আত্মসম্মান

ফাহমিদা খানম:

“সবাই ড্রয়িং রুমে বসে গুরুত্বপূর্ণ আলাপ করছে, আর তুমি রুমে বসে বই পড়ছো?”
“সেখানে গিয়ে আমি কী করবো? এই বাসায় দুই মুরুব্বীর কথাই আইন – শুধু শুধু সময় নষ্ট!”
“আলোচনা কিন্তু তোমার জন্যেই হচ্ছে!”
“জানি, রায় কী হয় জানিয়ে দিও, মাথা পেতেই নিবো।”
“খাপছাড়া মেয়েমানুষ নিয়ে সংসার করে গেলাম আমি, সবাই একসাথে আড্ডা দেয়, টিভিতে সিরিয়াল দেখে – উনি একাই বিদ্যার সাগর– বই নিয়ে বসে থাকেন!”
“ঠিক বলেছো, পুঁথিগত বিদ্যা মুখস্ত করে কিছু তো হতে পারিনি, তাই তোমাদের ভাষায় নভেল পড়ে সময় কাটাই!”

“মানুষ অবসরে কতো কী করে? মাকে দেখতাম সবসময় হাতের কাজ বা এটা সেটা করতে, তুমি পারো কেবল বইয়ের পিছনে ফালতু টাকা নষ্ট করতে!”

রুম থেকে বেরিয়ে যাবার পর মনে হলো আসলে ওর যেমন আমাকে নিয়ে দুঃখ আছে – আমারও আছে, কিন্তু সেসব শোনার কেউ নেই, ও ক্ষোভ বলে হালকা হতে পারে, আমি কাকে বলবো? ৩০ বছর দুজন একই ছাদের নিচে কাটিয়ে দিলেও আপন হতে পারলাম আর কই? সামাজিকতার পোশাকটা বয়ে বেড়িয়েছি মাত্র!

“চাচ্চু ড্রয়িং রুমে চা দিতে বলেছে।”
দেবরের মেয়ের কথায় বুঝতে অসুবিধা হলো না আমাকে কাঠগড়ায় নেবার জন্যেই এই বাহানাটুকু!
চা-নাস্তা নিয়ে রুমে ঢোকার সময়ই শুনলাম ভাশুর বলছে—
“শত হলেও আমরা মেয়েপক্ষ, আমাদের এতো তেজ দেখানো চলে না, বুঝলাম ছেলের মা একটু সেকেলে – আমাদের উচিত হবে ইরাকে বোঝানো, আরে একটা সময় পর ইরা রাজরানী হবে, মা আর কয়দিন?”

আমি প্রস্তুত হয়েই ছিলাম আজকে মুখোমুখি হবোই-
“উনার ছেলে উনার কাছে যেমন হীরের টুকরো, আমার কাছে আমার মেয়েও তাই ভাইয়া, আমি মেয়েকে সেখানে আর দিবো না।”

ঘরে বাজ পড়লো এই কথায়— এ বাড়ির প্রধান দুজনের উপরে এই প্রথম আমি নিজের মতামত জানিয়েছি!

“তুমি কী বলতে চাও মেজো বউ? এই বংশের একটা মান-ইজ্জত আছে, আর এই বংশের কোনো মেয়ে আগে কখনো স্বামী ছেড়ে আসেনি, তোমার জন্যে কি সব যাবে?”
“আমার কাছে সবার আগে আমার মেয়ের ভালো থাকা, মা”
আবারও রুমের পরিবেশ চুপ হয়ে গেলো, আমি আমার স্বামীর চোখের ভাষা দিব্যি পড়তে পারছি, কিন্তু ও আমাকে বুঝতেও পারছে না। ৩০ বছর ধরে জমে থাকা বুকের ভেতরের অভিমানটুকু আজ বর্ষণ ঝরাবেই! যা হবার হবে! বিয়ের পর অনেক চোখের জল ঝরেছে – উঠতে বসতে শুনতে হয়েছে – বংশবতী মেয়েরা এটা করে না, ওটা করে না – কিছু বলার আগেই এক ভাঙ্গা রেকর্ড বেজেই চলতো, স্বামীও মা ভাইয়ের উপর কথা বলতো না — বড়ো তুচ্ছ হয়েই বইয়ের কাছে আশ্রয় নিয়েছিলাম। বংশ নিয়ে অহংকার করা মানুষ গুলোর পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে কোনো জগত ছিলো না – এদের ঝুড়িতে সার্টিফিকেট ঝুললেও মনের বাড়িতে আলো ঢুকেনি, তাই বাড়ির বউগুলোকে মেয়েমানুষই ভেবেছে – মানুষ ভাবতে শিখেনি কখনো।

