এই তো জীবন, পাওয়া আর হারানোর!

রিমি রুম্মান:

দেশে এখন গুমোট, বিষণ্ণ পরিবেশ। দেশের বাইরে অর্থাৎ দেশ এবং স্বজনহীন এই দূরদেশে সুদূর বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা গৃহবধূরা কেমন আছেন? কেমন আছেন স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় দু’চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে আসা সেইসব সহজ-সরল, লাজুক বধূরা?
তাদের স্বপ্নের সাথে বাস্তবের মিল কিংবা অমিলই বা কতোখানি এমনতর বিষয়গুলো উঠে এসেছে আমাদের চারপাশের বাস্তবতা থেকে।

আমার কনিষ্ঠ সন্তান যে এলিমেন্টারি স্কুলে পড়ে, বিগত চার বছরে সেখানে কোনো বাংলাদেশি দেখিনি। এবার নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুর দিকে লক্ষ্য করি, রোজ স্কুল শুরুর এবং ছুটির সময়ে একজন বাংলাদেশি নারী স্ট্রলার ঠেলে স্কুলের সামনে এসে দাঁড়ায়। স্ট্রলারে কয়েক মাসের শিশু। বিদেশ বিভূঁইয়ে যেহেতু ছোট শিশুদের দেখে রাখবার মতো বাড়িতে কেউ থাকেন না বললেই চলে, তাই ঝড়, বৃষ্টি কিংবা কনকনে শীত, অর্থাৎ আবহাওয়া যা-ই হোক না কেন ছুটির সময়ে এমন করে স্ট্রলারে শিশুকে নিয়েই অন্য সন্তানকে স্কুলে আনা-নেওয়ার কাজটি করতে হয় মায়েদের।

সালোয়ার-কামিজ পরা সেই নারী মাথায় ঘোমটা টেনে দাঁড়িয়ে থাকেন, অপেক্ষা করেন অন্য অনেকের সাথে। তাকে দেখলেই সুদূর বাংলাদেশের গাঁয়ের চিত্র ভেসে উঠে চোখের সামনে। আমাদের দু’জনের সন্তান একই ক্লাসে পড়ে। এবং তাদের রুম নাম্বারও একই। সেই সুবাদে মাঝে মাঝে টুকটাক আলাপ হয়।

কথা প্রসঙ্গে জানাই, আমার ভাইয়ের জন্যে বাসা খুঁজছি আশেপাশেই, আপনার জানা মতে কোথাও বাসা খালি আছে কি? তিনি জানান, ‘আমরাই তো চলে যাচ্ছি এ বাসা ছেড়ে, চাইলে এটি দেখতে পারেন।’ তিনি আরও জানান, ‘আপনি চাইলে আমার সাথে এখনই আসতে পারেন, আমার বাসাটি দেখে যেতে পারেন।’ আমি একটু ইতস্তত করি। স্বল্প পরিচিত কেউ একজন হওয়া সত্ত্বেও তিনি আমায় তার বাসায় নিয়ে যেতে চাইছেন!

অতঃপর কালবিলম্ব না করে ভর দুপুরের ঝলমলে রোদ গায়ে মেখে উনার সাথেই হেঁটে যেতে থাকি বাসা দেখবার উদ্দেশ্যে। ছোট্ট দুই রুমের বাসা। বড় বেশি এলোমেলো, বিপর্যস্ত সব। হয়তো সপ্তাহ তিনেক বাদে বাসা বদল করবেন বলেই গোছগাছ চলছে।

