ভিসি মহোদয়া, সবাই কেন ছি: ছি: করছে আপনাকে?

সুপ্রীতি ধর:

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম, আপনি কি কষ্ট করে নিচের সংকলিত লেখাগুলো একবার পড়বেন? আপনি যখন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান তখন আমরা সকলেই খুশি হয়েছিলাম, অভিনন্দন জানিয়েছিলাম আপনাকে প্রথম নারী উপাচার্য নিযুক্ত হওয়ায়। ভেবেছিলাম আপনি ইতিহাস রচনা করবেন।

কিন্তু এসব কী করছেন আপনি? একের পর এক ঘটনার জন্ম দিয়ে, কোটি কোটি টাকার দুর্নীতিতে জড়িয়ে নিজেকে কোথায় টেনে নামালেন? সারা জীবন ধরে যে বিশ্বাসটা আমাদের ছিল যে নারীরা কম দুর্নীতিবাজ হয়, মোটামুটি সৎ হয়, কোমল-কঠোরে উদার হোন তারা,  আপনি তো সব ধারণা ধূলিসাৎ করে দিলেন! মানলাম আপনার খুঁটির জোর আছে, ‘ওপর’ থেকে নির্দেশ না থাকলে আপনার ক্ষমতাও ছিল না এভাবে সব মানসম্মান খুইয়ে নিজের চেয়ারটা আঁকড়ে থাকার! একবার নিজের দিকে তাকিয়ে দেখুন উপাচার্য মহোদয়া, নিজেকে ভালো করে দেখুন।

আপনি কি জানেন যে এই আপনার একার কারণেই আমাদের নারীদের অগ্রগতি কতোটা পিছিয়ে যাবে? জানেন না। আপনার যে কোনো জ্ঞান নেই, আপনি যে একজন মুর্খ, তা আপনার আজকের সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য দেখেই আরও নিশ্চিত হয়েছি।

আপনি আপনার পোষ্যদের নিরীহ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকে ‘গণঅভ্যুত্থান’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। আমার প্রশ্ন, আপনি কি আদৌ এই ‘গণঅভ্যুত্থান’ শব্দটার অর্থ জানেন? বোঝেন এর অন্তনির্হিত তাৎপর্য? দেশে-বিদেশের গণঅভ্যুত্থানগুলোর কথা আপনি কখনও শোনেননি? বলিহারি আপনার জ্ঞান শ্রদ্ধেয়া ভিসি মহোদয়া! পুরো শিক্ষক সমাজের মুখে কলংক লেপে দিয়েছেন আপনি একাই। পোষ্য ছাত্রলীগের পেটোয়া বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে আপনি ইতিহাসে ‘কুখ্যাত ভিসি’ হিসেবে পরিচিত হলেন। ঠিক আপনার মতোন লোকজনের কারণেই আজ শিক্ষকতা পেশাটা বড্ড সমালোচনার মুখে পড়ে গেল।

ক্ষমতার লোভ এতোখানিই আপনার, কিছুতেই নড়ানো যাবে না আপনাকে? কিন্তু আপনি কি জানেন যে সত্যি সত্যিই ছাত্র-শিক্ষক সকলেই মাঠে নেমে এলে এই পেটোয়া বাহিনী কেন, তার চেয়েও বড় পেটোয়াদের নিয়ে এলেও আপনার গদি নড়ে যেতে বাধ্য! জানেন এটা? আপনার কি লজ্জা, আত্মসম্মান বলে কিছু আছে? আপনার মতো শিক্ষক তো জাতির কলংক। ছি:।

ছবিটি ফেসবুক থেকে নেয়া

পড়েন আপনি পড়েন, আমার বন্ধুরা কী লিখছে আপনাকে নিয়ে, সামান্য কয়টা মাত্র শেয়ার করলাম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারপার্সন কাবেরী গায়েন লিখেছেন,

লজ্জায় মুখ লুকানোর আর কোন কোনা-কুঞ্চিও অবশিষ্ট রইলো না। সেদিন এক আর্ট-কালচার-আলসার করা এই পিত্থিমীর স্বঘোষিত সবচেয়ে ‘মেধাবী’ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক তেড়ে এলেন বিভাগের সিনিয়র নারী শিক্ষককে মারতে। সে কাহিনী ধরা আছে সেই বিভাগের সিসিটিভিতে। তিনি আছেন নির্ভয়ে, বহাল তবিয়তে। আজ জাবি-তে এক ভিসি নিজ বিভাগের শিক্ষকদের পেটালেন পেটোয়া বাহিনী দিয়ে, ফের পত্রিকায় সেজন্য পেটোয়াবাহিনীর তারিফও করলেন।

