ধর্ম বা ধর্মান্তর- সবখানেই নারী তুচ্ছ!

অনসূয়া যূথিকা:

ইসলামের বহু রকমের সমালোচনা হয়, হয়েছে আর হচ্ছেও। পুরুষের বহুগামিতাকে ইসলাম সমর্থন করে। ধর্মই বলছে একজন পুরুষ একাধিক স্ত্রী রাখকে পারবে। কিছু গোষ্ঠীতে তো কেবলমাত্র স্ত্রীসঙ্গ না, দাসী সঙসর্গ করাটাও জায়েজ৷ কোরানের আয়াত দিয়ে একে পুরুষের জন্য সিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে।

একাধিক নারীকে বিয়ে করাটা ইসলামের চোখে অপরাধ বা নিন্দনীয় নয়, যদিও শর্ত আছে কিছু কিন্তু কেইবা এসব শর্ত মানে৷ তবে মজাটা হচ্ছে ভিন্ন ধর্মের নারীকে বিয়ে করার প্রসঙ্গে।

একজন মুসলমান পুরুষ যখন বিধর্মী বা ভিন্ন ধর্মের নারীকে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করে তখন অধিকাংশ মানুষ ভাবে একজন মুসলমানের সংখ্যা বাড়লো বা বাড়বে। এক্ষেত্রে পুরুষের ভিন্ন ধর্মের স্ত্রী গ্রহণ মানে বিধর্মী মানুষটি যদি নারী হোন, সেক্ষেত্রে পাক্কা বিশ্বাস যে সেই নারী তার ধর্ম ছেড়ে ইসলামের পতাকা তলে আসবে বলেই একজন মুসলমানকে স্বামী হিসেবে মেনে নিয়েছে। আর সাদা চোখে দেখলে হয়ও তাই। একজন মুসলমান পুরুষ খুব স্বাভাবিকভাবেই নিজের ধর্ম মেনে স্ত্রী গ্রহণ করেন।

খুব কম হলেও মুসলিম নারী, বিধর্মী বা ভিন্ন ধর্মের পুরুষের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হোন। মজার বিষয় হলো, এক্ষেত্রে নারীটি আর মুসলিম থাকেন না। খৃষ্টান স্বামী হলে তেমন একটা সমস্যা হয় না। বৌদ্ধ ধর্মের পুরুষের মধ্যে মুসলিম নারীকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার নজির একেবারেই নেই বলা চলে। কিন্তু ইসলামের নিয়মে একজন মুমিনা নারীর স্বামী সবসময়ই মুমিন হতে হবে, কাফের নয়। অন্যথায় এই বিয়ে বৈধ না, এবং জেনা মানে ব্যভিচারের সামিল।

উপমহাদেশের চোখে হিন্দু বাড়ির মুসলিম বউ, পুরাই একটা কেরিক্যাচার। সে বেচারি না ঘরকা না ঘাটকা। হিন্দু সে হতে পারবে না, যতোই কেননা সে শাঁখা সিঁদুর পরুক৷ পুজার ঘরে তার জায়গা হয় না৷ আর তার আজন্ম ধর্ম বিশ্বাসের কারণে স্বামীকে দেবতা জ্ঞান করাটাও কঠিন।
তবে তার বাপেরবড়ি তারে একেবারে ত্যাজ্য করে না৷ চাপ থাকে বের হয়ে আসার। নতুন বউয়ের পুরা পরিবার মিলে চেষ্টা করে জামাইকে মুসলমান বানানোর, এটা খুবই সম্মানে বিষয় বলে মনে করা হয়।

এদেশে তো বটেই পুরা উপমহাদেশের আন্তধর্মীয় বিবাহে সবচেয়ে বড় ভিক্টিম হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী। আর বড় সংখ্যক হিন্দু নারী মুসলিম বাড়ির বউ হয়। সেইটা বাংলাদেশের হোক বা ভারতীয়।

খুব উদার মানসিকতা নিয়ে আসে বউ হয়ে, স্ত্রী হয়ে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি অপদস্ত হয় প্রতিটা ক্ষেত্রে। নিজের ধর্ম ছেড়ে সে ইসলাম ধর্ম স্বীকার করবার একটা ভয়াবহতম চাপে পড়ে। ধর্ম ত্যাগ করুক বা না করুক নিজের পরিবারের লোকেরা তাকে ত্যাগ করতে পিছপা হয় না। যুগ কতো এগোলো, আমরা কতো আধুনিক হয়েছি, কিন্তু কুলত্যাগী এই নাম নিয়ে সেই নারীকে বেঁচে থাকতে হয়, জীবোন্মৃত হয়ে। সে আর কারও কন্যা না, বোন না।

এমনকি সে নিজের পূর্ব জীবনের সবকিছু ছেড়ে দিলেও সে স্বামীর পরিবারেরও আপন হতে পারে না। না সে বাপের বাড়ি ফিরতে পারবে, আর না শান্তিতে শ্বশুর ঘর করতে পারবে৷ বহুক্ষেত্রে অনার কিলিং নামের বর্বর হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হবে। আর যদিবা সেটা না হয় তবুও তাকে কুলত্যাগী হিসেবে রোজ দুবেলা বাপ ভাই শাপ শাপান্ত করবে৷ নিজের ঘরে ফেরা তার জন্য একেবারেই বন্ধ।

পূর্বপুরুষের বংশের নাম ডুবানোর জন্য সব দায় তারই। কোনো প্রায়শ্চিত্ত করে এই দায়মুক্ত হতে পারে না সে! সমাজের এরকম অবস্হার মধ্যে তার মানসিকতা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়। একটা সময় হিন্দু বা মুসলিম দুই সমাজকে দেখার ক্ষেত্রে তার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে থাকে।

মহালয়ায় পিতৃপক্ষ শেষান্তে পিতৃপুরুষের তর্পণ হয় সেখানে নারীর স্হান নাই৷ কালীপূজার আগে ভূতচতুর্দশী তিথিতেও পূর্বপুরুষের আশীর্বাদ দরকার, তাই চৌদ্দ প্রদীপ জ্বলে। কোথাও এতোটুকুও নাম নাই নারীর! যেনো মৃত্যুর পরে নারীর আর কোন চিহ্নও রইলো না কোথাও৷ তার জন্ম স্হানে না, নিজের সঙসার বলে যে ঘর সে গড়ে সেখানেও তাকে স্মরণ করে প্রদীপ দেবার কোন প্রথা নাই। নারীর জন্য বরং এই ভালো, মৃত্যুর পরে সে স্বাধীন তার আর কোন দায় নাই!

শেয়ার করুন:
  • 680
  •  
  •  
  •  
  •  
    680
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.