আরোপিত মাহাত্ম্যের হাত থেকে ‘মাতৃত্ব’কে মুক্তি দিন

রোখসানা চৌধুরী:

১. ‘মাতৃত্বে’র মাহাত্ম্য আমাদের কাছে ধর্মগ্রন্থের চাইতেও অনিবার্য করে তোলা হয়েছে। যে কারণে মায়ের কান্না বিক্রি করতে পারছে কর্পোরেটরা। কিন্তু এই মাহাত্ম্য না থাকলে পুঁজিবিশ্ব কিংবা ধর্ম সবারই সমস্যা। তাই আবরার হত্যার ঘটনায় এগারোজন মায়ের ব্যর্থতাকে আড়াল করা হয় একজন মায়ের কান্নার বিপরীতে। অথচ ব্যর্থতা কিংবা সার্থকতা কোনটাই পুরোপুরি মায়ের হতে পারে না।

র‌্যাডিকেল ফেমিনিজম মাতৃত্বের এই মাহাত্ম্যজনিত ভার থেকে মুক্তি চায়।আবরারের বাবাও কেঁদেছিল। সেটি কিন্তু ভাইরাল হয়নি। কারণ তার বিক্রয় মূল্য নাই।
এভাবে একটা জনমানসের অনুভবকে বিক্রি করে পুঁজিবাদ। তার মানে পুঁজিবাদ আসার আগে কি ‘মা’ মুক্ত ছিল? না, তখনও সামন্তবাদ ধর্মের সহায়তায় নারীকে আটকে রাখার সবচেয়ে সফল কৌশলটিই গ্রহণ করেছিল।

‘মা’ পদবী কেন মহৎ নয়? মাহাত্ম্য আসে ব্যক্তির নিজস্ব অর্জন থেকে। ‘মা’ একটি সামাজিক পদবী। তাকে পদে পদে শর্ত পূরণ করতে হয়। সমাজ তাকে মা হওয়ার জন্য বাধ্য করতে কৌশলের আশ্রয় নেয়। ‘নারীরা মায়ের জাতি’, ‘মা হওয়াতেই সকল সার্থকতা’,’নারীর পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত’ — এই সব স্তোক বাক্যের মাধ্যমে মাকে যে মাহাত্ম্য দেয়া হয় তা যে নব্বই ভাগ মেকি এটাও প্রমাণিত হয়েই যায় যখন মাকে সন্তানের উত্তরাধিকার দেয়া হয় না, বংশের উত্তরসূরী হিসেবে স্বীকার করা হয় না। মায়ের ভাবমূর্তি সর্বোচ্চ অধিষ্ঠান অথচ মাতৃকালীন সকল প্রক্রিয়া ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখা হয় যে কারণে বাংলাদেশে একে ‘অসুস্থতা’ নামে অভিহিত করা হয়।

সন্তান হওয়ার পরেও মায়ের মুক্তি নেই। সন্তান ছেলে না মেয়ে, নবজাতকের সুস্থতা,বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সমস্ত সমস্যার দায়ভার থাকে মায়ের, আর কৃতিত্বটুকু বাকিদের। তাই মা চেষ্টা করেন তার জীবনের বিনিময়ে এই অগ্নিপরীক্ষায় পাশ হতে। যার পুরোটাই উভয় পক্ষের প্রতারণা ব্যতীত কিছু অবশিষ্ট থাকে না।
এই মাহাত্ম্যের মুখোশ থেকে বেরোতে না পারলে কীভাবে সম্ভব, মুক্তি কিংবা সমতা, নর অথবা নারীর।

২. পৃথিবীতে অসংখ্য মা সন্তানকে ফেলে রেখে পালিয়েছে, স্বহস্তে হত্যা করেছে, ভ্রুণ হত্যা করেছে, নবজাতককে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে- অথচ আজ পর্যন্ত তেমন কোন ‘কুমাতার’ অভিজ্ঞতাজাত উপলব্ধির বয়ান আমরা পাইনি কেন? তাতে কি হাজার বছর ধরে গড়ে তোলা পিতৃতন্ত্রের ভিত নড়ে যাবার সম্ভাবনা ছিল?

সন্তান ধারণ এবং জন্ম পরবর্তী সময়ে একজন মা-কে অসংখ্য শারীরিক মানসিক চাপকে মোকাবেলা করতে হয়, দেখা দেয় নানা উপসর্গ আর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে প্রসূতিকালীন মানসিক অবসাদ (Postpartum blue) নামে অভিহিত করা হয়েছে যা কি-না ‘সন্তানের মুখ দেখে সব ব্যথা ভুলে যাওয়া’র তথ্যকে আংশিক মিথ্যা বলে প্রমাণ করে দেয়।

অথচ এইসব সুপ্ত যন্ত্রণার ইতিহাস কোন সুমাতা কেন, কুমাতার পক্ষেও আজ পর্যন্ত উন্মোচন করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এমনিতেই নারী সামাজিক- ধর্মীয়ভাবে নানা ধরনের চাপের সম্মুখীন। উপরন্তু সে যদি গর্ভবতী হয়, তাহলে তার সেই শারীরিক-মানসিক দুর্বলতার মুহূর্তে সে নিজেও সব ধরনের অপবিশ্বাসের অনুবর্তী হয়ে পড়ে।

মজার বিষয় হলো, পুরুষের অংশগ্রহণ ব্যতীত নারীর পক্ষে এই মহৎ কার্যক্রম সফল করা পুরোপুরি অসম্ভব, একথা আমরা সবাই ভুলে যাই অথবা ‘মাতৃত্ব’কে অন্ত:সারশূন্য মাহাত্ম্যে ঢেকে রাখতে ভুলিয়ে রাখি। না হলে যে অপ্রিয় নগ্ন সত্যসমূহ প্রকাশিত হয়ে পড়বে। যেমন মাতৃত্ব নারীর জন্য দেয় পদতলে স্বর্গলাভের আশ্বাস। কিন্তু পুরুষকে দেয় ইহকালের সবকিছু সন্তান, সম্পদ এবং বংশের উত্তরাধিকার।

