নারীর মনে সুক্ষ্ম বর্ণবাদ, সাথে মৌলবাদও…

সাবিহা ইশরাত জাহান:

তথ্য ও তত্ত্ব সমৃদ্ধ না বলে বরং ঘটনা দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করতে পারি। কেন নারীর মনে বর্ণবাদ তার নিজের জন্যই ক্ষতিকর।

জাতের মেয়ে কালো ভালো, আর জাতের ছেলে? আরে ছেলে তো ছেলেই। এর আবার জাতের কী আছে! মানে লেখাপড়া নাহয় একটু কমই করেছে। হাল্কা একটু অন্য দোষ থাকতেও পারে। আরে, ছেলে তো! নারীর পেট থেকে দণ্ড সমৃদ্ধ হয়ে তবেই তো বেরিয়েছে, নাকি! তাই তাকে নিয়ে একটু বাড়াবাড়ি করা দোষের কিছু নয়। কোটি কোটি বছর ধরে সমাজ নামক অপ্রয়োজনীয় নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানটির শিখিয়ে দেয়া, মস্তিষ্কের কোষে কোষে ঢুকিয়ে দেয়া এই ধারণা বেশ কিছু ক্ষেত্রে সবচে’ বেশি ধারণ করেন নারী।

নারীর মনে বণর্বাদ? সে কথা বলতে শুরু করলে খাতা ফুরোবে, রাত পোহাবে, কিন্তু উদাহরণ আর শেষ হবে না। যেমন ধরুন, স্বঘোষিত নারীবাদী দেখলে তার চলন বলন ঠাঁট বাট নিয়ে দিনব্যাপী গবেষণার কাজে মনোনিবেশ করেন বাপ-ভাইয়ের ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা মেয়েটি। বলি বোন, নারীবাদী হওয়ার দরকার নেই, সময়টা ফলপ্রসূ কোনো কাজে তো লাগাতে পারতেন এই গুটিবাজি না করে!

আচ্ছা, মায়েদের কথা বলবো? তেড়ে আসবেন না তো? আসুন, তো আমার কী? সেই তো যোগাযোগ মাধ্যমে মা দিবসে ম্যা ম্যা করে মাকে ভালোবাসেন, তো? যাকগে, আপনি জন্মালেন, একজন ফর্সা মায়ের শ্যামলা মেয়ে হয়ে। পরে সেই মায়ের পেট থেকে দণ্ডসমৃদ্ধ ভাইও হলো। নধরকান্তি ও শ্বেতশুভ্র। আর যায় কোথায়! এই তো আপনার মায়ের যোগ্য সন্তান। নিজেকে উত্তর আধুনিক দাবি করা মা, আপনাকে গায়ের রঙের সাথে মিলিয়ে কাপড় পরাতে খুবই ব্যস্ত ছিলেন।
বহুদিন বোঝেননি, এক সময় বুঝতে পারলেন, আপনার সাদা রঙা কুতকুতে সব তুতো ভাইবোনের সামনে কালোঝুলো আপনাকে স্বয়ং মা বেশ ক’বার তাচ্ছিল্য করেছিলো। ভাইটির লেখাপড়া হয়তো বেশি হয়নি, তবু তো দণ্ড আছে তার। যেটির বহুল ব্যবহারও তিনি করেন বটে। যথাসময়ে শ্বেতী রঙা স্ত্রীও জুটে যায় তার। বহুগুণে গুণান্বিত আপনার মানসিক ভারসাম্যের তখন যাচ্ছেতাই অবস্থা। এই শুভ্রতা যে বিশ্বখ্যাত রঙ নির্মাতারাও কখনও চোখেও দেখেনি, তা শুনতে বাধ্য আপনি।

দেখুন তো এমনটা বা এমন ধরনের কিছু আপনার সাথে হয়েছিলো কি কখনো? ভাই-ই যে হতে হবে এমন কথা নেই, কৃষ্ণকলির বোনটি যদি হয় চম্পাকলি, তাহলেও এই সমাজে এমনটাই ঘটবেই। এতে সমর্থন যোগাবেন আপনিই। অর্থাৎ নারীরাই।

