‘আন্দোলনের শেষ থাকে না, থাকে শুধু শুরুয়াত- #মিটু’

সরিতা আহমেদ:

খ্যাতির বিড়ম্বনা ব্যাপক।
কখন ‘সুখ্যাতি’টা ‘কুখ্যাতি’তে বদলে যাবে – ধরতে পারবেন না!
সোশ্যাল মিডিয়ায় নারী নির্যাতনের অপরাধ প্রকাশ্যে আসা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই আবারও উত্তাল হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। সৌজন্যে #মিটু আন্দোলন। এবারে নারী লাঞ্ছনায় প্রকাশ্যে এসেছে নাট্য ও সাংস্কৃতিক জগতের কিছু দিকপালের (!) নাম – সুদীপ্ত চ্যাটার্জি (থিয়েটার ব্যক্তিত্ব), রঞ্জন ঘোষাল (‘মহিনের ঘোড়াগুলি’-ব্যান্ডের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা) এবং মলয় মিত্র (নাট্য ব্যক্তিত্ব)।

বাংলার সাংস্কৃতিক জগতের রীতিমতো তারকা এনারা। সাধারণ মানুষ শ্রদ্ধা ও সমীহের চোখে এদের দেখে।
অথচ অভিযোগকারী মেয়েদের জবানবন্দীতে যখন এদের অন্য এক চেহারা ফুটে ওঠে, ‘শিল্পী’ তকমাধারী একেকজন বিখ্যাত লোকের মুখোশের আড়াল খসে গিয়ে কদর্য অমানুষিক মুখটা জনসমক্ষে বেরিয়ে যায় তখন বিশ্বাস, ভরসা ইত্যাদি শব্দবন্ধের প্রতি কার্যত একটা ভয় চেপে বসে আপামর জনতার!

কিশোরী বা টিনেজ মেয়েদের বিশ্বাসের, শ্রদ্ধার, প্রিয়তম শিল্পীর প্রতি থাকা স্বাভাবিক আবেগ- উচ্ছ্বাসের নির্মম সুযোগ নিয়ে যখন রঞ্জন বা মলয়ের মত তারকা প্রৌঢ়রা, যাদের প্রত্যেকে সুখী দাম্পত্যের ধ্বজাধারী বলে ‘পেজ থ্রি’-তে মুখ দেখান নিয়মিত, অভিনয় শেখানোর অছিলায় ‘সিডাকশান’ শেখাতে যান, অশ্লীলভাবে কচি নারীদেহ চটকে বিষম আনন্দে নিজেদের পুংদণ্ডকে আরাম দেন – তখন সভ্য-অসভ্যের সংজ্ঞা ভাবী প্রজন্মের কাছে অলীকই ঠেকে।

#মিটু আন্দোলনের মেয়েরা খোলা চিঠিতে তাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধার ‘স্যার’দের হাতে অযাচিত যৌন নির্যাতনের যে বর্ণনা দিয়েছে তার ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে এতোদিনের জমাট বাঁধা অব্যক্ত অপমান, লাঞ্ছনা আর অপরিসীম কষ্ট। যে কোনো মানুষ তার নিজের, নিজের সন্তানের অথবা পরিচিতার এহেন নির্যাতনের দৃশ্য কল্পনা করেই ক্ষোভে ফেটে পড়বে, চাইবে সুবিচার।

সোশ্যাল মিডিয়া তো নিজের কথা নিজমুখে বলতে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার এক সহজতম মাধ্যম। যে ক্ষমতা রাষ্ট্রব্যবস্থা কেড়ে নিতে পারে ‘অফিসিয়াল’ আইনের অজুহাতে, সেই ক্ষমতা ‘আনঅফিসিয়ালি’ আমাদের দেয় গণমাধ্যম যাকে হালফিলে সোশ্যাল মিডিয়া বলি। তাই তো গণমাধ্যমকে গণতন্ত্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ বলে। সুতরাং এই #মিটু আন্দোলনের জন্ম এবং তাতে অংশ নেওয়া মেয়েরা গণতান্ত্রিক পথেই নিজেদের দাবি জানিয়েছেন। দেরিতে হলেও অন্যায় সামনে আনার সাহস তাঁরা দেখিয়েছেন – সুবিচার তাদের প্রাপ্য।