“যা হওনের হইছে আমি নাতী জামাইরে ডেকে ইরাকে নিয়ে যেতে বলবো, ভালো বংশের মেয়েরা সংসার ভাঙ্গে না।”
“নতুন একটা পরিবেশে গেলে কেনো একটা মেয়েকেই সবকিছু মেনে নিয়ে চলতে হবে মা? কে দিয়েছে এই দায়িত্ব? সংসারে কোনো ব্যাপারেই মেয়ের কথা বলার অধিকার পর্যন্ত নাই –এক বছর সংসার করলো মেয়ে – ওরা কি ছাড় দিয়েছে কিছুতে? শুধু রান্নাবান্না করার জন্যে বউ নিয়েছে ওরা?”

“আজিব কথা কইও না বউ, মেয়েদেরকেই সব মাইন্না চলতে হয়”
“আমার মেয়ের মুখে হাসি নাই, দিন দিন কেমন যেনো হয়ে যাচ্ছে আর এখন সে ডিপ্রেশনের রোগী – তারপরেও সেই সংসারেই ঠেলে পাঠাতে হবে? আমি মা জল্লাদ নই”।
“আহ এতো রেগে যাচ্ছো কেনো তুমি? চিকিৎসা চলছে দেখবে আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে”।
“তুমি তো শুধু জনক হয়েই খুশী, তাই মেয়ের কষ্ট বোঝার চেয়ে সামাজিকতা আগে ভাবছো, অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক — যে স্বামী বউয়ের উপর চাপিয়ে আজীবন তৃপ্ত তার কাছে এর চেয়ে বেশি কী আশা করবো আমি?”
“আমি কি মেয়ের ভালো চাই না বলতে চাইছো?”
“বিয়ের পর থেকে কেবল আমাকে চাপিয়েই দিয়েছো, স্বামী হয়ে নিজের স্ত্রীকে বুঝতে চাওনি, জনক হয়েই তৃপ্ত ছিলে – সংসার আমার কাঁধে দিয়ে দিব্যি চলেছো তুমি, কী করে মেয়ের কষ্ট বুঝবে? মনে পড়ে বিয়ের পর বাচ্চা হতো না বলে সবাই যখন কথা শোনাতো, তুমি চুপই থাকতে, আর প্রথম বাচ্চাটা মারা যাবার পর সবাই যখন আমাকেই দোষ দিয়েছিল – তখনও তুমি চুপ ছিলে, সদ্য সন্তানহারা মা তোমাদের সবাইর কথার চাপে একদিন একই রোগী হয়েছিলাম যা তোমাদের কাছে ঢঙ বলে মনে হয়েছিল সেদিন!”
“আহ সেসব পুরানো কাসুন্দি এখন বলার কী দরকার?”

“আমার পথে আমার মেয়ে হাঁটবে – মা হয়ে এটা আমি চাই না বলে”
“তুমি কি নিজের সিদ্ধান্তে অটল মীরু?”
“জ্বি ভাইয়া আমি জামাই আর বেয়াইনের সাথে কথা বলেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তারা একই ভাঙ্গা রেকর্ড বাজায় – কত কষ্ট করে সন্তান মানুষ করেছেন সেই গল্প! আরে যে পুরুষ নিজের স্ত্রীকে সম্মান দিতে পারে না, মাকে বোঝাতে পারে না একটা পরিবেশ থেকে নতুন পরিবেশে এলে বউদেরকেও একটু ছাড় দিতে হয়, সে আসলে স্বামী হবার উপযুক্তই হয়নি, মেয়েটা কি বানের জলে ভেসে এসেছে আমার? মায়ের জায়গায় মা থাকবে, আর বউয়ের জায়গায় বউ এই বোধই নাই জামাইয়ের। সেই বাসায় সবকিছুই বেয়াইনের হাতে শখ করেও কিছু করার অধিকার নেই মেয়ের”।

“জামাইয়ের সাথে আমরা আরেকবার বসতে পারি”।
“জামাই আমাকে স্পষ্ট করে বলেই দিয়েছে সে মায়ের ব্যাপারে এক কণাও ছাড় দিবে না, মায়ের ইচ্ছাতেই সব চলবে — আজীবন আমার মেয়েকে স্যাক্রিফাইস করে চলতে হবে– এটাকে সংসার বলে না, বলে সঙ সার – কেনো করবে মেয়ে এই সংসার?”
“বংশের মান- সম্মানের কথাটা ভাবলে না মেজো বউ?”

