সৌদিতে আর কত ‘নারী শ্রমিক’কে নির্যাতিত হতে দেবো!

প্রবীর কুমার:

নারী শ্রমিক না-দিলে পুরুষ শ্রমিক নেবে না সৌদি আরব।

কেন নেবে না? ঘরের কাজ করানোর জন্য নারী শ্রমিকের খুব দরকার সৌদি আরবের? সমস্যাটা আসলে এখানেই সীমাবদ্ধ না। পরবর্তিতে আরও একটা নিয়ম হয়েছিল যে একজন নারী শ্রমিকের সাথে তার নিরাপত্তায় একজন পুরুষও যাবে, মানে ওই নারীটির স্বামীও যাবেন। সেই ‘প্রকল্প’ যে কতোটা ব্যর্থ হয়েছে, তাতো বলাই বাহুল্য!

সৌদি পরিবারগুলো চায় মূলত যৌন দাসী। ঘরের কাজের দাসী আর যৌন দাসী দুটিই একসাথে প্রয়োজন তাদের। বাড়িতে অমানবিক পরিশ্রম করিয়ে রাতে বাপ-ছেলেরা মিলে ধর্ষণ করার জন্য নারী শ্রমিক প্রয়োজন। আর, কিছু না-বোঝার, না-দেখার ভান করে সেই চাহিদার যোগান দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সৌদি আরব মূলত নারী শ্রমিক নেয় না, নেয় যৌন দাসী।

সৌদি আরব ফেরত বেশিরভাগ নারীর দাবি সেখানে তাদের উপর অমানবিক নির্যাতন করা হয়। তাদের দেখার কেউ নেই। সৌদি বর্বরদের নারী বিদ্বেষ আর সেখানে কাজ করতে যাওয়া নারীদের প্রতি নির্যাতন নতুন চিত্র নয়। যুগ যুগ ধরে এসব চলে আসছে।

প্রতি বছর শত শত সৌদি নারী নিজ পরিবারে নির্যাতন ও কঠোর অনুশাসনের কারণে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। একজন সৌদি কলামিস্টের একটা কথা অনেকটা এরকম ছিলো (শব্দগুলো ভিন্ন হতে পারে)—

‘কোন সৌদি নারী কখনো দোযখে যাবে না, কারণ মানুষ সেখানে দুইবার যেতে পারে না।’

বাস্তবতাটা এমনই- নারীদের জন্য সৌদি আরব দোযখ। আর সেখানে গৃহকর্মী নামক নারীর কী অবস্থা হবে সেটাও সহজে অনুমেয়।

গৃহকর্মীদের প্রতি ওদের অত্যাচারের ধরনের কিছু চিত্র:

* গৃহকর্মীদের ধর্ষণ করা হয়। বাধা দিলে চলে অমানবিক নির্যাতন।
* দুই ভাই কিংবা বাপ-ছেলে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। সেখানে গৃহকর্মী মানে যৌনদাসী।
* গরম তেলে হাত ডুবিয়ে দেয়।
* স্তন, নিতম্ব, গোপনাঙ্গসহ পুরো শরীর গরম লোহা দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।
* মেরে হাত-পা ভেঙ্গে দেয়।
* ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়।
* প্রায় প্রতিদিন বিভিন্ন রকম শারীরিক নির্যাতন চলতে থাকে।
* কঠোর ও অমানবিকভাবে বাড়ির কাজ করায়।
* তিনজনের পরিবারের কথা বলে পনের জনের পরিবারের কাজ করায়।
* ফোন ব্যবহার করতে দেয় না।
* ছুটির দিনে কাজ করলে আলাদা করে যে মজুরি দেওয়ার কথা তা দেয় না।
* কাজ ছেড়ে দিতে চাইলে কিংবা পালাতে চাইলে পাশবিক নির্যাতন চালায়।

এভাবে নির্যাতিত হতে হতে এই নারীদের মাঝে মানসিক ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। দেশে ফেরা অনেক নারীকেই এমন অস্বাভাবিক আচরণ করতে দেখা গিয়েছে, চিকিৎসা নিতে হয়েছে। এখনও অনেকেই অস্বাভাবিক। আর যারা এখনও সৌদি আরবে আছে, তাদের এমন অস্বাভাবিক-নারকীয় জীবন যাপন করতে হচ্ছে।

