‘সৌদি দুতাবাসের আগে হাসিনা সরকারকে ঘেরাও করেন’

অনুপম সৈকত শান্ত:

ইন্দোনেশিয়ার এই মেয়েটিকে চেনেন? নাম- তুতি তুরসিলাওয়াতি। ২০০৯ সালে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে পাড়ি জমায় সৌদি আরবে। ২০১০ সালে সালের ১১ মে তারিখে সে তার মনিবকে খুন করে ফেলে। সৌদি আদালতে তার বিচার হয়। বিচারে প্রমাণ হয় যে সে খুন করেছে- ফলে ২০১১ সালে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়ে যায়। ৭ বছর ডেথ অন রো’তে থেকে ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর মাথা কেটে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়!

২০১০ সালের সেই খুনের ঘটনার পরে যখন সৌদি আদালতে তুতি’র বিচারকার্য চলছে, তখনই বস্তুত সৌদি আরবের বাসা বাড়িতে কাজ করতে আসা প্রবাসী গৃহকর্মীদের উপরে ভয়াবহ নির্যাতনের কথা ব্যাপকভাবে সামনে আসে! তুতি জানায়- তার উপরে ঘটা প্রথম থেকে অকথ্য শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের কথা। খুনের ঘটনাটিও বস্তুত প্রচণ্ড যৌন নির্যাতন মুখে আত্মরক্ষার্থেই। তুতি তার মনিবকে খুন করে বাসা থেকে পালিয়ে যায়। অপরিচিত শহরে – কোথায় যাবে, কি করবে- এরকম অবস্থায় কয়েকজন আরব এগিয়ে আসে। সে মক্কায় যাওয়ার জন্যে সহযোগিতা চায়- তারা মক্কায় পৌঁছে দেবার আশ্বাস দিয়ে নয়জন আরব পুরুষ মিলে তুতিকে ধর্ষণ করে ফেলে যায়! মক্কায় পৌঁছানো হয় না! শেষে তায়েফে সৌদি পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। বিচার শুরু হয়।

এই নির্মম নির্যাতনের কথা যখন ইন্দোনেশিয়ায় আসে, ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হয়। ইন্দোনেশিয়ার অন্য নারী গৃহকর্মীদের নির্যাতনের কথাও প্রকাশ হতে থাকে। ইন্দোনেশিয়ার সরকারও সৌদি আরবকে তুতিকে তাদের হাতে হস্তান্তর করার আহবান জানাতে বাধ্য হয়! একটা সময়ে- ইন্দোনেশিয়া সৌদি আরবে গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়, সেটা বুঝে সৌদি আরবই আগ বাড়িয়ে ইন্দোনেশিয়া থেকে গৃহকর্মী নিবে না বলে ঘোষণা দেয়! অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়া ও আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও ২০১১ সালে সৌদি আরব আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়ে যায়! এরপরে, আন্দোলন আরো বাড়ে।
সেই ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ আন্দোলন হয়েছে- তুতির ছবি নিয়ে ডেথ পেনাল্টির বিরুদ্ধে ইন্দোনেশিয়ার জনগণ রাস্তায় নেমেছে, বিক্ষোভ করেছে! তুতি তুরসিলাওয়াতি হয়ে উঠেছে ইন্দোনেশিয়ান জনগণের কাছে খুবই প্রিয় একটা নাম, প্রিয় একজন মানুষ- যে দূর প্রবাসে কনডেম সেলে একা মৃত্যুর দিন গুনছে- যাকে যেভাবেই হোক নিজ দেশে ফিরিয়ে আনতে সবাই একাট্টা। শেষ পর্যন্ত, সৌদি আরবের বর্বরতার কাছে পরাজিত হয়েছে, তুতি’র প্রাণ বাঁচাতে পারেনি; কিন্তু সৌদি আরবে ইন্দোনেশিয়ান গৃহকর্মীদের পাঠানো বন্ধ হয়েছে। ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল, এই সময়কালে শ্রীলংকা নারী গৃহকর্ম পাঠানো বন্ধ করেছে। ফিলিপিন তাদের প্রতিনিধিদল সৌদি পাঠিয়েছিল। প্রতিনিধিদল ফিরে এসে জানিয়েছে, আমরা আমাদের মেয়েদের ধর্ষিত হতে সৌদিতে পাঠাতে পারি না!

