অস্থির আর অসহিষ্ণু সময়ে আমরা

শাহরিয়া দিনা:

বাগেরহাটে মোবাইল ফোন কিনে না দেয়ায় নিজের মাকে জবাই করেছে মাদকাসক্ত এক ছেলে।

লোহাগড়ায় মিম নামের এক মেয়েকে তার সাত বছর বয়সী খালাতো ভাই ডিম বলে ডেকেছে। মিম ক্ষেপে গিয়ে ভাইকে মেরে ফেলেছে।

ফেসবুকে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দেয়ার প্রতিবাদে ভোলায় মুসল্লিদের একটি সমাবেশে পুলিশ-জনতার সংঘর্ষে চারজন নিহতসহ শতাধিক আহত।

চট্টগ্রামে পরকীয়ার জের ধরে চার বছরের সন্তান এবং স্বামীকে হত্যা করেছে এক নারী।

রাজশাহীতে মায়ের সামনে থেকে তানিয়া আক্তার টিয়াকে তুলে নিয়ে গেল কথিত প্রেমিক। পরেরদিন মিললো তানিয়ার লাশ।

উল্লেখিত বিষয়গুলো একদিনের কিছু আলোচিত সংবাদ।

যখন একটি সমাজে অস্থিরতা তৈরি হয়, নৈতিকতার অবক্ষয় হয় তখন ওই সমাজের মানুষের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা দেখা যায়।

দিন দিন আমরা অস্থির আর প্রচণ্ডরকম অসহিষ্ণু হয়ে যাচ্ছি। কে কাউকে সহ্য করতে পারছি না। নিজের মত নিজের পথই শ্রেষ্ঠ। নিজের প্রভুত্ব বিস্তারের দাপটে অন্ধ। স্বার্থসিদ্ধিতে বাধা এলে আপনজনকেও পথ থেকে সরিয়ে দিতে দ্বিধাহীন। সার্বিক উন্নয়নের সূচক উর্ধ্বমুখী হলেও নৈতিকতার সূচক নিম্নমুখী। মানবিক গুণাবলির মানুষ এ সমাজে সংখ্যালঘু।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করলে একটা মানসিক অসুস্থদের সমাজ ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না। কোন কারণ ছাড়া অথবা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্র ছাত্রকে মারছে। স্বামী স্ত্রীকে, স্ত্রী স্বামীকে খুন করছে। মা/বাবা সন্তানকে, সন্তান মা/বাবাকে হত্যা করছে। ভাইয়ের হাতে ভাই খুন হচ্ছে। সন্দেহের বশে দলবদ্ধভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলছে নিরস্ত্র সাধারণ একজন মানুষকে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া গুজবে বিশ্বাস করে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে নৈরাজ্যকর অবস্থা সৃষ্টি করে লাশ বানানো হচ্ছে মানুষকে।

অথচ সভ্যতার উন্নতির সাথে সাথে সভ্য মানুষ হবার কথা আমাদের। একটি ভারসাম্যপূর্ণ সামাজিক অবস্থা থাকবার কথা, যেখানে মত প্রকাশের থাকবে স্বাধীনতা। থাকবে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। কিন্তু আদতে তা হচ্ছে না। সত্যিকারের শিক্ষার আলো বঞ্চিত একটা বিশাল জনগণের হাতে পৌঁছে গেছে প্রযুক্তি। ফলাফল হিসেবে ইতিবাচক ব্যবহারের চাইতে তা নেতিবাচক ব্যবহৃত হচ্ছে, সমাজে পড়ছে এর ক্ষতিকারক প্রভাব।

আমাদের মূল সমস্যা জ্ঞানের স্বল্পতা। জিপিএ ফাইভ পেয়ে উত্তীর্ণ হওয়াটাই মুখ্য, জানাশোনা বা জ্ঞানের পরিধি বাড়ার মতো উদ্দেশ্যরা গৌণ। এর ফলে যেটা হচ্ছে, সার্টিফিকেট আহরণ হচ্ছে ঠিকই, হরণ হচ্ছে জ্ঞান, অবক্ষয় হচ্ছে নৈতিকতার, রক্তক্ষরণে মরছে মানুষ। আমরা শিক্ষিত হচ্ছি, জ্ঞানী হচ্ছি না। আমরা প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থেকে ধনী হচ্ছি, মানবিক হচ্ছি না। আমার প্রযুক্তি হাতের নাগালে পেয়ে যাচ্ছি, দক্ষ হচ্ছি না।

অপরাধ বিশ্লেষক, মনোবিজ্ঞানী, আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এইসব নৃশংস ঘটনার জন্য দোষী ব্যক্তিদের বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা, ক্ষেত্রবিশেষে পার পেয়ে যাওয়া, ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের মতো বিষয়গুলোকে দায়ী বলে মনে করেন। যখন অপরাধ করে পার পাবার সম্ভাবনা থাকে বা ধরা পরার ঝুঁকির থেকে লাভই বেশি, তখন মানুষ অপরাধে জড়ায়।

পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় এখন সবাই আত্মকেন্দ্রিক। নিজেকে নিয়ে সবাই ব্যস্ত বলেই রাস্তায় শতেক মানুষের সামনেও নৃশংসতা চললেও কেউ এগিয়ে আসে না। সোচ্চার প্রতিবাদও দাবি আদায় না করেই নিষ্প্রভ হয়ে যায়। দুর্বল হয়ে পড়েছে যৌথ পরিবারিক বন্ধন, দূরত্ব তৈরি হয়েছে আত্মীয়তার সম্পর্কে। যান্ত্রিক জীবনে মায়া, মমতা, ভালোবাসার মতো আবেগীয় ব্যাপারগুলো গুরুত্বহীন। যে শিশু ভালোবাসার বদলে চাপের মধ্যে বড় হয়, তার মনে হিংসাত্মক ব্যাপারগুলো চলে আসাই স্বাভাবিক।

পৃথিবীতে একটা মানুষের রূপ একেকজনের কাছে একেকরকম। তার চেয়েও বড় সত্যি প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যেই একটা দ্বৈত সত্ত্বা কাজ করে; একটা পশুত্ব আরেকটা মনুষ্যত্ব। কারো ক্ষেত্রে একটার মাত্রা প্রবল কারো ক্ষেত্রে কম। ঠিক যেন, আমার ভেতরেই বাস করে এক অন্য আমি। যাকে চিনি না আমি। মাঝে মাঝে তার উপস্থিতিতে নিজেকেই চমকে যেতে হয়। সেই উপন্যাসের চরিত্র ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইডের মতো।

নিজেকে বিশ্লেষণ করা দরকার আমার কোন সত্ত্বা প্রবল? আমি কতটুকু মানুষ হতে পেরেছি? মানবিক গুণাবলি ছাড়া মানুষ হয় না। ভালোবাসা নেই যেখানে সেটা আর যাই হোক সুখী পরিবার হয় না। মানবিক হতে শেখায় না যে ধর্ম, সেই ধার্মিকের বিশ্বাস নিশ্চয়ই সৃষ্টিকর্তার কাছেও গ্রহণযোগ্য না।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.