প্রাইভেসি লঙ্ঘনের দায় মূলত কার?

প্রমা ইসরাত:

এটা ভাবতে রাগ লাগে যে একটা ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশ হয়ে পড়ার জন্য একজন মানুষ ডাবল মাস্টার্স, সিজিপিএ তে ৪ এ ৪ পেয়েছে, এইসব কথাও বলতে হচ্ছে। এইটা প্রমাণ করার জন্য যে সেই মানুষ অনেক গুণী, অনেক মেধাবী, অনেক ভালো। মানে ছবিটা যে লিক করেছে সেই অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা নিয়ে কোনো কথা নেই, লেখার শিরোনাম হচ্ছে, আপনি ঘুরে দাঁড়ান, আপনি থামবেন না, আপনি এগিয়ে যান, আপনি দুর্বল না ইত্যাদি।

এই কথাগুলো দেখলে বা শুনলে পজিটিভ মনে হয়। আসলেই কি তাই?

আপনি ঘুরে দাঁড়ান- মানে, যে ঘটনাটা ঘটেছে, সেটা আসলে পিঠ দেখিয়ে প্রস্থান করার মতো ঘটনা, কিন্তু আপনি ঘুরে দাঁড়ান।
আপনি থামবেন না- মানে, যে ঘটনাটা ঘটেছে, সেটা থেমে যাবার মতো ঘটনা, কিন্তু আপনি থামবেন না।
আপনি এগিয়ে যান- মানে, যে ঘটনাটা ঘটেছে, সেটা আসলে পিছিয়ে যাবার মতো ঘটনা, কিন্তু আপনি এগিয়ে যান।
আপনি দুর্বল না- মানে, আপনার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা আপনাকে দুর্বল করে দিতে পারে, যেহেতু সেটা দুর্বল হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা, কিন্তু আপনি দুর্বল হবেন না।
মাথা তুলে দাঁড়ান- মানে, আপনার সাথে যা ঘটেছে, সেটা মাথা হেঁট হয়ে যাওয়ার ঘটনা, কিন্তু আপনি মাথা তুলে দাঁড়ান।

এইসব বাক্য আসলে ওই পজিটিভলি ভিক্টিম ব্লেইমিং, বা ভিক্টিমকে সান্ত্বনা দেয়া।

অথচ লাইনগুলো এমন হতে পারতো, – আপনি আইনী ব্যবস্থা নিন, আপনি পুলিশে অভিযোগ করুন, আপনি নিজের সিকিউরিটি নিশ্চিত করুন, আপনি ভালো থাকুন, আপনি সতর্ক থাকুন।

অবশ্য কথাগুলো এমনই হতো যদি ঘটনার শিকার কোনো পুরুষ হতেন। পুরুষের দোষ ধরতে নাই, আর লজ্জা হচ্ছে নারীর ভূষণ। কারণ ছেলে বাচ্চা হওয়ার সাথে সাথেই কাপড় সরিয়ে ওই পুরুষাঙ্গ খানা সবাইকে দেখিয়ে বাহবা নেয় আমাদের সমাজ।

একটা সাইবার অপরাধ ঘটেছে, কারা ঘটিয়েছে, এই নিয়ে কোন কথাই নেই, তাদের কোন দোষ নেই।
ঘরের পর্দা-দরজা দেয়ার পরও কেউ যদি দরজার ফাঁকা দিয়ে ভেতরের কর্মকাণ্ড দেখে মজা নেয়, তখন কি সেই ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার দায় ব্যক্তির?

আমার সাথে একবার মজার ঘটনা ঘটেছিলো- আমি আমার গায়ে লোশন মাখছিলাম, তো আমার পাশের রুমের আপু হুট করে ঢুকে পড়ে, পরে স্যরি বলে চলে যান। তো অন্য আরেকদিন, মজায় মজায় তিনি অন্য আরেকজনকে আমার সামনেই বলছিলেন, আপু, আপনার বেশ কিছু তো দেখে ফেলেছি। আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, সেই লজ্জা তো আপনার, আপনি নক না দিয়ে রুমে ঢুকে পড়েছিলেন।

তো এটা খুবই সামান্য ঘটনা।

কিন্তু আমাদের কালচার এমন যে, কেউ উঁকি দিয়ে, দরজার চিপা কানা কুঞ্চি দিয়ে ইতরের মতো মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় দেখে, এবং কানাকানি করে মজা পায়।

বিয়ের সময় জামাই বউ এর খাটের নিচে লুকিয়ে থাকা, বেড়ার ফাঁক দিয়ে, ভেতরের কর্মকাণ্ড দেখা, এবং পরে রসিয়ে রসিয়ে এগুলোর গল্প করা, সেক্সুয়ালি ফ্রাস্ট্রেইটেড জাতির অনন্য বৈশিষ্ট্য। আজ তাদের হাতে স্মার্ট ফোন আছে, আজ তারা একই কাজ ভার্চুয়ালি করে বেড়াচ্ছে।

একজন মানুষ এর অনুমতি ছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত জিনিস, তথ্য এগুলো ব্যবহার করা যায় না, এগুলো সম্পর্কে উৎসাহ দেখানো অসভ্যতা, এবং আইনত দণ্ডনীয়।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, শুধু আইন দ্বারা অধিকসংখ্যক অপরাধীকে নিবৃত করা যায় না।

শেয়ার করুন:
  • 77
  •  
  •  
  •  
  •  
    77
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.