দয়া করুন। একটু গভীরে যান। ভাবুন তো এর মূল কোথায়? আপনি পিছিয়ে যাচ্ছেন না তো এসবে ব্যস্ত থেকে! কারা গেঁথেছে এসব আপনার মনে? একই নারী যখন শাশুড়ি তখন তো কথাই নেই, যদি বউটির রং গতানুগতিক ফর্সা না হয়।

বর্ণবাদের ইতিহাস নিয়ে লিখতে বসিনি মোটেও। সামান্য হলেও বোঝাতে চাই গায়ের রঙ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কীভাবে নিজের ও অন্যের ক্ষতি করছেন আমাদের মা মেয়ে আপ্পি ভাবী খালা মামী চাচী ফুপ্পিরা।

তমুকের বাচ্চা হয়েছে। বেশ সুন্দর বাচ্চা। বলার পরই মুরুব্বী নারীকুলের প্রথম কথা হবেই হবে- ফর্সা হয়েছে, তাই না? কানা বোবা কালা ল্যাংড়া সব পরে, ফর্সা কিনা সেটাই আসল কথা। কোনো প্রতিবন্ধী শিশুর কথা উঠলে (দু:খিত শব্দটি ইচ্ছে করেই ব্যবহার করেছি) প্রথমেই মা-খালার দলের কথা, আহারে কী সুন্দর ফর্সা বাচ্চাটা? কী হবে ওর?

আগেও লিখেছি এবারও লিখবো, এই দলে উচ্চশিক্ষিত নারীর সংখ্যা অনেক। যারা কোনভাবেই পুরুষতন্ত্রের ঘেরাটোপ থেকে বের হতেই পারছেন না। গায়ের রং যে কোনো আলোচ্য বিষয় না, এটি তারা হাজার বোঝালেও বুঝবেন না বলে পণ করেছেন।

এরাই আবার মৌলবাদীও। ভাই ফোঁটা, রাখীবন্ধন বা জামাই ষষ্ঠীর বেড়াজালে আটকে রাখার জন্য শুধু কর্পোরেট দুনিয়াকে দুষলেই হবে না। অনুষ্ঠানগুলো পালনকারী নারীরাও সমান দায়ী। নিজেদের তথাকথিত নিরাপত্তার জন্যই তো এসব আচার পালন করছেন মন দিয়ে। কোনভাবেই যে নিজেকে পরিপূর্ণ ভাববেন না তারা! আহ্ স্বামীর জন্য না খেয়ে থেকে ‘করওয়া চৌথ’ নামক সিনেমাটিক আচারটির কথা না হয় তোলাই রইলো। স্বামীর মন আসল জিনিস, যা দেখার শুধু তিনিই দেখবেন। তাই তো বেড়েই চলেছে অন লাইন অফ লাইন হিজাব শপের সংখ্যা।

ক্লাবে ক্লাবে তাসের টেবিল মাতাচ্ছেন সুবেশী আন্টিরা, যাদের আড্ডার বিষয়বস্তুর মধ্যে অন্যতম, সদ্য স্বামী বিয়োগ হওয়া নারীটি কেন স্বচ্ছ শাড়ি পরলেন অথবা তমুকের মেয়ে ত্রিশ পেরিয়েও কেন বিয়ে না করে ট্যাটু আঁকায় মন দিয়েছেন!

হে ফর্সা মা খালা চাচী ফুপ্পি আর আপ্পির দল, এবারে মেয়ে বৌয়ের রঙ নিয়ে, অন্যের মেয়ের কাপড়ের দৈর্ঘ্য, চাকরি থেকে বাড়ি ফেরার সময় বা বিয়ে কবে হবে বাচ্চা কেন হয় না এসব নিয়ে জল্পনায় এবারে ক্ষ্যামা দিন। বড়ো কিছু ভাবুন, ভাবনার গভীরে যান। আর হ্যাঁ, সমাজের দোহাই তো মোটেই নয়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.