আপোস

ফাহমিদা খানম:

“তুমি নাকি বলে বেড়াচ্ছো এটা হত্যাকাণ্ড?”
“অবশ্যই এটা হত্যাকাণ্ড! বউটাকে প্রায়ই মাতাল হয়ে ছেলেটা মারতো এটা তুইও জানিস,পাড়ার সকলেই জানে”।
“নাহ আমি জানি না, কার ঘরে কী হয় সেটা আমার দেখার বিষয় না, তুমি কেনো এসব ঝামেলায় নিজেকে জড়াচ্ছো?”
“এতো চিৎকার করে কথা বলছিস কেনো? চোখের সামনে অন্যায় দেখেও আমি চুপ করে থাকবো?”
“হ্যাঁ থাকবে – তোমার আবেগ সামলাও, উনি বেরিয়ে এলে আমাদের টেকাই মুশকিল হয়ে যাবে”
“জ্বলজ্যান্ত বউটাকে মেরে ফেললো এটা কি আবেগ?”
“পাড়ার সকলেই চুপ করে আছে, উনি সব ম্যানেজ করে ঠিকই বেরিয়ে আসবেন আর তখন আমি কোনো সমস্যায় পড়লে উনি আমার ফেভারে থাকবেন না, পাশাপাশি বাসায় বড় হইছি বলে আজও স্নেহ করেন — তোমার জন্যে সব যাবে আমার!”
“অন্যায়ের কাছে মাথা পাততে বলছিস আমাকে তুই?”
“সবাই যা জানে তুমিও তাই ভাবতে শেখো, উনার বউয়ের মানসিক সমস্যা ছিলো তাই আত্মহত্যা করেছে”।

স্তব্ধ হয়ে গেলাম ছেলের কথায়। সবাই সত্যিটা জেনেও চুপ হয়ে আছে কেনো? কীসের ভয়ে?”
“মা শোনো, কার বাড়িতে কী হইছে সেসব দেখার দরকার কী তোমার? বয়স হইছে এসব বস্তাপচা আবেগের দাম না দিয়ে একটু প্র্যাক্টিক্যাল হবার চেষ্টা করো। আর এই বাড়িতে থাকতে হলে দেখবে, শুনবে, কিন্তু তোমার প্রতিবাদী হওয়া চলবে না”।

ছেলে কি থ্রেট দিলো নাকি আমাকে আমার অবস্থান বুঝিয়ে দিলো? পায়ের নিচের ভিত আমি সজ্ঞানেই ছেলেদেরকে লিখে দেবার প্রাপ্যতা বুঝিয়ে দিলো কি? ছেলের সাথে আমার বনিবনা হয় না – ওর প্রথম বিয়ে ভাঙ্গার জন্যে আমি ওকেই দায়ী করি – বউটা ভালোই ছিলো, কিন্তু ছেলের নাকি অন্য মেয়ের সাথে রিলেশন আছে, ডিভোর্স হয়েছে সেই মেয়েকে বিয়ে করবে বলে আর নেশা যে করে আমি তো মা আমি বুঝি। আরেক ছেলে বিদেশে পড়তে গিয়ে সেখানেই থিতু হইছে —কালেভদ্রে ফোন দেয়!

এই এলাকায় বিয়ের পর যখন আসি সবই টিনশেডের বাড়ি ছিলো। পাড়া –প্রতিবেশিরাই ছিল আপনজন। পাশের বাড়ির আপা বয়সে বড়ো হলেও খুব আপন করে নিয়েছিলেন – উনার স্বামী বামপন্থী দল করতেন – বাসায় খুবই কম থাকতেন, আপা কী কষ্ট করেই না চার সন্তানকে নিয়ে চলতেন! সামনের জায়গাটুকুতে সবজি করতেন, কখনও কারও কাছে হাত পাততে দেখিনি। এখন সব সুউচ্চ বিল্ডিংয়ের সারি … আগের সেই মানুষেরা আর নেই – সেই সাথে আন্তরিকতাও!