জানতে চাইলাম কোথায়, কোন এলাকায় নতুন বাসা নিয়েছেন? বললেন, ‘তাতো জানি না, আমার স্বামী জানেন’। আমি একরাশ বিস্ময় নিয়ে ঘুরে তাকাই। বাসা বদল করবেন, অথচ কোথায় যাবেন, জানেন না!
তিনি একটু থেমে আবার বলে চলছেন, ‘শুধু জানি, দূরে যাচ্ছি, এইখান থেকে দুই/তিন ঘণ্টার পথ দূরে’। আমার রাজ্যের বিস্ময় ভরা চোখের প্রশ্নবোধক চিহ্ন তার নজর এড়িয়ে যায়নি হয়তো, আর তাই এবার মেয়েকে কাছে ডাকলেন।
জানতে চাইলেন, মা, আমরা যেন কোথায় বাসা নিয়েছি?
মেয়ের ঝটপট উত্তর, ‘প্যানসিলভেনিয়া’। বুঝলাম পরিবারটি নিউইয়র্ক ছেড়ে যাচ্ছেন সহসাই।

বুকের খাঁচায় কোথায় যেন টান লাগলো। একটু বিষণ্ণও হলো মন। হোক না স্বল্প পরিচয়, তবুও। স্বপ্নের দেশে সোনার হরিণের পিছনে ছুটে ছুটে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত হাজারও প্রবাসীর ভিড়ে এই গৃহবধূ নিতান্তই সাধারণ, বড় বেশি সহজ এবং সরল। সুদূর বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা এই নারীর সাথে হয়তো আমার আর কোনদিনই দেখা হবে না। তবে তার সরলতা বড় বেশি দাগ কেটেছে বুকের গহিনে।

শরতের চমৎকার এক রৌদ্রোজ্জ্বল বিকেলে কুইন্স ব্লুবার্ডে বিশাল এক এপার্টমেন্ট বিল্ডিং এ গিয়েছিলাম একই উদ্দেশ্যে, অর্থাৎ বাসা খুঁজতে। বিল্ডিং সুপারের খোঁজে লবিতে অপেক্ষা করছিলাম। সেই সময়টুকুতে দাঁড়িয়ে ভিনদেশি নারী পুরুষের আসা-যাওয়া দেখছিলাম। সকলেই ব্যস্ত। একজন বয়সের ভারে নুইয়ে আসা শ্বেতাঙ্গ বৃদ্ধা সেজে গুজে লবিতে বসে অলস সময় কাটাচ্ছেন, ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ছোট্ট আয়না বের করে নিজেকে দেখে নিচ্ছেন। সেদিক থেকে বাঁয়ে চোখ ফেরাতেই দেখি ম্যাক্সি পরিহিতা মধ্যবয়সি এক নারী মাথায় ঘোমটা টেনে ওপথ দিয়ে যাচ্ছেন। তাড়াহুড়া নেই তার।

