নারীবাদীদের মতবিরোধ মানেই অধিকার বা সাম্যের দাবি অর্থহীন হয়ে যায় না!

ইমতিয়াজ মাহমুদ:

ফেমিনিস্ট হিসেবে পরিচিতিপ্রাপ্ত একজন বা একদল নারী যদি কাকস্বরে সকলের সাথে ঝগড়া করতে থাকে- বা ধরেন অন্যান্য পরিচিত ফেমিনিস্টদেরকেই হেনস্থা করতে থাকে- তাতে নারী অধিকার না নারীর সাম্যের দাবি ভ্রান্ত হয়ে যায় না। একইভাবে দুইদল নারীবাদী যদি পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে থাকেন তাইলেই নারীবাদ ব্যাপারটা হাস্যকর হয়ে যায় না। এইটা একটা অতি সাধারণ এবং অতি মৌলিক যুক্তি- কিন্তু আফসোসের কথা হচ্ছে যে এই কথাটা ঘটা করে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দিয়ে মানুষকে বোঝাতে হচ্ছে।

শোনেন, নারীর অধিকারের দাবি অন্য যেকোনো রাজনৈতিক সামাজিক বা দার্শনিক দাবি বা কর্মসূচির চেয়ে জরুরি একটা দাবি। আপনি দেশে সমাজতন্ত্র চান বা দেশে গণতান্ত্রিক বিকাশ চান বা সুশাসন চান বা দুর্নীতি থেকে মুক্তি চান বা অন্য যে ইচ্ছা তাই চান- এইসব সবকিছুর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি হচ্ছে নারীর সম অধিকার ও সম মর্যাদার দাবিটি। না, তার মানে এই না যে আপনি এই মুহূর্তে সমাজতন্ত্রের জন্যে সংগ্রামটি বাক্সে গুছিয়ে রেখে নারীবাদী আন্দোলনে নেমে পড়বেন।
সেরকম করার দরকার নাই, কারণ নারী অধিকারের ব্যাপারটি আপনার সমাজন্ত্রের অন্য সংগ্রামের সাথে একসাথেই চলবে। একটার জন্যে আরেকটা শিকে তুলে রাখার দরকার নাই- কিন্তু একটাকে ফেলে আরে কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যাবেন সেটা হবে না।

কারণ কী? নারীর সম অধিকারের দাবি বা পূর্ণাঙ্গ মানুষের মর্যাদার দাবি ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ কেন? এটা এমন জটিল কোন ব্যাপার নয়। আপনি গোটা দুনিয়ার মোটামুটি অর্ধেক মানুষকে দাস বা গরু ছাগল বা ঐরকম ঊন মর্যাদায় রেখে কীভাবেই বা সমাজতন্ত্র করবেন আর কীভাবেই বা গণতন্ত্র বা সুশাসন বা অন্য যাই বলে সেইসব কায়েম করবেন?
একটা দেশের অর্ধেক মানুষের জন্যে গণতন্ত্র আর বাকি অর্ধেকের জন্যে ঘোড়ার ডিম সেটা কি হয় নাকি? হয় না। তাইলে কী করতে হবে? নারী ও পুরুষকে এক মর্যাদায় নিয়ে এসে গোটা জনসংখ্যাকে সমান জমিনে সমান মর্যাদায় দাঁড় করাতে হবে। এরপর আপনি গণতন্ত্র করেন বা স্বৈরাচার করেন বা সেটা ইচ্ছা সেটা করেন- সেটা সবার জন্যে হবে।