বিয়ের পরে পাড়ায় কোনো অঘটন হলেই শ্বশুরবাবা আমাদের শাশুড়ি-বউকে যেতেই দিতেন না, বলতেন, “যার ঘরে যা ইচ্ছা হউক, তোমাদের যাইতে হবে না”।
তিন বাসা পরে এক বাসায় একবার এক মেয়ে মরলো, সত্যিটা জানতাম বলে পুলিশের কাছে যেতে চাইতেই বাচ্চার বাবা সেদিন বলেছিল,
“মেয়েমানুষ মেয়েমানুষের মতো থাকবা, কোথায় কী হইলো মুখ খুলনের দরকার নাই”।
ভেবেছিলাম দুই প্রজন্ম হয়তো ভিতু ছিলো বলেই এমনটা করেছে, চুপ করিয়ে দিয়েছে, কিন্তু এই প্রজন্ম সাহসী হবে।
প্রতিবেশি বামপন্থী করলেও ছেলে অন্য ঘরানার, ভিন্ন দলে বিশ্বাসী তাই অর্থবিত্ত হয়েছে অঢেল, কিন্তু বাবার সেই নৈতিকতা আর মূল্যবোধের ছিটেফোঁটাও নিজের মাঝে রাখেনি –হয়তো দিনের পর দিন কষ্ট করেছে বলেই সেই পথে হাঁটেনি! যে বাবা কখনও মাথা নুইয়ে চলেনি তার সন্তান মদ্যপ, জুয়াড়ি আর চরিত্রহীন হইছে, কতদিন মারের শব্দ শুনে আমি নিজেই গেছি থামাতে! আমি গেলে অবশ্য রুম থেকে মাথা নিচু করে বেরিয়ে যেতো – এটুকু শ্রদ্ধা করতো।

বউটাকে কতদিন বলেছি সংসার ছাড়তে – সন্তানদের মায়ায় পারেনি।
“মা আমি পুলিশকে জানিয়েছি তোমার বয়স হয়েছে, তুমি টিভির বস্তাপচা নাটকের সাথে সব গুলিয়ে ফেলেছো, পাশের বাসায় কী হয়েছে তুমি আসলে জানো না”
“হ্যাঁ বয়স হলে মানুষের স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যায়”
“এখানে কান্না করার কী আছে মা? যা করেছি ভালোর জন্যেই করেছি আমি”
“আজ থেকে আমিও ভুলে যেতে চাই আমি তোমার মা ছিলাম!”
“কীসব উলটাপালটা বকছো মা? তোমার মাথা ঠিক আছে তো?
“তুমিই পুলিশকে জানিয়েছো তোমার মায়ের বয়স হইছে, সে নাটকের সাথে সবকিছুকে গুলিয়ে ফেলে, অথচ তুমি কি জানো আমি কখনও বস্তাপচা সিরিয়াল দেখিই নাহ”!

পরদিন ভোরে বেরিয়ে পড়লাম – প্রথমে পুলিশের কাছে যাবো – তারপর কোথায় নিজেও জানি না, মা হিসাবে দুই সন্তানকে মানুষ করেছি, কিন্তু সত্যিই কি মানুষ হয়েছে? বেঁচে থাকার জন্যে আর কতো নিজেকে ভোঁতা করে চলতে হবে? অনেক হলো এবার অন্তত একটা অন্যায়ের প্রতিবাদ করি। পায়ের নিচের খুঁটি মজবুত ছিলো না বলেই সবাই কেবল চুপই করিয়ে রেখেছে, তাই সেটা খুলেই বেরিয়ে এলাম, এই প্রথম পাশের বাসার আপাকে খুব হিংসা হলো, কতো ভাগ্যবতী! এসব দেখার আগে, শোনার আগেই চলে গেলেন ওপারে। জন্মেছি যখন মৃত্যু সাথেই নিয়ে এসেছি তাই বলে সত্যি বলতে কীসের ভয়?

# যখন কোনো ভরসার হাত থাকে না তখন ভয়টাও আর থাকে না – দুর্বল মানুষও দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে বাঁচার চেষ্টা করে, মন প্রয়োজনে সব পারে কিন্তু নীতির সাথে আপোষ করে বাঁচাটা বড়ো লজ্জার।

শেয়ার করুন:
  • 155
  •  
  •  
  •  
  •  
    155
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.