গল্পটা একজন রেমিটেন্স যোদ্ধার

জেরীন আফরীন:

নাহ্ মেয়েটা বাঁচেনি, আমরা তাকে বাঁচাতে পারিনি, সহজ ভাষায় আমরা তাকে বাঁচাতে চাইনি কিংবা তার মৃত্যুতে আমাদের কিছু আসে যায় না।

জানতে চান তার পরিচয়? সে একজন কৃতদাসী। আমদানিকৃত শ্রমিক নামধারী সে একজন বন্দী দাস, খেলাফতের সময়কার ভোগবিলাসে মত্ত আরব শেখ কিংবা শাসকের সৃষ্ট জাহেলি দাসত্ব, আজ বিবর্তিত নামে হয়েছে আমদানিকৃত শ্রমিক। দেশী দালালদের কাছ থেকে উচ্চমূল্যে বিকিকিনি হয়েছে মেয়েটির। নিজের কেনা গোলামের সাথে যা ইচ্ছা তাই করতে পারে,আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে পড়ে থাকা আরব শেখরা তাই তাদের শারীরিক, মানসিক নির্যাতনে মরে গেছে মেয়েটা। মনে পড়ে এই শেখরাই উটের দৌড়ে সামিল করতো আমাদের শিশুদের, উটের খুরের আঘাতে শিশুদের করুণ মৃত্যুই ছিল তাদের বিনোদন।

হে সুশীল, ভীষণ বিরক্ত আপনারা, কী নির্দ্বিধায় বললেন, “মেয়েগুলোর দোষই বা কম কীসে, কেন যায় শুধু শুধু মরতে!” অথচ কেন একজন আন্তর্জাতিক শ্রমিক, একটি দেশের রেমিটেন্স যোদ্ধা কাজের ক্ষেত্রে তার প্রাপ্য অধিকার পেলো না? কেন সে নিরাপত্তাহীনতায় মরে গেলো, কেন সে বাঁচবার আকুতি জানিয়েও দালালদের নোংরা ইঙ্গিতে আরও একবার নির্যাতিত হলো, কেন তাকে বাঁচাবার চেষ্টা করা হলো না? সেই প্রশ্নগুলো আপনাদের ভদ্র চিন্তার রাডার ছুঁতে পারেনি।

এই আপনারাই অত্যাচারিতকে প্রশ্নবিদ্ধ করে অপরাধীকে অপরাধ করবার সুযোগ বাড়িয়ে দিচ্ছেন।

জানতে চান মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে মেয়েগুলো কেন পাড়ি জমায় মৃত্যুপুরীতে বার বার?

কারণ জন্ম থেকেই বঞ্চনা তাঁদের নিত্যসঙ্গী। তাদের ঘর নেই, খাবার নেই, দরিদ্রতার ভয়াল কবলে তাদের বাবা -মাও তাদের ত্যাগ করে কখনও কখনও। স্কুলে যাবার বয়স থেকেই তাদের নিজেদের বাঁচবার ব্যবস্থা করতে হয় নিজেকেই।মায়ের কোলে তাদের জায়গা জোটে না খুব বেশিদিন। বেঁচে থাকবার তাগিদে ছোট ছোট মেয়েগুলো চলে যায় বিভিন্ন বাসা বাড়িতে কাজ করতে।
আপনারা তাদের সাহায্যকারী বলতে নারাজ তারা আপনাদের বাসার কাজের মেয়ে। তারা দিনান্ত কাজ করে, তাদের বেতনের টাকা নিয়ম মাফিক তাদের মা/বাবা এসে নিয়ে যায়। কিন্তু সেই টাকা তারা চোখেও দেখে না, তাদের দরিদ্রতা শেষ হয় না। সারাজীবনের উপার্জন হারিয়ে যায় তলাবিহীন ঝুড়ির ফাঁক গলিয়ে। চরম নিঃস্ব এই মেয়েগুলোর কখনো ঘর হয় না, সংসার হয় না। যদিওবা হয় তা বড্ড ক্ষণিকের। ক্ষণিকের বাঁধা ঘরে হয়তো হুট্ করেই চলে আসে ফুলের মতো শিশু। তাদের ভবিষ্যৎ সুন্দর করতে জীবিকার তাগিদে আমরণ ছুটে চলে তারা।

বাঁচবার তাগিদে এই ছুটে চলা মেয়েগুলোকে স্বপ্ন দেখায় দালাল বাহিনী। ভদ্র ভাষায় আপনারা যাদের এজেন্ট বলেন। একটু ভালোভাবে বাঁচবার তাগিদে দেশ ছাড়ে তারা। অথচ তাঁরা ঘূণাক্ষরেও জানে না তাদের উপার্জিত অর্থে দেশের উন্নয়নের চাকা ঘুরলেও তাদের দুর্দশায় তাদের সাথে নেই দেশ তথা দেশের দায়িত্বশীল বিভাগ কিংবা মানুষগুলো। তাদের ভরসা যোগানো দালালগুলোও যে জেনে শুনে তাদের অগ্নিগুহায় নিক্ষেপ করেছে দুর্ভাগা মেয়েগুলো তা বুঝতে পারে মরবার প্রাক্কালে।

যেই পুণ্যভূমিতে ধর্ষককের বিচার হয় জনসম্মুখে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে, সেখানে আমাদের দেশের হতদরিদ্র নারী নিত্য ধর্ষিত হতে থাকে বিচারবিহীন প্রতি মুহূর্তে।আমাদের অব্যবস্থা ঢিলেমি কী সহজেই আমাদের সন্তানদের, আমাদের দেশের নারীদের ক্ষুধার্ত নেকড়ের খাদ্য বানায়, আর আমরা চুপচাপ দেখতে থাকি।আমরা অপেক্ষা করতে থাকি জলজ্যান্ত মেয়েগুলোর অত্যাচারিত হতে হতে কফিন বন্দী হবার।

কী দুর্ভাগা ওই মরে যাওয়া মেয়েগুলো। ওদের জন্য কাঁদবারও কেউ নেই! ওরা মরে যায়, ওদের লাশ বুঝিয়ে দেয়া হয়। ওই মৃত দেহের থেকেও প্রিয়জন অধিক অপেক্ষমান থাকে মেয়েটির অর্জিত অবশিষ্ট অর্থের। অন্ধকার একটি সমাজে জন্মানো একটি দুঃখী মেয়ে অন্ধকার কবরে হারিয়ে যায় চিরতরে।

না তার মৃত্যু নিয়ে কোনো মিছিল কিংবা বিক্ষোভ হয় না, কেউ ঘূণাক্ষরেও জানতে পারে না, তার মৃত্যুর দায় এড়াতে পারে না দূতাবাস কিংবা সরকার। বরং ভীষণ বিরক্ত হয়ে আপনারা বলতে থাকেন, ‘কী দরকার ছিল মরতে যাবার’। আর সবকিছুর মতো ক্রমশ হারিয়ে যায় সেই আর্তনাদ, “আমারে বাঁচান, ওরা আমারে মাইরাই ফেলাইবো”।

** সৌদি আরবে নির্যাতনে নিহত গৃহকর্মী নাজমা বেগমকে কেন্দ্র করে লেখা।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.