিকা ছাড়া তাকে আর কোনো রক্তমাংসের ভূমিকায় দেখতে পাওয়া যায় না বলে একটু কেমন ফাঁপা। তবু তেমন সমস্যা মনে হয়নি। যেন অপর্ণা সেনের ‘জাপানিজ ওয়াইফ’ এর পিসি চলে এলেন এখানে।

৫) শিবপ্রসাদ আর নন্দিতার পরিচালনা, শিবপ্রসাদের এই খুব কঠিন রোলটা অবলীলায় করা, আর শিবপ্রসাদের সংলাপ লেখা নিখুঁত মনে হয়েছে। যেন দিন দিন আরো ভালো হচ্ছে। কোথাও ঝুলে যায় না।

সংলাপের সরলতা এদের বৈশিষ্ট্য। সরলতা আর স্পষ্টতা গল্পের জন্য দরকার ছিল। আর গল্পতে প্রত্যেক রোলের প্রতি শ্রদ্ধা নির্মাণে জরুরি ছিল।

আমাকে বিশেষ করে স্পর্শ করে থেরাপিস্ট যখন শোকাহত পেশেন্টকে বলেন, দুঃখ ভোগ করো, উপভোগ করো, ইত্যাদি জাতীয় কিছু।

এটা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ভাষা। থেরাপিস্ট বলেন এই ভাবে, ‘সিগারেট টেবিলেই থাকবে, কিন্তু খাবো না।’

৬) শিবপ্রসাদের অভিনয় নিয়ে আমি আর কী বলবো! একটু যা দেখেছি ‘মুক্তধারা’ আর ‘হামি’তে, বিস্মিত হয়ে যেতে হয় তার বহুমুখিতায়।

যে রোল ধরেন সেটা হয়ে ওঠে।

এখানে কণ্ঠ আর আবেগের যে কঠিন মানচিত্র ছিল, যা না হলে এই চরিত্রের ইমোশন আমাদের রক্তে মিশে যেত না, সেই মানচিত্রে তিনি সাবলীল ঘুরে বেড়ালেন।

সেলাম, অভিবাদন, ভালোবাসা। অনেক ভালোবাসা আছে বলেই এই গল্পগুলো আপনারা লিখতে আর অনুবাদ করতে পারেন।

৭) অর্জুন নামের বাচিক শিল্পীর সঙ্গে তার পুত্রের প্রত্যেক দৃশ্য বাস্তব। শিশুদের জন্য রক্তবিন্দু দিয়ে এমন ভালোবাসা অনুভব না করলে বোধহয় অভিনয় করা সম্ভব না।

৮) শেষ দৃশ্য কয়েকবার দেখতে হবে। আমাদের রোম খাড়া হয়ে যায়। কাজী নজরুল বিনির্মাণ হলেন বোধহয় স্মরণীয়ভাবে।

৯) গানের লিরিক। অনুপম রায় প্রমুখ কী কাণ্ডই না করেছেন। পাঁচটি গান আমাদের মন দিয়ে কয়েকবার শুনতে হবে। আমাদের বিশেষ ভালো লাগল তাঁর কণ্ঠহারা শিল্পীর এই গান।

আমার বুকে সূর্যের বাসা
আমার চোখে বাঁচার তাগিদ
আমার মনে হিমালয় আশা
সময় কিনে চাইনি রশিদ
আমার ঈশ্বর চিনে নেবে আমায়
আমি দাঁড়িয়ে তার দরজায়
রোজ এক স্বপ্ন দেখা
আলোতে আলোতে ঢাকা

১০) শেষ করছি সামান্য ব্যক্তিগত কিছু অনুষঙ্গ দিয়ে।

একসময় চার বছর চাঁদে যাওয়া মতো যাত্রা করেছি ফি বছর। তারপর নিজেকে সারার সময় না দিয়ে কেয়ামত প্লেটে তুলে নিতে নিতে এসিড রিফ্লাক্সে আমাদের ভোকাল কর্ডে পলিপ হয় আর সারে না বলে সামান্য যা গান করতাম, তা বন্ধ হয়। নয় বছর পরে যখন ডাক্তার দেখেন, ভিন্ন ডাক্তার একজন শ্বাসনালী আরেকজন খাদ্যনালী দিয়ে পাইপ নামিয়ে দিলেন এনেস্থেশিয়া ছাড়া। ক্যামেরা দিয়ে ভিতরের ছবি তুলে এনে খবর দিলেন কী কী হয়েছে। এই বাচিক শিল্পীর মতো তারাও দিলেন স্পিচ থেরাপি।
বললেন দিনে ৪ লিটার জল খেতে। ধরিয়ে দিলেন হরেক রং আর গড়নের ওষুধ। দেখতে সুন্দর, নামগুলোও বেশ, আর দরকারও ছিল তখন, কিন্তু ধাক্কা একটু কাটার কয়দিন পর মনে হলো ধারাবাহিক ওষুধ খেয়ে যাওয়া সম্ভব না। অন্য লাইন ধরলাম। কাজে দিল।

সেই চেষ্টার ফলস্বরূপ হয়তো প্রকৃতি এক সময় দয়া করে মাঝপথে হাত ধরলেন।

এই লম্বা উপসংহার টানার কারণ এই যে মানুষের বাস্তব আর গল্প কল্পনার মানচিত্রে কিছু রোমহর্ষক মিল থাকে। আর সে কারণেই হয়তো আমরা ছবি দেখি।

শেয়ার করুন:
  • 69
  •  
  •  
  •  
  •  
    69
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.