ভাইরাল ভাইরাসে আক্রান্ত নষ্ট সময়

শাহরিয়া দিনা:

কয়েক দশক আগেও মানুষজন মেতে ছিল রেডিও, টেলিভিশন আর ক্যাসেট প্লেয়ার নিয়ে। এখন যেমন সবাই সেলফি, ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম, নেটফ্লিক্স নিয়ে থাকে। নেক্সট জেনারেশন থাকবে অগমেন্টেড রিয়ালিটি, ভার্চুয়াল রিয়ালিটি আর এসিস্টেড লাইফস্টাইল বাই কম্পিউটার প্রোগ্রামস, এপ্লিকেশন আর রোবোটিক্স নিয়ে।

আগে ঘুরতে যাওয়া বলতে ছিল আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া। এখন ট্রেন্ড দেশ-বিদেশ ঘুরতে যাওয়া, তখন ট্রেন্ড হবে স্পেস টুরিজম। আউটার স্পেস থেকে সেলফি চেক ইন হবে।

আগের তুলনায় আমাদের মেয়েরা শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়েছে অনেকটা। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে। তাদের চিন্তার জগতেও পরিবর্তন এসেছে। সমানতালে উপার্জন করে সমান দায়িত্ব ভাগাভাগি করে সংসার সামলান অনেকেই।

মেয়েরা তুলনামূলক এগিয়ে গেলেও পুরুষরা মানসিকতায় পড়ে আছেন সেই একই জায়গায়। একটা বউয়ের মধ্যেই এরা সবটা চায়। মা, বোন, বান্ধবী, প্রেমিকা, পর্নস্টার, কাজের লোক সবকিছু। কোনো একটা বিষয় ঘাটতি থাকলে সেটা ইনিয়ে-বিনিয়ে অন্য নারীর কাছে ব্যক্ত করে স্পেস চাইবে। ক্ষেত্রবিশেষে পরকীয়ায় লিপ্ত হবে।

না পুরুষ মাত্রেই খারাপ তা বলছি না। তবে পুরুষ হয়ে জন্মালেই কেউ পুরুষ হয়ে উঠে না। পুরুষ হয় তার কর্মে, তার ব্যক্তিত্বে, তার দায়িত্বে। পৌরুষদীপ্ত রুচিবান ব্যক্তিত্ববান পুরুষই নারীর আরাধ্য।

তো এই যে আমাদের অধিকাংশ বঙ্গীয় পুরুষগণ যে কত সৎ, মহৎ, উন্নত চরিত্রের অধিকারী এটা বোঝা যায় শুধুমাত্র কোনো মেয়ের ভিডিও বের হলে। বছরের বাদবাকি সময় উনারা সম্ভবত কোমায় থাকেন। কারণ এমন পূতপবিত্র পুরুষের বিচরণ এই পৃথিবীর বুকে দেখতে পাওয়া যায় না।

উনারা এতটাই ইননোসেন্ট যে, বায়ু পরাগায়নের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছেন এবং সিনেমায় দেখানো সীনের মতো হাতে করে দুইটা ফুলে নিয়ে ঠোকাঠুকি দেন এবং তাদের বাচ্চা হয়ে যায়। উনারা কখনো পরনারীর দিকে তাকান না। কে জোশ তা ভাবেন না। কোন মেয়েটার শরীরের কোন অঙ্গ সুন্দর বা কার কত সাইজ তা নিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডাছলে বলে মজা নেন না।

তাদের সমস্ত ঘুমন্ত পবিত্র আত্মা জাগ্রত হয় কোনো মেয়ের ভিডিও লিংক ভাইরাল হলে। এরা প্রভা, মিথিলাকে গালি দিবে, প্রয়োজনে একই মন্তব্য কপি-পেস্ট করে ঘরে ঘরে মিষ্টি বিলানোর মতো করে কমেন্ট বক্সে দিয়ে আসবে, ওইদিকে গোপন ইনবক্সে লিংক আছে বলে অন্যদের নক দিবে, ফরোয়ার্ড করবে।

ব্যাপারটা এমন যেন বিয়ে ছাড়া সেক্স হারাম, কিন্তু পর্ন দেখা হালাল। দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ স্বেচ্ছায় কোনো একটা রিলেশনে গেলে তাদের একান্ত মুহূর্তের কিছু দলিল থাকতেই পারে। সেটা তারা তখন ভালোবেসেই রাখে। এইসব একান্ত মুহূর্ত ভাইরাল করার উদ্দেশ্য কাউকে সামাজিকভাবে অপদস্থ করা। আর একটা মেয়েকে চরিত্রহীন ট্যাগ দিতে পারলে পুরুষের সাত খুন মাফ হয়ে যায়।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, স্ক্যান্ডাল দুজনকে ঘিরে বের হয়। প্রমাণও আসে দুজনের অংশগ্রহণের, তবুও সবার চোখে মেয়েটাই হয় খারাপ। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, এক্ষেত্রে ভিডিও চ্যাটের স্ক্রিনশট বা ক্লিপে শুধু মেয়েদের শর্ট ড্রেসে দেখা যায়, ছেলেরা জামাকাপড় পরেই থাকেন। মেয়েদের উচিৎ ছেলেদেরও বলা ‘ভাঁজ খোলো আনন্দ দেখাও, করি প্রেমের তর্জমা’ কিংবা একটু বেলী ড্যান্সের স্টেপ দেখাও, না পারলে নিদেনপক্ষে নাগিন ড্যান্স! শখ-আহ্লাদ মেয়েদেরও তো থাকতে পারে।

মানুষ হিসেবে একটা জীবনের সমস্ত অর্জন বিলুপ্ত হয়ে যায় না ভালোবাসার মানুষের সাথের কোনো একটা দুর্দান্ত মুহূর্ত শেয়ারের বিষয় ভাইরাল হলে। ভালোবাসার মানুষ চেইঞ্জ হতে পারে, প্রায়োরিটি লিস্টে সে না-ই থাকতে পারে তবু স্মৃতিগুলো তো সত্যি। সেসময়কার অনুভূতি তো মিথ্যে ছিল না। মানুষটার প্রতি, সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে একান্ত মুহূর্তগুলো দলিল কেউ খোলা বাজারে তুলে দেয় না। সম্পর্ক শেষ হলেও গোপনীয়তার ব্যাপারে অযত্নবান হয় না। আর যারা অন্যের গোপনীয় খারাপ ব্যাপারগুলো বের করার জন্য ওঁৎ পেতে থাকে, এদের মনে হয় নিজস্ব কোনো লাইফ নেই বা থাকলেও সেখানে তাদের করার মতো কিছু নেই। অন্যে কী করলো দেখে এবং দেখিয়ে সুখ পায়। কত অভাগা তারা!

খারাপ কিছু ছড়িয়ে দিয়ে সমাজের জন্য, মহৎ কিছু করা যায় না। ঘৃণা দিয়ে ঘৃণার প্রতিশোধ সহিংসতা বাড়ায় কেবল, কোন ইতিবাচক পরিবর্তন আসে না। কেউ একজন কত খারাপ জনে জনে বলে বেড়ানোর চাইতে আমি কতোটা ভালো বা আমি যা করেছি এক জীবনে তা যদি সব সম্মুখে আসে এভাবে, পারবো কি মুখ দেখাতে?

ভাবুন। আগে নিজের ভালো হই পরে সমাজের ভালো করা যাবে। আসলে তখন আলাদা করে ভালো করার দরকারই হবেনা কারণ ব্যক্তি থেকেই তো সমাজ গড়ে ওঠে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.