ডিভোর্সি নারী মানেই নাকি ছাড়াভিটা!

অনুসূয়া যূথিকা:

উপমহাদেশের বড় অংশ জুড়ে নারীকে দেবী মেনে পূজা করা হয়। নারীর উর্বরা শক্তি, তার সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা, তার মাতৃত্বের বিষয়টি পুরুষের কাছে প্রধান৷ আবার এসব কারণে আবহমান কাল থেকে নারীকে রহস্যময়ী ভাবতে অভ্যস্ত পুরুষ। নারীর প্রতি পুরুষের মাতৃভাব যেমন সত্য, কামভাবও তেমনি সত্য। পুরুষ নারীকে আদ্যাশক্তি মেনে মা ডেকে পূজা করে, আবার ভোগ্যবস্তু হিসাবে কামনাও করে। কিন্তু মানুষ ভাবে কি?

একই পঞ্চভূতে তৈরি নারী ও পুরুষের দেহ কিন্তু নারীর মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা পুরুষের বোধের বাইরে৷ আদতে সে নারীকে বোঝে না৷ আর বোঝে না বলেই পুরুষ যে নারী সম্পর্কে বলে, লেখে, সেটা তাদের গড়া নারী। রক্তমাংসের নারীর জীবনের লড়াইয়ের সাথে পুরুষের পরিচয় নাই৷

বাস্তবের দুনিয়ায় পুরুষের পুরুষতান্ত্রিক আচরণ দেখে অভ্যস্ত বাদ যায় না সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও। এখানে প্রতিটা নারী পুরুষের কাছে স্রেফ আর স্রেফ যেনো যৌনতার প্রতীক৷ আমাদের ছবিতে, লেখায় বাজে মন্তব্য করতে এক শ্রেণির পুরুষ সদা প্রস্তুত। আবার ঠিক এরকম ঘটনা যখন নিজের পরিবারের কোন নারীর সঙ্গে ঘটবে তখন আবার সেই পুরুষদেরই ভিন্ন চেহারা। আদতে যেনো পুরুষ কেবলমাত্র সুযোগের অভাবে সাধু আর সুযোগ এলেই তার মুখোশ খুলে দানবের চেহারা বেরিয়ে আসে।

এই যে আজ দিন কয়েক ধরে ফেসবুকের নিউজফিড ভেসে যাচ্ছে মিথিলার
তথাকথিত ‘অনাচার’ এ, এর জন্ম কোথায়? তিনি একজন নারী, সন্তানের মা, একজন অভিনেত্রী, কারও বোন কারো কন্যা সেইসব পরিচয় ছাপিয়ে গেছে তার আরেকটা পরিচয়ে। তিনি একজন ‘স্বামী পরিত্যক্তা’ নারী, ডিভোর্সি।
এই সমাজে ডিভোর্সি মানেই যেনো ছাড়াভিটা৷ বিধবা নারী শত গঞ্জনার পরেও সমাজের চোখে কিছুটা হলেও সহানুভূতি পাবেন, কিন্তু কোন নারী ডিভোর্সি মানে তো সে আর যৌনকর্মী সমার্থক!

যেনো একজন নারীর সন্তান জন্ম দেয়া আর স্বামীর খেদমতে জীবন পার করাটাই মূখ্য। আর একজন ডিভোর্সি নারী তার আর সকল বোধ মেরে ফেলবে, কেবল আর কেবলমাত্র সন্তানের মা হয়ে বাঁচবে।

বেশ ভালো কথা, তাহলে প্রশ্ন হলো একজন নারী ডিভোর্সি জেনেও একজন বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে কেন প্রেমের সম্পর্ক হলো? এখানেও জবাব তৈরি, এই নারীটিই পুরুষটিকে বাধ্য করেছে৷ যেনো পুরুষটি দুগ্ধপোষ্য শিশু, তিনি জগতের আর সব কিছু ভুলে মোহিনীশক্তির কবলে পড়েছেন।

কেবল মিথিলা না, এরকম যতো নারীর ঘটনা ঘটছে রোজ প্রত্যেকেই শিকার হচ্ছেন গালাগালির। ফেসবুক জুড়ে চলছে, মোরাল পুলিশিঙ। যেন কারও জীবনে কোন গোপন প্রেম নাই, কেউ কখনো তাদের সঙ্গী ছাড়া অপর নারীর প্রতি আকৃষ্ট হোন নাই৷

আর নারীদেরও বহুজনের দেখছি ভাবটা এমন যে মিথিলা একজন ডাইনি, সে ফাহমির সঙসারে অনুপ্রবেশ করেছে৷ যেনো আর সব আপ্পিরা সতিত্বের অগ্নি পরীক্ষায় উতরে গেছেন।
আবার এইসব ট্র্যাশ ব্যাঙের ছাতার মতো কিছু পোর্টালে ছেপেও দিচ্ছে তথাকথিত কিছু সাংঘাতিক।

আমি কাউকে বলতে দেখলাম না, একজন বিবাহিত পুরুষ হয়ে ফাহমি কেন আরেক সম্পর্কে জড়ালেন? কেন ব্যক্তিগত সময়ে ছবি তুললেন? আর কেনোইবা সেটা আমজনতার সামনে উন্মুক্ত করলেন?! কেবলমাত্র ছবি না, আট মিনিটের একটা অন্তরঙ্গ ভিডিও ছেড়ে দেয়া হয়েছে৷

বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ফৌজদারি আইনে ব্যভিচার অপরাধ হিসাবে দেখা হয়। বলা বাহুল্য আইনটা সেই মান্ধাতার আমলের মানে বৃটিশ আমলের। যারা ফাহমিকে অবোধ দাবী করছেন তারা সেটা জানেন তো? আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবি আপলোড করাটাও সাইবার ক্রাইমে পড়ে৷ প্রতিটা ঘটনার পরে অসংখ্য ফেক আইডি, তাদের কুৎসিত পোস্ট আর কমেন্ট দেখে মনে হয় সত্যি সরকারের উচিত একটা কড়া পদক্ষেপ নেয়া।

একজন মানুষ যেনো একটাই ফেসবুক একাউন্ট খুলতে পারে, অন্তত নিজের পরিচয় গোপন করে যারা আইডি খুলে
অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করে এদের হাত থেকে পরিত্রাণ মিলবে আমাদের৷

শেয়ার করুন:
  • 583
  •  
  •  
  •  
  •  
    583
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.