৩. ‘লালসালুর’ উপন্যাসে আমেনা বিবিকে দেখা যায় সতীন তানু বিবির সাথে সন্তান জন্মদান প্রসঙ্গে অসম অদ্ভুত এক লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। দীর্ঘদিন আমেনা বিবি বন্ধ্যা জীবন কাটিয়েছে, কিন্তু সমস্যা ঘটে তখন যখন সতীন তানু বিবি ঘরে আসে আর একের পরে এক সন্তানের জন্ম দিতে থাকে। আমেনা বিবি কি সন্তানই চেয়েছিল, নাকি দাম্পত্য আর সম্পত্তির উত্তরাধিকার বিচ্যুত না হওয়ার উপায় হিসেবে সন্তানকে মাধ্যম রূপে পেতে চেয়েছিল?

যদিও নারীর মাতৃত্ব এবং যৌন চেতনাবোধ দুটোই তার একই শারীরজাত। তবু প্রথমটি ঠিক যতটা মহিমান্বিত পরেরটি ঠিক ততটাই ট্যাবুতে ঘেরা, ধর্মীয় কিংবা সামাজিকভাবে। দুটো বিষয়ের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। দুটোই নারী জীবনের আনন্দিত অভিজ্ঞতার অংশ, অথচ মাতৃত্বকে অতিরিক্ত মহিমান্বিত করা হয়েছে অপরটি থেকে নারীর নজর ফেরাতে।
তাই হুমায়ূন আজাদের উপন্যাস ‘মানুষ হিশেবে আমার অপরাধসমূহ’ তে শহরে থাকা শিক্ষিত ডলিও স্বামীর মনোযোগ আকর্ষণ করতে সমর্থ হতে না পেরে তার কাছে সন্তান কামনা করে। প্রথমত, স্বামীর মনোযোগ ফিরে পেতে, দ্বিতীয়ত রোমান্টিক কল্পনার জগৎ নেই জেনে গিয়ে জীবনচক্রে আত্মসমর্পণ করতে।

৪. এতসব আপাত নেতিবাচক ভাবনার উদ্দেশ্য কিন্তু ইতিবাচক। পুরুষ কোন অংশেই ‘পিতৃত্বে’ বা পিতার ভূমিকায় নারীর ‘মাতৃত্বে’র তুলনায় ন্যূন নয়। তাই বিশ্বজুড়ে আজ এই শ্লোগান জনপ্রিয় হচ্ছে। ‘Motherhood has no gender’ কিংবা কমলা ভাসিনের ভাষায় Men also can be a mother মায়েরাও আসলে সুপার মম হওয়ার লোভে পুরুষকে তাদের যথার্থ পিতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেন না, একথা অস্বীকারের উপায় নেই। প্রত্যেকে তার যথাযথ ভূমিকা পালন করলে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য আর নিপীড়ন বহুলাংশে কমে যেত। সরাসরি শরীর বাহিত হয়ে আসে না বলেই সন্তানের প্রতি মমত্ব আর স্নেহে কোন অংশেই পিতার তরফে ঘাটতি পড়ে, তা কিন্তু নয়।

৫. সকল প্রকার ‘মাতৃত্ব’ই কি মহৎ? তাহলে একাত্তরের যুদ্ধশিশুদের দেশে মায়ের কাছে থাকতে দেয়া হয়নি কেন? প্রেমিক কর্তৃক প্রতারিত মা-টি তার সন্তানকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেয় কেন? কন্যাসন্তান গর্ভে জেনে ফেলে ভ্রুণ হত্যা করা হয় কেন? অর্থাৎ ‘মাতৃত্ব’ মহান, কিন্তু তা হতে হবে পুরুষতান্ত্রিক পরিবার ও সমাজের শর্তমাফিক।

সবশেষে, শর্তের কণ্টকে আকীর্ণ এই ‘মাতৃত্ব’ পদবী কতটা মহৎ তা খুব সহজেই পরীক্ষা করা যেতে পারে। কোনো নারী সকল ধরনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিবাহিত হয়েও যদি মাতৃত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে তার সমাজ তাকে মেনে নেবে তো? কোন নারী, যদি বিবাহ-মাতৃত্ব-সংসার-পেশা-ব্রত-জীবিকা কোন কিছু ছাড়াই জীবন অতিবাহিত করতে চায়, তাকে ‘সুস্থ-স্বাভাবিক’ মানুষ হিসেবে মেনে নেয়া হবে তো?
‘পথের পাঁচালি’র নায়ক অপু স্ত্রী বিয়োগের বিরহে গহীন জঙ্গলে চাকুরি নেয়, শিশুপুত্রকে মামাবাড়িতে অনাদর অযত্নে ফেলে রেখে গিয়ে।

সেখানে দীর্ঘ পাঁচ বছর কাটিয়ে জীবনের বহুরকম দার্শনিক আবিষ্কার শেষে সানন্দচিত্তে বাড়ি ফেরে। একবার সেই জঙ্গলে পুরো এক সপ্তা জুড়ে সে একটি ফলকে পেকে শুকিয়ে ঝরে যেতে দেখে বৃক্ষের জীবনের সার্থকতা মাপে।
কোনো নারী যদি এভাবে ‘কিছুই-না-হতে’ চায় তাকে আপনারা বাঁচতে দেবেন তো?

শেয়ার করুন:
  • 1.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.2K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.