আমাদের সন্তানরা কি ধর্মীয় পরিচয় লুকিয়ে রাখবে?

সালমা লুনা:

প্রতিদিন কোন না কোন পত্রিকায় বা পোর্টালে বুয়েটের নিহত ছাত্র আবরার ফাহাদের খবর দেখতে হয়। আবরারকে মারার বর্ণনাগুলো কখনও শেষ পর্যন্ত পড়তে পারি না। নিজের সন্তানের চেহারা মনে পড়ে যায়। ওর কষ্টটা যেন নিজের শরীরে অনুভব করি। যেসব আওয়ামীপন্থি নারী-পুরুষ আবরারকে ইশারা ইঙ্গিতে দায়ী করেন তাদের জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, আপনার সন্তানের সাথেও যদি এমনটা হতো, তখনও কি আপনি এমন ইনিয়ে-বিনিয়ে কাশতেন?

তাদেরকে আমার অভিশাপ দিতে ইচ্ছা করে। কিন্তু মা হয়ে তাই বা কী করে দেই! সন্তান হারানোর ব্যথা কেমন হতে পারে না জানলেও সন্তানের গায়ে ব্যথা লাগলে কেমন লাগে সেটুকু তো খুব বুঝি।

এখন সবাই জানে, আবরারকে মারার একমাত্র কারণ তাকে ‘শিবির’ সন্দেহ করা। আর সেই ‘শিবির’ যেহেতু ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে সরকারের একটা সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে, তাই তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা।

আবরারকে কেন শিবির সন্দেহ করলো? কারণ সে পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়তো। এবং কাউকে কাউকে নামাজ পড়তে যেতে সাধাসাধি করতো। তাতেই সন্দেহ দৃঢ় হলো। কাজেই ছাত্রলীগের পবিত্র দায়িত্ব হলো নামাজ পড়ে যে তাকে শিবির সন্দেহে ধরে আনা এবং মারপিট করে স্বীকারোক্তি নেয়া। এসময় কারও কপাল খারাপ হলে সে মারা গেলে, যাবে।

আমরা দেশের সিংহভাগ মানুষ যারা ধর্মে বিশ্বাসী, ধর্ম পালন করি তারা বাচ্চাদের ছোটবেলা থেকেই কিছু ধর্মীয় আচার শিখাই। আমাদের কোরআন পড়াও বাধ্যতামূলক, তাই সেটিও পড়াই ছোটবেলা থেকেই। নামাজ না পড়লে বাচ্চাদের বলি নামাজ পড়তে, ওরা কখনও পড়ে, কখনও পড়েও না। রোজা রাখে নিজ ইচ্ছায়, অনেক সময় পরীক্ষা পড়াশোনার কারণে নিষেধ করলেও রাখে। রাখতে দেই।
তাই তারা বড় হয়েও তার চর্চা করে। আবরারের মাও তাই শিখিয়েছিলেন। ছেলে লক্ষ্মী বলে তার চর্চাও করতো। সেই ধর্ম পালনই কাল হলো সন্তানের?

আমরাও আমাদের ধর্ম পালন করি সারা পৃথিবীর একজন ধার্মিক হিন্দুর মতো, বৌদ্ধ, শিখ, ইহুদি বা খৃস্টানের মতোই। একজন হিন্দু যে মন নিয়ে মা জ্ঞানে দুর্গার মুখে খাবার তুলে দেন, মাটির মূর্তি খেতে পারবে না জেনেও, একজন মুসলমানও সেই বিশ্বাস ও ভক্তি নিয়ে আমাদের আল্লাহকে এক ও অদ্বিতীয় জেনে পাঁচবার স্মরণ করে।
খৃষ্টান একজন মা যেমন সন্তানের পরীক্ষার দিন চার্চে বসে প্রার্থনা করেন,
আমরাও বিপদে পড়লে আল্লাহকে ডাকি, সুখী হলে আল্লাহকে স্মরণ করি। কিছু চাইতে হলে নিঃসংকোচে আল্লাহর কাছেই চাই।

আমরা সন্ত্রাসী আচরণ ঘৃণা করি। মানুষ খুনের কথা শুনলেও আঁতকে উঠি। দলকে টিকিয়ে রাখা বা ধর্মের সমালোচনার জন্য কারণে কাউকে পেটানো, রগ কাটা, মেরে ফেলাকে আমরা এই সিংহভাগ মানুষ সমর্থন করি না।

আমরা জামাত শিবিরের রাজনীতিকে ঘৃণা করি। একাত্তরের সকল রাজাকারকে ঘৃণা করি, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী যেকোনো দল বা মতের মানুষকে ঘৃণা করি। এমনকি সে ছেলেমেয়ের শ্বশুর, বেয়াইবাড়ির আত্মীয় হলেও তাকে ঘৃণা করি। রাজাকার হলে তাদের সাথে চলাফেরা, উঠাবসা, আত্মীয়তা ব্যবসা করতে উৎসাহী হই না। পৃষ্ঠপোষকতা করতে রাজি হই না।
পাকিস্তানের সাথে ভারতের খেলা হলেও কখনোই পাকিস্তানকে সাপোর্ট করার কথা স্বপ্নেও ভাবি না।