শিক্ষকতা যখন রাজনৈতিক কারখানার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন কখনও একজন শিক্ষকের এক ‘অমূল্য’ ভোটের জন্য প্রশাসকদের কাছে তার অন্যায়-আচরণ উপেক্ষিত থাকে, বিভাগের শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকরা ইনিয়ে-বিনিয়ে তার পক্ষ অবলম্বন করেন, আবার কখনও বা রাজনৈতিকভাবে গদিতে বসা উপাচার্য গদি ধরে রাখেন তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভরত শিক্ষকদের মারধর করা পেটোয়া বাহিনীর প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করে।

সবই রাজনীতির খেলা। ম্যাক্রো-মাইক্রো সব পর্যায়ে। আসলে যতোটা নিচে নেমে এদেরকে ছুঁড়ে ফেলা সম্ভব, সে পর্যন্ত নামা, ক্ষমতাসীন রাজনীতির খুঁটির সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত না থাকলে সাধারণ শিক্ষকদের পক্ষে সম্ভব হয় না। রুচির ব্যাপারও থাকে। তাই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে যেমন একজন সৎ সর্বজন শ্রদ্ধেয় ভালোমানুষ নির্বাচনে দাঁড়ান না, দাঁড়াতে পারেন না, কিংবা দাঁড়ালেও স্থানীয় টাউট, ড্রাগ-ডিলারের কাছে হেরে যান, বিশ্ববিদ্যালয়েও তাই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি শিক্ষকদের ঠিক এই পর্যায়ে নামিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মরেছে বহু আগে, সেই মরা গন্ধের ভেতর থেকে থেকে আমাদের নাক সয়ে গেছে। না কি হুয়ান রুলফোর সেই গল্পের মত আমরা যে মরে গেছি, বিশ্ববিদ্যালয় যে মরে গেছে, সেই সাক্ষ্য দেবার জন্য তেমন কেউ আসলে জীবিত নেই- সেটাও কেউ বলতে পারছেন না। রেস্ট ইন পিস, বিশ্ববিদ্যালয়। আমি তোমার নাম লইয়া কান্দি।

চিররঞ্জন সরকার লিখেছেন,

হায় ফারজানা ইসলাম!
অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম ২০১৪ সালের ২ মার্চ যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন, তখন আমরা অনেকেই উল্লসিত হয়েছিলাম, গর্বিত হয়েছিলাম। কারণ তিনিই ছিলেন বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী উপাচার্য। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার নারীরা আমাদের দেশে গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এখনও তলানিতে। সেখানে ড. ফারজানার উপাচার্য হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্তি আমাদের অনেকের কাছে ছিল উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত। ভেবেছিলাম তিনি হয়ে উঠবেন, ‘আলোর দিশারী’!

কিন্তু হায়, মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী ভিসি হওয়ার গৌরবকে ধুলায় মিশিয়ে সবচেয়ে নির্লজ্জ ভিসিদের দলে নাম লিখিয়েছেন!
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, যারা তার সন্তানের মতো, তাদের তিনি ছাত্রলীগ দিয়ে দমন করলেন। শুধু তাই নয়, উপাচার্যের বাসভবনের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে ‘মুক্ত’ করাকে ‘গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে আখ্যায়িত করলেন।
আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা প্রসঙ্গে তার মন্তব্য, ‘ছাত্রলীগ দায়িত্ব নিয়ে কাজটি করেছে, সুশৃঙ্খলভাবে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিয়েছে!’
বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণার দিনে তিনি ছাত্রলীগের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেছেন, ‘আজ আমার জন্য একটি অত্যন্ত আনন্দদিন’!
মানুষ হিসেবে তো বটেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্য হিসেবে তার কতটা নৈতিক অবক্ষয় হলে ছাত্রলীগের এমন একটি জঘন্য কাজের পক্ষে সাফাই গাইতে পারেন, এমন নির্লজ্জ মন্তব্য করতে পারেন, সেটা ভাবলে সত্যিই বিস্ময়বোধও লুপ্ত হয়ে যায়!