আমি এগিয়ে যাই। বলি, ‘আপনি বাংলাদেশি?’ পান চিবোতে চিবোতে ফিরে তাকালেন। বললেন, ‘হ্যাঁ’। আমার ভেতরে একরকম আনন্দ খেলে যায়। স্বদেশী বলেই হয়তো, কিংবা কিছুটা হলেও তথ্য পাওয়া যেতে পারে, এই ভেবে। তাকে সব খুলে বলাতে তিনি বিনা দ্বিধায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমায় নিয়ে গেলেন সুপারের অফিস রুমে। দুর্ভাগ্যবশত বিল্ডিং সুপার সেদিনের মতো অফিস তালা মেরে চলে গিয়েছিলেন। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া সেই নারীর সাথে কথা হচ্ছিল লবিতে দাঁড়িয়ে। রুমগুলো ছোট নাকি বড়, ভাড়া কেমন, ইলেকট্রিক বিল দিতে হয় কিনা … ইত্যাদি নানান বিষয়ে।
তিনি খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তার বাসাটি দেখে যেতে অনুরোধ করলেন। আমি তাকে অনুসরণ করে তিন তলায় যাই। তিনি বাসাটি ঘুরে দেখালেন। বসার ঘরে আমায় বসতে বলে রান্নাঘরে এটা সেটা খাবার তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। বাঙালির অতিথিপরায়ণতার কথা সকলেই অবগত। কিন্তু তাই বলে আমার মতোন এমন অচেনা অজানা একজনকে হুট করে বাসায় নিয়ে আসা, তাকে বসতে দিয়ে এমন হুলুস্থুল ব্যস্ত হয়ে উঠা, এসব ভাবাচ্ছিল খুব। উপরন্তু বাসায় পরিবারের অন্য সদস্যরা কেউ নেই।
বললাম, আপনার ফোন নাম্বারটা দিন, আমি না হয় ফোনে যোগাযোগ করবো এ বিষয়ে। জানালেন, তার নিজের কোনো ফোন নেই। বাসায়ও কোনো ফোন নেই। আমি যারপরনাই বিস্মিত হই। কোন জরুরি প্রয়োজন হলে কী করবেন উনি? কিংবা কোন বিপদে-আপদে? বললাম, তাহলে আপনার স্বামীর নাম্বারটি দিলেও চলবে। আমায় ততোধিক বিস্মিত করে জানালেন, স্বামীর ফোন নাম্বার উনার জানা নেই। তিনি রাতের শিফটে ট্যাক্সি চালান। ফোন করলে কাজে ব্যাঘাত ঘটবে সেই আশংকায় ফোন করার কথা ভাবেন না কখনও। কলিং বেলের শব্দে আমাদের দু’জনার কথায় ছন্দপতন হয়। দরজা খুললেন। উনার দুই পুত্র বাইরে থেকে এসেছে কেবল।
একজনের বয়স আট, অন্যজন চৌদ্দ। নিজেই বড় ছেলেকে ডেকে বললেন, ‘বাবা, তোমার আব্বুর ফোন নাম্বারটা আন্টিকে লিখে দাও তো!’ আমার ভেতরে সাত-পাঁচ ভাবনা ভর করে। মানুষগুলো এতো সহজ, সরল কেন! ফিরে আসবার সময় এলিভেটর পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসে জানালেন, এই বিল্ডিং এ কোনো বাঙালি পরিবার এলে আমারই ভালো লাগবে। একলা, নিঃসঙ্গ প্রবাস জীবন।

জানতে চাইলাম, এই জীবন ভালো লাগে? জানালেন, হাড়ভাঙা পরিশ্রম আছে, আবার সুখও আছে, আছে আর্থিক সচ্ছলতা। ছয়মাস আগে দেশ ছেড়ে পরবাসে আসেন তিনি। দেশে থাকাকালীন যাপিত জীবনে নিজ গ্রামের বাইরে কখনও অন্য কোথাও যাওয়া হয়নি। এই প্রথম গ্রামের, দেশের বাইরে আসা এই নারীর কাছে প্রবাস মানে, শত কষ্টের মাঝেও জীবনের সোনালী অধ্যায়ের এই তো শুরু।

আমার খুব কাছের এক পরিচিত গৃহবধূকে প্রায়ই তাদের এপার্টমেন্টের বাইরে ছোট্ট শিশুপুত্রকে নিয়ে সময় কাটাতে দেখা যায়। কথা প্রসঙ্গে একদিন জানিয়েছিলেন স্বামী রাতে ওষুধের কোম্পানিতে চাকরি করেন, দিনে ঘুমান। স্টুডিও বাসা, অর্থাৎ একটি মাত্র রুম, বিধায় স্বামীর ঘুমের ব্যাঘাত যেন না ঘটে, তাই ছোট্ট শিশু সন্তানকে নিয়ে ওই সময়টুকু তিনি বাইরে কাটান।