এই চরম অমানবিক পরিস্থিতিতে নির্যাতিতের পাশে দাঁড়ানো যখন আশু-কর্তব্য তখন এই সোশ্যাল মিডিয়াতেই এক অন্য চেহারার সোসাইটি দেখতে পাচ্ছি। প্রকাশ্যে নিজেদের যৌননির্যাতনের কথা বলা #মিটু আন্দোলনের মেয়েদের নির্মমভাবে ভিক্টিম ব্লেমিং এ নেমে পড়েছে কিছু শিক্ষিত (?) মানুষ। তাদের মন্তব্য পড়ে বোঝাই যায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শেখা বাংলা বর্ণমালা গেঁথে ফেসবুকে শব্দ টাইপ করতেই শেখা আছে কেবল, কিন্তু বুদ্ধির গোড়ায় আছে কেবল মন্দচিন্তার অসুখ। সুশিক্ষা আর কুশিক্ষার ফারাক এরা জানে না।

কিছু নারীও আছে তাদের সাথে। এরাও একইরকম অসুস্থ মানসিকতার লোক যারা দীর্ঘদিনের বিকৃত অভ্যাসে অদ্ভুত ম্যাসোকিস্ট ক্লীবে পরিণত হয়েছে। অভিনয়ে ‘ইম্প্রোভাইজ’ করানোর নামে বন্ধ দরজার আড়ালে ‘জোর করে মুখে পেনিস গুঁজে…’ দেওয়াকে ‘ভালোই তো মজা লোটার’ তকমা দিচ্ছে এই নেটিজেনরা। বলা হচ্ছে ‘তখন যদি এতো অন্যায়ই হয়ে থাকে তবে চুপ ছিলে কেন? এতোদিন বাদে কেন এসব বলতে এলে?’

আসল ব্যাপারটা এনারা উত্তেজনার আবেশে গুলিয়ে ফেলছেন। শিল্প, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক প্রতিভা ইত্যাদি কোনোটাই কোনো গুণই যে জিনিসটার মাপকাঠি হতে পারে না তা হলো – মানুষের নৈতিক চরিত্র এবং কৃতকর্ম।
অপরাধ – তা আজ ঘটুক বা ২০ বছর আগে, সময় দিয়ে তার বিচার চলে না। কারণ কালচক্রের অবিরাম গতি কোনো অপরাধের ঘৃণ্যতা বা তীব্রতাকে কোনও অংশে কমিয়ে ফেলতে পারে না। গভীরতা দিয়েই তার বিচার হয়।
যখন হোক, যেভাবেই হোক তা প্রকাশ্যে বেরিয়ে এলে যেকোনো সুস্থ সমাজ তার প্রতিকার দাবি করবে। এটাই হওয়া উচিত।

একটা টিনেজ মেয়ে ঘটনার সময় কতটা ভীত সন্ত্রস্ত লজ্জিত এবং অপমানিত থাকে সেটা সেই ভিক্টিম ছাড়া আর কেউই ধারণা করতে পারবে না। সামাজিক মানসিক পারিবারিক চাপ কিভাবে কতটা তীব্রতায় কিশোরী ভিক্টিমের উপরে নেমে আসে তা আন্দাজ করা স্মার্টফোন শোভিত পক্ককেশ বা শুভ্রবেশ নেটিজেনদের পক্ষে আক্ষরিকই অসম্ভব। সুতরাং সেই মেয়ে ওইদিন, ওইবছর চুপ কেন ছিল – এই প্রশ্নটা করাই অবান্তর। আর তার চেয়েও অবান্তর যুক্তি হলো ‘যেহেতু সে ১০ বছর আগে চুপ ছিল তাই তার এখন মুখ খোলা উচিত না!’
কিন্তু আমাদের সমাজে আজ ঠিক এই এই অবান্তর মন্তব্যই ভেসে বেড়াচ্ছে। সেগুলোর প্রতিক্রিয়া হচ্ছে মারাত্মক। সম মানসিকতার মর্ষকামী লোকে এসব কথা খাচ্ছেও দারুণ।