ছাত্রলীগ কি তার ব্যক্তিগত চৌকিদার? এ জন্যই কি তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে ১ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা ‘ঈদ-সেলামি’ দিয়েছিলেন?

যার ‘আলোর প্রতিমা’ হয়ে ওঠার কথা, তিনিই যখন স্রেফ পদ-পদবি-ক্ষমতার জন্য আর দশজন ‘পুরুষ ভিসি’র মতো লোভী ‘কালো-চিতা’য় পরিণত হন, তখন দেশের অন্ধকার ভবিষ্যৎটাই কেবল নিশ্চিত হয়ে দেখা দেয়!

বৃত্বা রায় দীপা লিখেছেন,

ছি: ফারজানা ইসলাম ছি:!

আপনাকে চিনতাম ২০০৬ সাল থেকে। আমার চাকরি জীবনের শেষ প্রতিষ্ঠান নাগরিক উদ্যোগ এর কোষাধ্যক্ষ ছিলেন আপনি। বোর্ড মিটিং ছাড়াও নানাসময়ে আপনি আসতেন আমাদের অফিসে। বেশ সদালাপী হাস্যজ্বল মানুষ হিসেবে আপনাকে জেনেছি। বাংলাদেশের প্রথম নারী ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে আপনাকে অভিনন্দিত করেছি। সত্যিই সেদিন ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারিনি, ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতা আপনাকে এমন লোভী ও দুর্নীতিবাজ করে তুলবে। অবস্থাদৃষ্টে মনেহচ্ছে ভিসি না থাকতে পারলে আপনার জীবন বৃথা হয়ে যাবে। বুঝিবা শ্বাস বন্ধ হয়েই মারা যাবেন আপনি।
একটা নেহাৎ গন্ডমূর্খের মত আপনি গুটিক অস্ত্রধারী গুন্ডা পেটোয়ার কাঁধে ভর করে ঘর থেকে বেরিয়ে অফিসে এসে বসাকে বলছেন ‘গণ অভূত্থ্যান’। আপনি এই কথাটি বলে এই বাংলার সকল গণ অভ্যুত্থানকে ছোট করেছেন। কোনোকিছুতেই আপনি গদি ছাড়বেন না। কী ভয়ংকর জেদ আর নিদারুণ ইগোর দম্ভ! শেষ অবধি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো ভ্যাকেট করে দিলেন, যেন আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রী ঘরে ফিরতে বাধ্য হয়।

আপনার অদূরদর্শিতায় অবাক হলাম আপা। এইভাবে কয়দিন বলেন তো? যেদিনই বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে সেদিনই আপনাকে তাড়াতে আবারও ছেলেমেয়েরা একত্রিত হবে। এবং ওরা আপনাকে তাড়াবেই! ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেন। কোনোদিনও ছাত্রদের ক্ষেপিয়ে কেউ থাকতে পেরেছে? তাবড় তাবড় স্বৈরাচারী শাসকরা ট্যাংক গোলাবারুদ আর সুসজ্জিত বাহিনী নিয়েই পারেনি আর আপনিতো দেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ভিসি মাত্র!

আপনার সীমাহীন লোভ, আপনার স্বামী ও পরিবারের সকল সদস্যের চৌর্যবৃত্তি আজ দেশের মানুষের মুখে মুখে ফেরে। আপনার লজ্জা বলে যে কিছুই নাই এটা সত্যিই আগে বুঝিনি। অথবা আপনিই সুকৌশলে আপনার এই কুৎসিত চেহারাটি লুকিয়ে রেখেছিলেন। পারেনও বটে। বেশ অমায়িক রাবীন্দ্রিক ভাব আর কিশোরীসুলভ হাসির আড়ালে আপনি কী জঘন্য হিংস্র পশুসদৃস্য! ভাবতেও অবাক লাগে। শুধু আমি কেনো, আমার পূর্বতন সকল সহকর্মী আজ হতবাক।

দেশের প্রথম নারী ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবেই আপনি ইতিহাসের অংশ হতে পারতেন কিন্তু আপনি আপনার কারণেই হয়ে গেলেন দেশের প্রথম দুর্নীতিপরায়ণ, চরম অজনপ্রিয় ও সন্ত্রাসী লালনকারী নারী ভাইস চ্যান্সেলর। ছি: ফারজানা ইসলাম ছি:!

শেয়ার করুন:
  • 141
  •  
  •  
  •  
  •  
    141
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.