এমন নির্যাতনের পর আসলেই কি একজন মানুষ সুস্থ থাকতে পারে? একটু ভালো থাকার জন্য, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য তারা সৌদি আরব যায়। কিন্তু গিয়েই তাদের স্বপ্নভঙ্গ হয়। স্বপ্নের দেশের প্রায় প্রতিটি মানুষ এতো দানবীয় হতে পারে তা তাদের আগে জানা থাকে না।

দেশে ফিরে তারা চোখের জলে অনুরোধ করে- আর কোনো নারীকে যেন সৌদি আরব না পাঠানো হয়, আর কেউ যেন স্বেচ্ছায় যৌনদাসী হতে না যায়। অনেকেই অন্তঃসত্ত্বা হয়ে ফেরত এসেছে। এমন অবস্থায় পরিবারের সদস্যরাও তাদের ঘরে নিতে রাজি হয়নি। পরে তাদের আশ্রয় হয়েছে ‘শেলটার হোম’-এ।

কিন্তু এসব শোনার মানুষ খুব কম। যেখানে বেশিরভাগ সৌদি ফেরত নারী তাদের প্রতি হওয়া নির্যাতনের কথা বলছেন, সেখানে বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা) – এর সাবেক মহাসচিব মনসুর আহমেদ কালাম বলেন, মাত্র ২% নারীর এমন অভিযোগ আছে! ভাবা যায়? এরা কোন প্রকৃতির মানুষ? আবার প্রবাসী কল্যাণ সচিব বলেছিলেন- সৌদি ফেরত এসব নারীরা গল্প ফাঁদছে!

যাদের এগিয়ে আসার কথা এই সমস্যা সমাধানে, তাদের মুখে এমন কথায় হতাশ ও অবাক হতে হয়। যেখানে ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, ভারত সরকার সৌদি সরকারের সাথে আলোচনার মাধ্যমে কিছুটা হলেও গ্রহণযোগ্য অবস্থা তৈরি করতে পেরেছে, কিছুক্ষেত্রে তারা নারী শ্রমিক পাঠানোই বন্ধ করে দিয়েছে, সেখানে আমাদের দেশের সরকার বা কর্তৃপক্ষের মুখে এমন কথা কতখানি আশ্চর্য করে?

জানি না এই সৌদি প্রীতি কবে যাবে, কতদিন দায় এড়ানোর খেলা চলতে থাকবে! কিন্তু এর নিরসন প্রয়োজন। অন্যান্য দেশের কর্মীদের তুলনায় বাংলাদেশের কর্মীদের বেতন অনেক কম। এই বৈষম্য নিয়েও আলোচনা করা প্রয়োজন। শুধু সৌদি আরব নয়, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে কাজ করতে যাওয়া নারী গৃহকর্মীদেরও অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

সৌদি আরব থেকে নাজমার লাশ এসেছে। নাজমার মৃত্যু কিংবা হত্যার আগে নাজমা তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানিয়েছিলো বারবার। কিন্তু নাজমা শেষপর্যন্ত এসেছে ঠিকই, তবে লাশ হয়ে। তাও মৃত্যুর এক মাস ২৪ দিন পর!

দেশের সেই ‘বিশেষ অনুভূতি’র মানুষগুলো এখন চুপ! সৌদি আরবের অত্যাচারের কথা এলে এরা কাচুমাচু হয়ে মাথা নিচু করে থাকে। অনুভূতির জোশ থাকে না, ঘেরাও করার জন্য সৌদি দূতাবাসের পথ ভুলে যায়।

ফেলানীর জন্য আমরা সবাই ব্যথিত। এমন দৃশ্য সবাইকে নাড়া দিয়ে যাবে। কিন্তু এই নাড়া দেওয়াটা কেন সিলেক্টিভ হবে? কেন শুধু বাংলাদেশ-ভারত বর্ডারেই এই অনুভূতির নড়াচড়া চলবে!

ফেলানীর ভাই বলে যারা চিৎকার করে, তারা সৌদি আরবে নির্যাতনে নারীগুলোর ভাই হতে পারে না কেন? সৌদি আরব তাদের বোনদের ধর্ষণ, সীমাহীন অত্যাচার করলেও কেন বিপ্লবী অনুভূতি জাগে না!

আসলে এদের কাছে অত্যাচারের চেয়ে অত্যাচারীর ধর্মীয় পরিচয় বড়।

শেয়ার করুন:
  • 714
  •  
  •  
  •  
  •  
    714
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.