নারীবাদী শুনলেই আঁতকে উঠেন কেন পুরুষ পুঙ্গবেরা?

ইমতিয়াজ মাহমুদ:

প্রতিটা নারীর জীবনের গল্প একই। তিনি বাংলাদেশের নারী হলেও যা, ইউরোপ আমেরিকা বা আফ্রিকার হলেও তাই। নারীর জীবনের গল্পটার নানারকম ছোটখাটো ঘটনাবলীর একটু এদিক সেদিক হয়, পাত্রপাত্রী ভিন্ন হয়- কখনও পুরো প্রেক্ষাপটটাই হয়তো আলাদা হয়- কিন্তু মূল কাঠামোটা আর মূল যে সুরটা, সেটা সর্বত্র একদম একই থাকে। (কোটিতে দুই একটা ব্যক্তিক্রম পাবেন হয়তো, কিন্তু সংখ্যার বিচারে সেগুলি এতো কম যে সেফলি ইগনোর করতে পারেন।)

কী এই গল্পটা? এই গল্পটা হচ্ছে এই প্রকার-

প্রতিটা নারী পুরুষের হাতে একেকটা অস্থাবর সম্পত্তি। ঘটি বাটি গাড়ি খেলনা রসগোল্লা আপেল বা কলা অথবা, যারা খুব বেশি সম্মান দেয় তাদের চোখে, মহামূল্যবান পাথর বা হিরে মানিক। কিন্তু শেষ বিচারে প্রতিটা নারীই পুরুষের মালিকানাধীন একেকটা বস্তু বা, শুনতে ভালগার শুনাবে, ‘মাল’।

একটি শিশু যখন জন্ম নেয় সে মানুষ হয়েই জন্মায় বটে, কিন্তু শিশুটির মধ্যে যে শিশুটির ঐ বাড়তি ঐ মাংসপিণ্ডটি থাকে না তাকে আমরা ধীরে ধীরে নারী হিসাবে তৈরি করি। নারী হিসাবে তৈরি করি মানে তাকে আমরা ঐ ‘মাল’ হিসাবেই তৈরি করি। এরপর যতদিন সে বাঁচে, সেই তাই হয় যেটা পুরুষ অনুমোদন করে। সে কেবল সেইটাই করতে পারে যেটা পুরুষ চায় যে সে করুক। আর যেহেতু নারীটি একটি মাল মাত্র, সে তার নিজের মালিকানা কখনও পায় না, তার দেহের মালিক সে নয়, তার প্রতিভা দক্ষতা শ্রম কোন কিছুরই মালিক সে নিজে নয়।

এইটাই হচ্ছে প্রতিটা নারীর গল্প। আপনি আপনার চারপাশে যতজন নারীকে চেনেন, মিলিয়ে দেখতে পারেন। আপনি নিজে যদি নারী হয়ে থাকেন, তাইলে এইট গল্পটা আপনি নিজে যাপন করছেন।

এখন তো আমি তর্ক করি না- আগে ধার্মিকরা আমার সাথে তর্ক করতে আসতো। বলতো যে না তোমার এই কথাটা ঠিক না, আমার ধর্মে নারীকে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ সম্মান।

কীরকম? নারীকে তুলনা করা হয়েছে সবচেয়ে মূল্যবান পাথরের সাথে- যেন হিরে জহরত ইত্যাদি। রিয়ালি? নারীর জন্যে আপনি সবচেয়ে দামী ‘মাল’ এর চেয়ে বেশি আর কোনো সম্মান কল্পনাও করতে পারেন না? ওরা তখন বলতো, এর চেয়ে উঁচু সম্মান আর কী হবে?
কেন? মানুষ! নারীকে মানুষ বলতে পারেন না? আপনার বোনটিকে হিরে নামক পাত্থরের ঠুকরা না ভেবে আপনার সমান মানুষ ভাবতে পারেন না? বাপের সম্পত্তি ভাগ করার সময় আপনি কেন বোনের দ্বিগুণ পাবেন?
সম্মান না আমার ঠ্যাঙ! নারীকে আলাদা স্ট্যাটাস দিয়ে আলাদা করে সম্মান দেওয়ার দরকার নাই। বলতে পারবেন যে নারী কোন হিরে জহরতও না বা বিশেষ মর্যাদার কোন প্রাণী নয়- মানুষ, ষোল আনা মানুষ, নিতান্তই মানুষ, আপনার সমান মানুষ?
পারবে না। তাইলে আর এইসব বাতেলা করে লাভ কী?

প্রতিটা নারীকে এই জীবনই যাপন করতে হয়। বস্তুর জীবন, দাসীর জীবন, গরুর জীবন- মাল, মালের জীবন। এইটা তো কোনো আনন্দের জীবন নয়। জন্মেছি মানুষ হয়ে আর বাঁচতে হচ্ছে ‘মাল’ হয়ে এইটা কোন জীবন হলো? নিজের শরীরের মালিক নিজে না, নিজের প্রতিভার মালিক নিজে না, নিজের ইচ্ছার মালিক নিজে না। কীসের জীবন এটা?