আর এইসব প্রশ্নবাণের ঠেলায় বেবাক গুটিয়ে থাকা সমাজে নিরালায় আরও মেয়ের সর্বনাশ ঘটে চলেছে আরও কিছু ‘বিখ্যাত’ বা ‘অখ্যাত’দের হাতে। জানতেও পারছি না। কারণ ওই যে, ‘বললে এখনই, নইলে কখনও নয় ‘–আপ্তবাক্যটা ভার্চুয়াল খাপ-সালিশি আমাদের শেখাচ্ছে!

আমরা, মানে যারা এমন বিখ্যাতদের নামটুকুই শুনেছে মাত্র অথবা শোনেনি, কেবল পরিচিত হাউজটারই নাম শুনেছে, সমীহ করেছে, একটা আধটা রিপ্লাই পেলে নিজেকে সেলেব মনে করে আহ্লাদে গলে গেছে – তারা এঁদের তথাকথিত ‘পেশাদারিত্ব’, ‘সম্মান’, ‘শিল্প প্রতিভা’ ইত্যাদির জায়গা থেকে পদস্খলনের বাড়বাড়ন্ত দেখে আক্ষরিক চমকাচ্ছি। আর মনে মনে চাইছি এইই যেন তালিকার শেষ নাম হয়। কিন্তু পরদিনই ভুল প্রমাণ হচ্ছে। উঠে আসছে আরও কেউ, আরও কোনও বড় অপরাধের ভাণ্ডার খুলে।

যুক্তি আর পাল্টা যুক্তির পাশাপাশি ন্যায় বিচার পাওয়ার একটা ‘ইউটোপিয়ান’ সমাজের স্বপ্ন লালন করে আমরা আবারও স্ক্রল করে দ্রুত চোখ ফেরাচ্ছি অন্য পোস্টে! ওদিকে কিন্তু সেই ইউটোপিয়ান (!) সমাজ যদ্দিন না আসে তদ্দিন ভিক্টিম শেমিং বা ব্লেমিং -এ মেতে থাকা উন্মাদরা যারা এদ্দিন শিশুতোষ বাসনায় “সব পুরুষ এক না” ট্যাবলেট গিলিয়েছে; আবারও জিকির তুলছে “সব মলেস্টার এক না”, “#মিটু, ফিটু তাড়াতে দুনিয়ার__[ড্যাশ] এক হও!” – মার্কা ফেস্টুনে!

আসলে যতদিন ইগোদণ্ডের ডগায় ‘শিক্ষিত’ ট্যাগটা অলক্ষ্যে টাঙানো আছে, ঠিক আছে। কিন্তু কখন যে তার প্রিফিক্সে ‘কু’ ট্যাগ জুড়ে যাবে ধরতে পারবেন না।

ব্যাপার হলো, যেকোনো “আন্দোলনের শেষ থাকে না, থাকে শুধু শুরুয়াত!”
আর মেয়েদের ক্ষেত্রে তো দিন যত গড়াবে নির্যাতনের ইতিহাস নতুন আঙ্গিকে লেখা হবে – সুতরাং নারীর ন্যায়বিচার আন্দোলন সৃষ্টির শেষতক নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে। নতুন ফর্মেটে, নতুন শব্দে, নতুন হ্যাশট্যাগ দিয়ে….. এটাই তো আধুনিক সভ্যতায় দস্তুর। তাই না!

লেখক: স্কুল শিক্ষিকা।

শেয়ার করুন:
  • 83
  •  
  •  
  •  
  •  
    83
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.