‘কীসের’ বিনিময়ে রেমিটেন্স আসে দেশে!

দিলশানা পারুল:

আমি দেশে এক বছর এইচআইভি এইডস প্রকল্পে এ কাজ করেছি। আমার প্রফেশনাল জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় ছিলো সেইটা। দুইটা ইন্টারভিউ এর কথা এর আগেও বলেছিলাম। যে ভদ্রমহিলার কেস স্টাডি করছিলাম, সে মধ্যপ্রাচ্যে চার বছর কাজ করে কোন রকমে দেশে পালিয়ে আসতে পেরেছিলো।
তার ভাষ্য মতে সে ভাগ্যবান ছিলো তাই পালিয়ে আসতে পেরেছিলো। সৌদিতে সে যে বাসায় কাজ করতো সেই বাসার বাবা এবং তার কয়েক ছেলে নিয়ম করে তাকে ধর্ষণ করতো। সে বাসায় কোনো পুরুষ মানুষ বেড়াতে এলে সেও তাকে ধর্ষণ করতো।

আমি যখন তার ইন্টারভিউ করেছিলাম ততদিনে সে এইচআইভি পজিটিভ এক এনজিওতে ক্লিনারের কাজ করে। তখনও তার হাতে গলায় সিগারেটের পোড়া দাগ আমি দেখেছি। আমার সহকর্মী কম বয়সী একটা মেয়ের ইন্টারভিউ নিচ্ছিলো একই সময়, তাকে রাখা হতো কাঁচের ঘরে কোনরকম পোশাক ছাড়া, নগ্ন। এইগুলো গল্প না মোটেও।

বাংলাদেশে দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রার খাত এই মাইগ্রেন্ট শ্রমিক। বছরে তারা ১৫ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠায়। কিন্তু কীসের বিনিময়ে? অনলাইনে অসংখ্য অসংখ্য পত্রিকার রিপোর্ট, ভিডিও পাবেন এই সমস্ত বিলিয়ন ডলার কামাই করা শ্রমিকদের দুর্বিষহ জীবন যাপনের তথ্য প্রমাণ হিসেবে।

কিন্তু সেইসব জীবনের গল্প আমাদের সরকারের কাছে, আমাদের কাছে গল্পই থেকে যায়। এইগুলাকে সত্যি মানুষের, বিলিয়ন ডলার কামাই করা শ্রমিকের জীবন বলে আমরা মনে করি না।

এই মানুষগুলোর এক্সপ্লয়টেশন শুরু হয় একদম শুরু থেকে। সরকারের রিক্রুটিং এজেন্সি আছে, কিন্তু বিরাট একটা অংশ বিদেশে যায় দালালের মাধ্যমে। শুরুতে দালালকে একটা বড় এমাউন্টের টাকা দিতে হয় কাজ শুরু করার জন্য। সেইটা ২০-৩০ হাজার থেকে কখনও কখনও লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়।

আপনার পাসপোর্ট করতে কত টাকা লাগে? এরা দশ হাজার টাকা দিয়েও পাসপোর্ট করে, কারণ যেহেতু বেশি শিক্ষা নাই, তাই তথ্য জানে না। এরা ধরেই নেয় পাসপোর্টটাও বোধ হয় এরা বেআইনী করাচ্ছে। অথচ দেশের নাগরিক হওয়ার কারণে এই পাসপোর্ট তুমি চাইলেই করতে পারো এই তথ্যটুকু এদের কেউ জানানোর নাই।
মেডিকেল টেস্টে এদের বেশি টাকা দিতে হয়। বিদেশে শ্রমিক হিসেবে যাওয়ার জন্য নিবন্ধিত হতে বিরাট একটা অংকের ঘুষ দিতে হয়। এবং এই সমস্ত টাকার জোগাড় করার জন্য এরা ভিটে বাড়ি বিক্রি করে, শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমায়। এতোকিছুর পরও এরা যখন বিদেশে যায়, যে কাজ করার কথা বলে এদের নিয়ে যাওয়া হয় বেশির ভাগই সেই কাজ পায় না। যে বেতন দেয়ার কথা বলে এদের নিয়ে যাওয়া হয় বেশির ভাগই সেই বেতন পায় না। আধুনিক দাস বলতে যা বোঝায় এরা তাই।

এখন এইগুলো আসলে পুরনো তথ্য আমরা সবাই জানি, জানতাম। সরকারও জানে। সরকার জানে এবং নির্বিকার থাকে। মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করা শ্রমিকরা বাংলাদেশ এম্বেসিতে গিয়ে কখনও কোনো সাহায্য পায় না। এইটা হরে দরে সত্যি কথা। আমাদের এম্বাসেডাররা হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে দামি মানুষ, এরা এই সব মুর্খ গরিব ফকিন্নিদের সাথে দেখা করবে আপনারা এইগুলা ভাবেন কেমনে?

১৭ কোটি লোকের দেশে এই সব ফকিন্নির বেটিরা বা পুতেরা এক্সপেন্ডেবল অথচ রেমিটেন্স বলার সময় কী গর্ব নিয়ে আমাদের সরকার বলে! এতোটুকু লজ্জাও লাগে না!

শেয়ার করুন:
  • 16.5K
  •  
  •  
  •  
  •  
    16.5K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.