কোনো প্রাণের বিনিময়ে রেমিট্যান্স চাই না আর

শাহরিয়া দিনা:

মৃত্যুর এক মাস ২৪ দিন পর সৌদি আরব থেকে দেশে আসে নাজমার লাশ। নাজমার বোনের সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার ভিডিওটা দেখছিলাম দুর্বলচিত্তের মানুষ বলে পুরোটা শেষ করতে পারিনি। যতটুকু বুঝা গেল, মৃত্যুর আগে নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে স্বজনদের কাছে বারবার বাঁচার আকুতি জানিয়েছিলেন হতভাগ্য ওই নারী। মৃত্যুর দুই দিন আগেও বাঁচাতে বলেছিলেন তাকে, কিন্তু দরিদ্র পরিবারটি তাকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়নি।

পরিসংখ্যানে জানা যায়, ২০১৬ সাল থেকে গত জুন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৩১১ নারী শ্রমিকের লাশ বাংলাদেশে আনা হয়েছে। এদের অধিকাংশই সৌদি আরব থেকে এসেছে। মৃত্যুর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে আত্মহত্যা, স্ট্রোক এবং দুর্ঘটনা। যেসব নারী বিদেশে শ্রমিক হিসেবে যান তাদের বেশীরভাগের বয়সই ২০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। নেই কোনো ক্রনিক রোগের ইতিহাস। পরিবারের ভাগ্য ফেরাতে গিয়ে তবুও এইসব হতভাগ্য নারী ফিরছে লাশ হয়ে।

বাংলাদেশের নারী শ্রমিকরা সাধারণতঃ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেই কাজ করতে যান। সৌদি আরব, লেবানন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্দান, ওমান, কাতার, মরিশাস, কুয়েত, মালয়েশিয়া, বাহরাইনসহ বিভিন্ন দেশে গৃহকর্মী হিসেবে নারী শ্রমিকদের চাহিদা সবচেয়ে বেশি হলেও নির্যাতনের শিকার তারাই বেশি হোন। মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী নারী গৃহকর্মীর শারীরিক ও যৌন নির্যাতন নিয়মিত ঘটনা। এসব মর্মান্তিক ঘটনায় ইতিমধ্যে শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন।

শাহরিয়া দিনা

বেতন না দেয়া, খেতে না দেওয়া, মারধোর করা, গরম তেলে হাত চুবানো, ইস্ত্রি দিয়ে ছ্যাঁকা দেয়া, যৌন নির্যাতন কী নেই যা করা হয় না! দাসত্বের যুগ শেষ হলেও এইসব ধনী এবং তথাকথিত ইসলামিক রাষ্ট্রসমূহ তাদের দাসপ্রথা ঠিকই চালু রেখেছে। মূলত পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নার্স, গৃহকর্মী হিসেবে নারী শ্রমিক নেয়া হলেও তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে যৌন দাসী হিসেবে। দিনের পর দিন অভুক্ত রাখা, ফোনে দেশে যোগাযোগ করতে না দেয়া, এবং ক্রমাগত ধর্ষণ ইত্যাদির মতো অমানুষিক আচরণে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে এসব নারী। অনেকে পালিয়ে ফিরে আসছেন দেশে। তাদের মধ্যে কেউ আবার ধর্ষণের ফলে গর্ভবতী অবস্থায় ফিরছেন। এদের ঠাঁই হয় না পরিবারে, থাকতে হয় সেফ হোমে। সেখানেও মানবেতর অবস্থায় দিন কাটায়।

দরিদ্র পরিবারের অসহায় নারীরা একটু ভালো থাকার এবং পরিবারকে ভালো রাখার আশায় শ্রমিক হিসেবে দালাল বা রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে পাড়ি জমান। বেশীরভাগই নিজের শেষ সম্বল বিক্রি বা বন্ধক দিয়ে, ধার-দেনা করে যাবার খরচ যোগাড় করেন। পরিবার-পরিজন রেখে ভিন্ন ভাষাভাষী এবং সংস্কৃতির মধ্যে গিয়ে পরে এইসব নারীরা পায় না সহমর্মিতা, প্রাপ্য পারিশ্রমিক, না কোন শ্রম অধিকার। বিদেশ-বিভুঁইয়ে এযেন অসীম সাগরে হাবুডুবু খাওয়া। বঞ্চিত এইসব নারী যখন খালি হাতে ফেরত আসেন সমাজও এদের ব্যর্থ হিসেবে দেখে। পুরুষের বেলায়ও শেষোক্ত কথাটি প্রযোজ্য।

ফেরত আসা এইসকল নারী ট্রমার মধ্য দিয়ে যান। শারীরিক এবং মানসিক ক্ষতির এই পরিমাপ তো আর্থিক মূল্যে পরিমাপ করা সম্ভব না। অনেকেরই আর স্বাভাবিক পারিবারিক জীবনে ফেরা হয় না। ভাগ্য ফেরাতে গিয়ে পরিস্থিতির ভয়াবহতায় এক বিভীষিকা জীবনের মুখোমুখি এসে দাঁড়ান।

মধ্যপ্রাচ্যের নারী শ্রমিকদের নির্যাতিত অবস্থার বিপক্ষে আমাদের যথাযথ কর্তৃপক্ষ এবং আমরাও কেমন জানি সোচ্চার না। দেখেও দেখি না। শক্তিশালী সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে যেখানে সীমান্তে একটা লাশ পরলে আমাদের মধ্যে যে দেশপ্রেম দেখা যায়, সেই একই আমাদের সকল অনুভূতি এইক্ষেত্রে ঝিমিয়ে থাকে। এর কারণ কি সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় টান? আইয়ামে জাহিলিয়াত বা অন্ধকার যুগের নারীদের সেই জঘন্য অবস্থা থেকে সৌদি আরব কি বের হতে পেরেছে? হলেই বা কতদুর?

যারা মানুষকে মানুষ মনে করে না, শ্রমিকের ন্যায্য পাওয়া পরিশোধ করে না, চরম অমানবিক তারাই আবার ধর্মীয় ঝাণ্ডাধারী রাষ্ট্র! শুধুমাত্র এই ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাদের সকল অন্যায় তো আর ন্যায় হয়ে যায় না। নারীর অবস্থান সৌদি আরবে সবসময়ই অবহেলিত। গৃহকর্মী মানে শ্রমিক নয়, যেন টাকা দিয়ে কিনে নেয়া দাসী! মানুষ হয়ে মানুষকে দাস বানানো, অমানুষিক পরিশ্রমের পাশাপাশি অভুক্ত রাখা বা বাবা-ছেলে দুইজনই তাকে রেপ করা কোন ধর্মীয় বা মানবিক আচরণের মধ্যে পড়ে?

নারীর জন্য নিরাপদ কাজের পরিবেশ এবং সমস্ত শ্রম আইন-অধিকার সংরক্ষিত করে শক্তিশালী চুক্তির পরই এসব দেশে নারীদের পাঠানো হোক। নয়তো কাজের নামে মৃত্যুকুপে পাঠানো বন্ধ হোক।

রেমিট্যান্স আনায় নারী অবশ্যই অংশগ্রহণ করবে, কিন্তু তার জন্য অবশ্যই তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দেশেই পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ এবং সঠিক পারিশ্রমিক নিশ্চিত করে নারীবান্ধব কর্মক্ষেত্রে সৃষ্টি করা দরকার। একটা দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে কর্মক্ষেত্র থেকে দূরে রেখে তো আর সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব না।

শেয়ার করুন:
  • 337
  •  
  •  
  •  
  •  
    337
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.