তুতির বিচারকে নিয়ে যখন ইন্দোনেশিয়ার সাথে টানাপোড়েন শুরু হলো, ফিলিপিন, শ্রীলংকা থেকেও নারী গৃহকর্মীর যোগান বন্ধ হওয়ার জো- সেই ২০১১ সালেই সৌদি আরব বাংলাদেশ থেকে সেই যোগান সচল রাখতে- বাংলাদেশকে প্রস্তাব দেয়। তার ৪ বছর আগে থেকেই বাংলাদেশ থেকে পুরুষ শ্রমিক নেয়া বন্ধ ছিল!
ফলে আমাদের হাসিনা সরকার- লাফাতে লাফাতে গিয়ে হাজির হয়! ২০১৫ থেকে ব্যাপক হারে নারী শ্রমিক পাঠানো শুরু হয়ে যায়। হাসিনা সরকারের উন্নয়নের গল্পে আরেকটি পালক যুক্ত হয়- সৌদি শ্রমবাজার আবার উন্মুক্ত! নারী গৃহকর্মীদের যোগান বন্ধ হওয়ায় যে সৌদি আরব ছিল চাপের মুখে- বাংলাদেশের অতি উৎসাহ দেখে- তারা সুযোগ বুঝে বলে- বেতন হবে মাসিক ৮০০ রিয়াল (ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিনের নারী শ্রমিকদের বেতন ছিল ১০০০-১২০০ রিয়াল), আমাদের সরকারের প্রতিনিধিরা তাতেই রাজী! এইরকম হাভাতে – বুভুক্ষু – মেরুদণ্ডহীন জাতি যে নারীশ্রমিকদের পাঠাচ্ছে- তাদেরকে “ইচ্ছেমতো ব্যবহার” করার সিগনালও বস্তুত তখনই আরব শেখরা পেয়ে যায়!

ফলে আমাদের নাজমা বেগমরা যখন লাশ হয়ে ফেরে- তখন তার জন্যে বর্বর সৌদি আরবকে গালানোর আগে- একশবার নিজেদেরকে গালান! সৌদি আরব দূতাবাস ঘেরাও এর আগে- হাসিনা সরকারকে ঘেরাও করেন, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়রে ঘেরাও করেন! যেই মন্ত্রী- সচিবরা বিভিন্ন সময়ে ফিরে আসা নারীশ্রমিকদের নির্যাতন- নিপীড়ন -যৌন নিপীড়নের অভিযোগগুলোকে “দেশে ফেরার জন্যে বানিয়ে বলছে, বাড়িয়ে বলছে” বলে উড়িয়ে দিয়েছে, অগ্রাহ্য করেছে, পাশ কাটিয়ে গিয়েছে- তাদেরকে ঘেরাও করেন!

তারও আগে যারা রেমিটেন্সের লোভে রেমিটেন্সের উপরে দাঁড়ানো উন্নয়নের চাকচিক্যে মজে সৌদি ধর্ষক শেখদের কাছে নিজ দেশের নারীকে তুলে দিতে এতোটুকু কুন্ঠিত হন নাই- যারা আজও “নারী শ্রমিক না পাঠালে পুরুষ শ্রমিককে নেবে না” বা “নারী শ্রমিক ফেরত নিয়ে আসলে- আমাদের পুরুষ শ্রমিকদেরকেও ফেরত পাঠিয়ে দিবে” বলছেন, তাদের নিজেদেরকেই তো ঘেরাও করা দরকার …।

শেয়ার করুন:
  • 37
  •  
  •  
  •  
  •  
    37
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.