আমরা নামাজ পড়ি রোজা রাখি, আবার পূজামণ্ডপে দশভূজাকেও দেখতে যাই। দুর্গাপূজাকে বাংলার একটি উৎসব ভাবি।
হিন্দু দেবদেবীর মুর্তি ভাঙা হলে প্রতিবাদ করি। আমাদেরই কেউ কেউ হয়তো এই মন্দিরে যাওয়া পছন্দ করেন না, আমাদের যেতে মানাও করেন। আমরা তাদের কথা এককান দিয়ে শুনে আরেককান দিয়ে বের করে দেই।
ভাবি, এটি তার ইচ্ছার স্বাধীনতা। তাই ইনবক্সে কেউ এইসব পাঠালে এই নিয়ে আর পাঁচকান করি না। ঝিম মেরে নিজের যা ভালো লাগে তাই করি।
ভাবি, যতক্ষণ না তিনি হিন্দু ধর্মের কাউকে আঘাত করেন, কোনো মূর্তি ভাঙেন, কাউকে কটুবাক্য বলেন, এবং কাউকে এইগুলো করার জন্য স্পষ্টতই উস্কানি দেন, ততক্ষণ এই মত দেবার, এবং আমাদের সমালোচনা করবার স্বাধীনতা তার আছে। এবং আমার এই নিয়ে উচ্চবাচ্য না করলেও চলে।

কতজনাই তো আমাদের আল্লাহ, রসুলকে নিয়ে কত সমালোচনা করেন। আমরা যেহেতু ধার্মিক তাই কষ্ট পাই। কিন্তু চুপ করেই থাকি। কেউ যদি এজন্য তাদেরকে গালি দেন বা শারীরিক আঘাত করেন, সেটার সাফাই দিতে ওই গালিগুলিকে সামনে এনে মিনমিন করি না।

আমাদের সরকার ভারতের সাথে দেশের স্বার্থবিরোধী কোন নদীর পানি, বিদ্যুৎ গ্যাস বিক্রয় বা স্থল ও সমুদ্র বন্দর ব্যবহারের চুক্তি করলে আমরা তার বিরোধিতা করি পৃথিবীর আর সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিকদের মতোই।
এতে করে শুধু সরকারের সেই দল এবং দলের চাটুকারেরা, পা চাটারা ক্ষেপে উঠতেই পারেন।
আপনিও কেন ক্ষেপে উঠেন এটাই বোধগম্য হয় না। না হলে আপনিও কেন আবরারের হত্যার খবরটিকে হালকা করে দেখতে চান ছাত্রলীগের হত্যার খবর দিয়ে! তুহিনের হত্যার খবর দিয়ে!
ময়মনসিংহের ব্যক্তিকোন্দলে নিহত নামের শেষে ভট্টাচার্য থাকা তরুণকে নিয়ে শ্লেষমাখা কটাক্ষ করে! তাহলে আপনার কেন স্মরণে আসে না সেইসব ছাত্রলীগের কথা যারা নিজেরা নিজেরা খুনোখুনি করে চলেছে অবিরাম। তাদের খুনও তো খুন। বলবেন না কারণ আপনি বুদ্ধিমান। আপনি মনে করেন সব খুন এক না।

পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেছেন, আবরারের মতো খুন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায়ই হয়। হ্যাঁ ব্যক্তি কোন্দলে খুন হয়, লুকিয়ে ছুরি মেরে চলে যাওয়া আর বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে টর্চার সেল তৈরি করে ছয়ঘন্টা ধরে অমানুষিক যন্ত্রণা দিয়ে পিটিয়ে মারা এককথা নয়।

নামাজ পড়লে জঙ্গি। নামাজের জন্য মুসলমান সহপাঠীকে ডাকলে জঙ্গি।
তাহলে কি এদেশে নামাজ নিষিদ্ধ?
ইসলাম ধর্মের আচার পালন নিষিদ্ধ?
নবীর কুৎসিত সমালোচনা জায়েজ, কিন্তু মন্দিরে যেতে নিষেধ করা এতোটাই অন্যায় যে তার প্রাণ হরণ করাও চলে?

নামাজ পড়ার জন্য আমাদের কেন শিবির বলা হবে?
কেন জঙ্গি বলা হবে?
কেন আমাদের সন্তানরা প্রকাশ্যে পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়লে, বা সহপাঠীদের নামাজের জন্য ডাকলে তাদের শিবির সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলা হবে? আমাদের সন্তানদের কি তবে লুকিয়ে ধর্ম পালন করতে হবে?

ধর্ম পালন করলেই আমরা বিজ্ঞানমনষ্ক নই, ধর্ম পালন করলেই আমরা পিছিয়ে পড়া মানুষ!
আমরা পূজামণ্ডপে গেলে যেমন আমাদের আপনার সেক্যুলার লাগে, তেমনি আমাদের নামাজ পড়া বা নামাজের জন্য আহবান করাকে মানতে পারলে আপনিও সেক্যুলার। আবরার তো অন্য ধর্মের কাউকে ধর্মান্তরিত হয়ে নামাজ পড়তে ডাকেনি। সে তার মুসলিম ভাইদের ডেকেছে। আপনার এতে কোথায় ব্যথা লাগে?

আপনি মুসলিম পরিবারে বা হিন্দু পরিবারে জন্মে ইসলামকে ঘৃণা করেন ভালো কথা, প্রকৃত মুসলিমের এতে কিচ্ছু যায় আসে না। কিন্তু নামাজ পড়তো বলেই ছেলেটা জঙ্গি। তরুণ বয়সের ছেলেরা নামাজ কেন পড়বে। অথবা ইসলামের আচার পালন করলেই সে জঙ্গি হয় – এইসব বললে আপনার মুখোশটাও যে খুলে খুলে যায় এবং সেখানে একজন সাম্প্রদায়িক বিভৎস খুনির চেহারা বেরিয়ে পড়ে সেই খেয়ালও করতে হয় যে এবার!

মাঝে মাঝে অভিশাপ দিতে ইচ্ছে করে, আবরারের মায়ের মতো আপনার বুকেও আগুন জ্বলুক। কিন্তু ওই যে, মা তো! তাই সেটাও পারি না।

শেয়ার করুন:
  • 721
  •  
  •  
  •  
  •  
    721
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.