কিন্তু শীতের দিনে? জানালেন, হিমাংকের নিচে তাপমাত্রার সময়টাতে এপার্টমেন্টের লবিতে সময় কাটান। আমার মনে পড়ে যায়, প্রবাস জীবনের শুরুর দিকে আমি যে বাসায় বসবাস করতাম, সে বাসার বেইজমেন্টে স্বামী-স্ত্রী আর তাদের কয়েকমাস বয়সি একমাত্র সন্তান থাকতেন। রোজ সকালে ঘুম ভেঙেই শিশুটি শব্দ করে খেলা করতো, কখনোবা কাঙ্খিত জিনিসটি না পেলে চিৎকার করে কাঁদতো। যেহেতু রাতের শিফটে কাজ শেষে দিনে ঘুমাতো শিশুটির বাবা। আর তাই মা শিশুটিকে স্ট্রলারে নিয়ে এ পথ-ওপথ ঘুরতেন। কিংবা কাছের পার্কে সময় কাটাতেন।
দিনের পর দিন, দিনের অনেকটা সময় এমন করে সন্তানকে নিয়ে ঘরের বাইরে কাটাতে ভালো লাগে? এমনটি জিজ্ঞেস করলে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে জানাতেন, প্রবাস জীবন মানেই হলো দেয়ালবিহীন কারাগার। যে জীবন যাপন করছি, এ যে এক রকম চ্যালেঞ্জের জীবন। পরক্ষণেই ভালো আছেন বলে জানাতেন।

যাক যে গৃহবধূর কথা বলছিলাম, তিনিও স্রষ্টাকে কৃতজ্ঞতা জানান এই কারণে যে, দেশে কোনদিন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার সুযোগ হয়নি যার, সেই তিনিই সৌভাগ্যবশত স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় এসেছেন। জানান, নিজে যেমনই থাকেন না কেন, নিজদেশে পরিবারকে কিছুটা হলেও অর্থ সাহায্য করতে পারছেন। গ্রামে তার পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা ফিরে এসেছে, এ-ই বা কম কীসে?
শুধু কষ্ট এটুকুই যে, অনেকেই ভাবেন প্রবাস মানেই অঢেল অর্থ, বিত্ত, যা কিনা বাতাসে উড়ে বেড়ায়। কেউ প্রবাসে থাকেন মানেই সে অর্থ উপার্জনের কারিগর। কেউ বুঝতে চায় না, প্রবাসী মানে, হাড়ভাঙা কঠোর পরিশ্রমী একদল মানুষ। এরপরই যোগ করেন বাস্তব সত্য কথাটি।
বলেন, অবশ্য দেশের মানুষকেই বা দোষ দেই কী করে? আমরা যারা প্রবাসে থাকি, দেশে আপনজনদের সঠিক তথ্যটি জানতে দেই না। আমাদের অর্থনৈতিক সমস্যা কিংবা অর্থ সাশ্রয়ের জন্যে কষ্ট করে ছোটো বাসায় বাস করার কথা দেশে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে দেই না।
তিনি আরও বলেন, মূলত প্রবাসীরা দু’টি ভিন্ন জীবন যাপন করেন। একটি জীবন সকলে দেখে এবং জানে। অন্য জীবন প্রবাসীরা সকলের কাছ থেকে আড়ালে রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কথাগুলো সত্যই চমৎকার এবং অনেকটাই বাস্তব।

প্রবাস জীবনে আছে হাজারও না পাওয়া, হাজারও সীমাবদ্ধতা। কিন্তু তাই বলে পাওয়াটুকুকেও তো অস্বীকার করা চলে না। আর এই নিয়ে গৃহবধূদের সকলেই সৃষ্টিকর্তাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। জানিয়েছেন শুকরিয়া। এখানে স্বজনদের থেকে দূরে থাকার বেদনা আছে, আছে নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হবার অনুভূতি। আছে নিরব কান্না এবং দীর্ঘশ্বাস। তবুও এই প্রবাসকেই একদিন ভালোবেসে ফেলেন সকলেই। পাওয়া আর না পাওয়ার দোলাচলে দুলতে দুলতে সব কঠিনকে মেনে নিয়ে আনমনে প্রায় সকলেই ছোট্ট শ্বাস নিয়ে বলেন, ‘এই তো জীবন, পাওয়া আর হারানোর’।

লুইস ক্যারলের একটি উক্তি মনে পড়ছে, ‘জীবনকে সহজভাবে নিতে জানলে জীবন কখনো দুঃসহ হয়ে উঠে না’।

কুইন্স, নিউইয়র্ক

শেয়ার করুন:
  • 116
  •  
  •  
  •  
  •  
    116
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.