(২)
আর লড়াইটা তো চলছেই আরকি। নারীরাই লড়ছেন। পুরুষরা গিয়ে সাহায্যের হাত বাড়াবেন তার জন্যে ওরা বসে নেই। না, পুরুষদের সাহায্য দরকার এবং পুরুষদেরও দায়িত্ব হচ্ছে নারীবাদী আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু আপনার জন্যে তো আর আন্দোলন থেমে থাকবে না। নারীরা ভোটাধিকারসহ সম্পত্তির অধিকার আর কিছু কিছু আইনগত অধিকার ইতিমধ্যে আরজন করেছে। এগুলি ওরা লড়েই আদায় করেছে। এমনি এমনি আসেনি। ভাষা সংস্কৃতি ব্যবসা-বাণিজ্য রাজনীতি এইসব ক্ষেত্রেও নারীরা কিছু কিছু অধিকার আদায় করেছে, নিজেদের জন্যে জায়গা করে নিয়েছে। সেসবও তো ঠিক আছে। কিন্তু সমতার লড়াইটা জারি আছে- আর এই সমতা জিনিসটা অর্জন না হওয়া পর্যন্ত বাকি এইসব যে অর্জন রয়েছে সেগুলিও আসলে পূর্ণ অর্থপূর্ণ হয় না।

এই যে লড়াইটা চলছে সেখানে, বিশেষ করে বাংলাদেশের কন্টেক্সটে, মাঝে মাঝেই দেখবেন চেনাজানা নারীবাদীদের একজন দুইজন রাজনৈতিক বা আদর্শগত তর্কটাকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে টেনে নিয়ে যায় এবং সেটাকে মোটামুটি নোংরা ছোড়াছুঁড়ির পর্যায়ে নামিয়ে ফেলে। করুক। একটু তর্কাতর্কি তো দরকার আছে, নাইলে পথ চিনবেন কীভাবে। মূল জায়গাটায় তো কারও দ্বিমত নাই, যে এমন সমাজ চাই যেখানে নারী-পুরুষের চেয়ে কম বা ছোট বা ঊন বিবেচিত হবে না। এইটাই তো মূল কথা- এটা নিয়ে খুব একটা তর্ক হয় না। তর্ক হয় ছোটখাটো ইস্যু নিয়ে বা পথ নিয়ে বা এইরকম কিছু। এটা তো হবেই।

আর আরেকটা কথা ভুলে যাবেন না- নারীবাদীদের অবস্থা অনেকটা মুসলিম মেজরিটি সমাজে মাইনরিটি হিন্দু অধিকার নিয়ে যারা কাজ করে ওদের মতো। অন্যায়টা ঠিকই সবাই বুঝতে পারেন, কিন্তু মুখ খুলে স্পষ্ট ভাষায় বলতে পারেন না। নানারকম কায়দা করে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলতে হয়। আর একটা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলেও আগে তেত্রিশ লাইন সংখ্যাগুরুর প্রশংসা করে তারপর অন্যায়টার কথা বলতে হয়।

দেখেন নাই এবার পূজার সিজনে কী হয়েছে! ধুমধাম প্রতিমা ভাংচুর হচ্ছে সারা দেশে, কিন্তু হিন্দু নেতারা স্পষ্ট করে প্রতিবাদ করেন না। বিবৃতি একটা দিলেও আগে দুই সাড়ে তিন প্যারাগ্রাফ লিখে নিতে হয়েছে বর্তমান সরকারের আমলে হিন্দুরা কোট শান্তিতে আছে ইত্যাদি, সেইগুলি বলে তারপর প্রতিবাদ।

(৩)

নারীবাদীদের একটা বড় অংশেরও তো এই হাল। পলিটিক্যালি কারেক্ট বক্তব্য দিতে হয়, কথার মাঝখানে মাঝখানে ঢুকিয়ে দিতে হয় নারীবাদ মানে পুরুষ বিদ্বেষ নয় বা নারীবাদ মানে এটা নয় সেটা নয় ইত্যাদি।

আবার লক্ষ্য রাখতে হয় ধর্ম-টর্ম এগুলি নিয়ে যেন বেশি কথা না হয়, ঈশ্বর প্রফেট এইসব নিয়ে যেন কোনো কথাই না হয় এইরকম কতো কী! আর ঈশ্বর প্রফেট বা ধর্ম ইত্যাদির চেয়েও সেনসিটিভ কিছু বিষয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলি নিয়ে আবার এই পোড়ার দেশে কথা বলতে হয় খুব খুব সাবধানে।