“ঠুনকো বংশ মর্যাদা ধুয়ে কি আমি পানি খাবো? আপনাদের এতো সমস্যা হলে আমি না হয় মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছি, তবু সেই নরকে পাঠাবো না, আম্মা আপনি যদি সন্তানদের পড়ার পাশাপাশি সামান্য মানবীয় গুণাবলী শিখাতেন তাহলে হয়তো ওরা ভালো স্বামী আর ভালো বাবা হবার চেষ্টা করতো। আফসোস আপনাদের কাছে বংশ আর সার্টিফিকেটের মূল্য মানুষের চাইতেও বেশিই!”

“কী বলতে চাও তুমি? এটা তোমার মেয়ে, মনে রেখো ডিভোর্স হলে আত্মীয়-স্বজনের সামনে মুখ দেখাবো কী করে?”
“ভাইয়া আমার কাছে ছেলেমেয়ে বলে আলাদা কিছুই নাই –সবই সন্তান, এতো বছর এই বাড়িতে কাটিয়ে আমি কারো আপন হতে পারিনি, তাই মেয়েকে সেই পথে আর দেখতে চাই না, আর মায়েদের কাছে সবাই সন্তান হওয়া উচিত, বউ –সেও কারো আদরের সন্তানই”।

“তুমি দেখি নয়া যুগের কথা কও বউ”
“আম্মা, আপনি বউদের কখনও আপন করেননি, ভাবেননি – কেবল নিজের ইচ্ছাগুলো চাপিয়ে দিয়েছেন, আপনার সন্তানেরা বাধ্য ছেলের মতো সেসব শুনে গেছে – ভাবুন বউদের কথা! তারাও মানুষই ছিলো – সুখ-দুঃখের সাথী স্বামীরা হয়নি শুধু মুখ বুঁজে সংসার করেছে, আজ আমার মেয়ের বেলায় এসে মনে হচ্ছে – বহু বছর আগেই আমাদের প্রতিবাদী হওয়া উচিত ছিলো -সন্তানের মায়ায় পড়ে সবাই সয়েই গেছি কিন্তু আর কতো? যে স্বামীদের কাছে স্ত্রীদের দুই আনার মূল্য নেই, সেখানে কেনো পড়ে থাকবে মেয়ে? মায়ের পায়ের নীচে জান্নাত – সেজন্যে কি স্ত্রীদের অবহেলা করতে বলেছে? মায়ের প্রতি যেমন দায়িত্ব আছে, স্ত্রীদের প্রতিও দায়িত্ব আছে, শুধু ভরণ–পোষণের দায়িত্ব নেয়াটা স্বামী নয় এই বোধই অনেক পুরুষের নেই!

মেয়ের জামাইকে দোষ দেই না – যেমন গাছ তার ফল তেমনই হবে তাই না? একদিন সে রাজরানী হবে এই আশায় এখন তার জীবন নরক হবে? এই সময় এইদিন তার জীবনে আর আসবে কি? যে পুরুষ স্ত্রীর কষ্ট বুঝতেই চায় না সে বিয়ে করেছে কেনো? যে মাকে সম্মান করে সে অবশ্যই স্ত্রীকে সম্মান করবে কারণ একজন দুনিয়াতে এনেছে আরেকজন তার দুনিয়া ছেড়ে স্বামীর সাথে সংসার করতেই এসেছে — এটাও বুঝতে হবে”।

এসব বলে নিজের রুমে এসে অনুভব করলাম –
“সবচেয়ে কম দামী ছিলাম একমাত্র আমিই”

মেয়ে যদি আজকে বিপদে না পড়তো হয়তো এভাবেই আমার বাকি দিনগুলোও কেটেই যেতো, এদেশের বেশিরভাগ মেয়ে মেনে নেয়, মানিয়ে নেয় আর নিজের ভেতরে ক্ষতবিক্ষত হতেই থাকে। মেয়ের শ্বাশুড়ির শখ দাদী হবার, কিন্তু আমি জানি একবার মা হলে সেই নরকে আমিও ঠেলে দিবো– বাস্তবতা কঠিন, তাই অসহায়ত্বের মুখে বেশিরভাগ মেয়ে নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দেয় একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু ঠিক আর হয় না।

আমার পথ বড়ো পিচ্ছিল আর কর্দমাক্ত ছিলো আমি সয়েছি কিন্তু – মেয়ের কষ্ট মেয়েকে করা অপমান আর নিতেই পারছি না, অথচ এই দিন আমারও গেছে, কিন্তু প্রতিবাদী হয়ে উঠা আর হয়নি, দেরীতে হলেও বুঝেছি যে আত্মসম্মান বড়ো দামী জিনিস! যেখানে তোমার মূল্য নেই সেখানে পড়ে থেকে নিজেকে অর্থহীন করতে নেই।

শেয়ার করুন:
  • 490
  •  
  •  
  •  
  •  
    490
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.