নারীর জীবন যে তার নিজের জীবন নয় সেটা প্রতিটা নারীরই জানেন। শৈশব থেকেই নারী শিখে যায় তার জীবনের এইরূপ অর্থহীনতা। বেশিরভাগই এইটাকে ভবিতব্য মেনে নিয়ে জীবনটা যাপন করে যায়। কেননা সংস্কৃতি- বা মানুষের আইন কানুন ধর্ম গান সাহিত্য সবকিছু- নারীকে এইগুলি শিখিয়েই মানুষ থেকে নারীতে রূপান্তর করে। কিন্তু সকলেই তো এইটা মেনে নিয়েই জীবন যাপন করতে চাইবে না।

ক্রীতদাসদের মধ্যে বেশিরভাগই নিজের ক্রীতদাস স্ট্যাটাসকে একটি বৈধ অবস্থা মনে করতো। কিন্তু দুই একজন এর মধ্যে ঠিকই বুঝে যায় যে না, এইটা তো অন্যায়, আমিও মানুষ। নারীদের মধ্যেও অনেকেই টের পান।

টের পেলে কী হয়? নারীটি চিৎকার করে। প্রতিদিনের জীবনযাপনে সে শৃঙ্খলটি দেখতে পায়, সেটি তাকে যন্ত্রণা দেয়, সে চিৎকার করে। এই চিৎকারটিকেই আপনি আমি ‘নারীবাদ’ বলে হাসি ঠাট্টা করি, আর সেই নারীটিকে ‘নারীবাদী’ বলে খোঁচা দিই।

কেন আমরা নারীবাদীদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করি আর খোঁচা দিই আর বাতিল করে দিতে চাই? কারণ কিন্তু ঐটাই- নারীকে তো আমরা মানুষ মনে করি না এবং নারী যে একটি চিন্তার মালিক হতে পারে সেটাও আমরা অনুমোদন করি না। এই যে নারীরই চিৎকার, এইখানেও আমরা মানে পুরুষরা চাই যে নারীটি চিৎকার করুক ঠিক আছে, কিন্তু এই চিৎকার তো সহি চিৎকার নয়, চিৎকার হতে হবে অনুমোদিত পন্থায়।

ভাইয়া, যাঁতাকলের নিচে যে আছে তাকে চিৎকারের গ্রামার শেখাতে চাচ্ছেন? এইটা করবেন না মেহেরবানী করে। নারীরই অধিকার নিয়ে যারা কথা বলেন, ওদেরকে বলতে দেন যে ভাষায় ওরা বলতে চায় সেই ভাষায়। করতে দেন নিজেদের মধ্যে তর্ক, নিজেদের মধ্যে বিতণ্ডা। এইভাবেই সকলে একসময় ঠিক পথটা খুঁজে পাবেন।

আর শুধু নারীরাই নয়, আপনি নিজেও দেখতে পাবেন আপনার চিন্তা কতোটা অন্তঃসারশূন্য কতোটা নিষ্ঠুর ও দানবীয়। মনোযোগ দিয়ে শুনুন নারী অধিকার কর্মীরা কী বলতে চায়- মিলিয়ে দেখুন আপনার চারপাশে, মিলিয়ে দেখুন নিজের জীবনের সাথে। পথ আপনার চোখেও ধরা দিবে একদিন।

কিন্তু আপনি নারীদের এইসব কথা শুনতে পারবেন না। সেই কলিজা পুরুষের সাধারণত থাকে না। কেননা নারীর অধিকারের কথা উঠলেই অনিবার্যভাবে আপনার এই বর্তমান সমাজ কাঠামো এইসব প্রথা প্রতিষ্ঠান মূল্যবোধ সবকিছু ভেঙে ফেলার কথা উঠবে। আপনার সেটা সহ্য হবে না। আপনি তো প্রতিক্রিয়াশীল- আপনি চান যে বর্তমান যে সমাজ কাঠামো রয়েছে সেটা বজায় রাখতে হবে। সমাজের তন্তু বা ফেব্রিক অব দ্য সোসাইটি নাকি নষ্ট করা যাবে না। তাইলে নারীবাদীদের কথা তো আপনার সহ্য হবে না। নারীর অধিকার তো আপনার ঐসব তন্তু ফন্তু বজার রেখে নিশ্চিত করা যাবে না। হয় আপনাকে এই সমাজ ভাঙতে হবে অথবা নারীর উপর অন্যায় চালিয়েই যেতে হবে, মাঝামাঝি কিছু তো নেই।

সেইজন্যে পুরুষ পুঙ্গব ভাইয়েরা নারীবাদ শুনলেই আঁতকে ওঠেন- ওরে এই তো আমার সমাজের তন্তু এলোমেলো করে দিতে এসেছে ধ্বংস করে দিতে এসেছে।

উদাহরণ দিব? দিই।
আমাকে বলেন নারীর দেহের মালিক কে?
কোনরকম কিন্তু ফিন্তু ছাড়া।
বলেন নারীর দেহের অন্তর্ভুক্ত একটি প্রত্যঙ্গ রয়েছে জরায়ু- ঐটার মালিক কে? স্পষ্ট করে এই কথাটির উত্তর দিতে পারবেন? পারবেন না।

প্রতিটা পুরুষ, এবং দাসপ্রথাকে বৈধ মেনে নিয়েছে সেইরকম দাসদের মতো যেসব নারীরা, এর এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অবশ্যই অবশ্যই নানারকম শর্ত যুক্ত করবেন। নারীর শরীরের মালিক নারী নিজে এই অমোঘ ও অনিবার্য কথাটা বিনা শর্তে যারা মেনে নিতে পারেন না, সেইসব প্রতিক্রিয়াশীল জন্তুর কথার কি গুরুত্ব আছে?

শেয়ার করুন:
  • 155
  •  
  •  
  •  
  •  
    155
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.