এইসবের মধ্য দিয়েও আমাদের সমাজে যারা লড়াইটা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ওদেরকে কীসের মধ্য দিয়ে চলতে হয় সে কি বুঝতে পারছেন? একটা কথা বলার আগে সাড়ে তেরোটা সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবে বলতে হয়। আর আপনারা তো আছেন, একটা বেমক্কা শব্দ কেউ বলে ফেললে পারলে তাকে টেনে ছিঁড়ে ফেলবেন। কোথায় বলবেন যে, না, বড় ঐক্যটা বজায় থাক, ছোটো খাটো মতপার্থক্য নিয়ে একদম কেটে ছিলে লবণ লাগানোর দরকার নাই, না। আপনারা সুযোগ পেলেই নারীবাদীদেরকে মুখের কথায় আঘাত করতে করতে পারলে একদম ধুলোয় মিশিয়ে দিতে চান।

অনেক উদাহরণ দিতে পারি।

এইসবের পরেও আছে অনুপ্রবেশকারীরা। অনুপ্রবেশকারী কারা? পুরুষবাদী নারী, ভোগের প্রবণতা ও সাংস্কৃতিক মানের কারণে নির্লজ্জ হয় আর সেই নির্লজ্জতাকে রেবেলিয়াস অ্যাক্ট বলে চালিয়ে দেওয়া ছাড়া নারীর অধিকার নিয়ে এদের আর কোন আগ্রহ নেই। এরা সাধারণত পুরুষপ্রিয় হয়। এরা তো সবসময়ই মুখিয়ে থাকে নারী আন্দোলনের এক্টিভিস্টদের সাথে ঝগড়াঝাঁটি করতে। এইরকম ঝগড়া ওদের ধার্মিক পুরুষ ফলোয়ারদের মধ্যে ওদের জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়। এরা হচ্ছে চূড়ান্ত বিরক্তিকর উপাদান- মুখে নারী অধিকারের কথা আর অন্তরের খায়েস হচ্ছে লাস্য।

(৪)
এই সবকিছুর মধ্যে এই সবকিছুর সাথে লড়ে, কখনও এড়িয়ে, কখনও ভারসাম্য করেই তো আমাদের নারীবাদীরা লড়াইটা চালু রেখেছেন। এর মধ্যে আবার জেনুইন ভিন্নমতও থাকে। কখনও কখনও কারও ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা ইত্যাদিও এসে মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই অবস্থার মধ্যে নারীবাদের কর্মীদের মধ্যে মাঝে মাঝে বাকবিতণ্ডা তো হবেই। হয়ও। মাঝে মাঝেই ‘তুই সহি না আমি সহি’ এইরকম কথা শুনতে পাবেন। ‘তুই সহি না’ কথাটাও সবসময় এইটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, ব্যক্তিগত আক্রমণও চলে আসে কখনও কখনও। এইগুলি না হলেই ভালো হতো।

এখন তো সকলেই লিখছেন, লিখতে পারেন। প্রকাশ ও সংযোগও সহজ হয়ে গেছে- ফেসবুকে পোস্ট করে দিলেই হয়। আগে ওদের যে কী অবস্থা ছিল, আন্দ্রিয়া ডরকিন (Andrea Rita Dworkin) তাঁর লেখা ছাপানোর জন্যে ঠিকঠাক মতো কাগজ পেতেন না। যেগুলি ছাপা-টাপা হতো, সেগুলিও খুব বেশি মানুষের মধ্যে পৌঁছাতো না। এইরকম কতো সমস্যা।
আপনাদের তো সেই সমস্যা নাই। ফেসবুকে পোস্ট করে দিলেই সকলের কাছে পৌঁছে যায়। অনলাইন পোর্টালগুলিও রয়েছে- উইমেন চ্যাপ্টার আছে, নারী আছে। তর্কগুলি লিখে করলেই ভালো হতো। আর লেখাগুলিও আরেকটু সিরিয়াস হলে যুতসই হতো। মতপার্থক্যগুলি এইভাবে চালানো যায়।

তারপরও ঐসব ঝগড়াঝাঁটি হোক বা কান্নাকাটি, মারামারি হোক- নারীর অধিকারের দাবি ও সাম্যের দাবি তো আর সেই কারণে অর্থহীন হয়ে যায় না।

শেয়ার করুন:
  • 212
  •  
  •  
  •  
  •  
    212
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.