বাবা-মায়ের সতর্কতাই আরেকজনের সন্তানকে বাঁচিয়ে দিতে পারে!

সালমা লুনা:

আমি কিছুই লিখবো না ভেবেছিলাম। কারণ নিকট অতীত এবং দূর অতীতের অভিজ্ঞতা বলে লিখে আসল কাজ কিছুই হয় না, হবেও না। শুধু কিছুদিন সরগরম থাকে ফেসবুক।
কত ভালো লেখাটি লেখা হলো তার পুরষ্কারস্বরূপ কিছু লাইক শেয়ার। তারপর এভাবেই আরো কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আবির্ভাব ঘটে।

তাছাড়া লিখলে চিন্তা করলে খুব পাগল পাগল লাগে। মনের শান্তি নিয়ে তেমন ভাবি না, কারণ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলির মনের অশান্তির চেয়ে আমার মনের শান্তি কোনভাবেই জরুরি না। আমি যেহেতু মা, তাই পুত্রহারা শোকাতুরা মায়ের শোক আমি বুঝতে পারি, তার সাথে আমার বেদনা মিলেমিশে এক হয়ে গেছে বলে স্তব্ধ হয়ে আছি, লিখতে চাই না কিছু।

যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদটুকু করে যাই তাদের কারও কারও ঘরের শান্তি নষ্ট হয়। ঘরের লোক, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এমনকি ঘরের লোকের বন্ধুবান্ধবরাও বিনা খরচে উপদেশ দিয়ে যায় যেন কিছু না লিখি। যেন আমরা কোনো কেউকেটা, লিখলেই আমাদেরকে ধরে নিয়ে যাবে আইনের লোক। কোনো কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পে্র অন্ধকার ঘুপচিতে নিয়ে আমাদের টর্চার করবে। অথবা শিবির জামাত জঙ্গি ট্যাগ লাগিয়ে দেবে। সে কারণেও লিখতে ইচ্ছা করে না আজকাল।

কেন এই ভয়?
আছে, ভয় তো আছেই। বাতাসের কাছে কান পাততে তো আজকাল আর লাগে না। যা হবার প্রকাশ্যেই হচ্ছে। বুক ফুলিয়ে হচ্ছে।
নইলে কী করে গণতান্ত্রিক একটা দেশে সরকারের কোন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা যায় না? করলে আইন নয়ত কোন প্যারালাল বাহিনী হেনস্থা করে। রাস্তায় প্রতিবাদ করলেই পুলিশ বাঁধা দেয়। বাক-স্বাধীনতা আছে অথচ কেন এতো দমচাপা ভয়? কেন এতো নজরদারির আতংক! কেন কিছু লিখতে চাইলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তটস্থ থাকতে হয়?

ভাবতে অবাক লাগে, একটা ইউনিভার্সিটির তিনটি হলে সাতটা টর্চার সেল কী করে হতে পারে!
রাতভর সেখানে র‍্যাগিং এর নামে কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পের বন্দীর মতো নির্যাতন চলে। বছরের পর বছর, প্রতিবছর চলছে!
এসব পেরিয়ে যার প্রাণ শক্ত সে বেঁচে থাকে। যার আয়ু নেই সে মরে যায়। বেঁচে থাকা ছেলেগুলি কোনমতে পড়ালেখা শেষ করে বেরিয়ে এসেই পড়িমরি করে বিদেশে ছুট লাগায়। সেখানে গিয়ে নানান ধান্ধা করে যেন এই দেশে আর ফিরতে না হয়।
আর যারা টর্চার করে তারা বেরিয়ে সরকারি চাকরি করে। নানান সুযোগ সুবিধা পায়। বড় বড় পদে থাকে। কিছু গ্রুপে তাদের সচিত্র তথ্য দেখলাম।

কেউ কেউ আগে থেকেই বুঝে যায় এই দেশে পড়ালেখা করাটাই অনুচিত কাজ। তাই হায়ার সেকেন্ডারি লেভেল শেষ হতে না হতেই তারা পালায় উন্নত দেশে। আর ফেরে না।
তারা এবং তাদের বাবা-মায়েরা নাহয় বুদ্ধিমান। কিন্তু এই নির্বোধ বাবা মায়েদের কী হয়? যারা দেশেই সন্তানকে পড়ান, ইচ্ছে করে কিংবা পড়াতে বাধ্য হোন! বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা সন্তান পড়ানোর স্বপ্ন দেখেন।

সেইসব বাবা-মায়ের সন্তান বাস চাপায়, অসুখে ভুগে, নানা কারণ অকারণে তো মরেই। সেসব তারা ভবিতব্য বলে মেনেই নেন। কিন্তু যাদের সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়েই সহপাঠীদের হাতে নির্মমভাবে স্রেফ মার খেতে খেতে মরে যায়, সেই মা-বাবার কেমন লাগে কেউ কি বোঝে?
তাদের তো জীবন্মৃত দশা। বেঁচে থাকা অবধি নরক যন্ত্রণা ভোগ।

থানা-পুলিশ, আইন-আদালত, বেঁচে থাকা অন্যান্য সন্তানের নিরাপত্তার চিন্তায় সবকিছু থেকে হাত ধুয়ে ফেলা ছাড়া উপায় থাকে না। নয়তো আট দশ চৌদ্দ বছর ধরে বিচারহীন অথবা বিচারের পর শাস্তি হতে না দেখার যন্ত্রণা নিয়ে অবশেষে ধুঁকে ধুঁকে তাদের এই ধরাধাম ত্যাগ করতে হয়।

মার খেয়ে যে মরে গেল আবরার, সে আমাদেরই সন্তান। আর যে ছেলেরা ওকে মারতে মারতে মেরেই ফেললো, তারা কি এই সমাজের কেউ না? তারাও কি আমাদেরই সন্তান না? তাদের মায়েরাও কি তাদের জন্য কষ্ট করেননি? বাবার হাত ধরে তারাও কি গুটিগুটি পায়ে হাঁটতে শেখেনি? মায়ের কাছে কি আবদার করেনি পছন্দের খাবার খাওয়ার?

নিহত ছেলেটা ভালো রেজাল্ট করেছে, ভালো ব্যবহার, পাড়া প্রতিবেশীদের কাছে ভালো ছেলে। পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়তো। কেউ কি খোঁজ নিয়েছে খুনে ছেলেটিও তার বাবার সাথে টুপি মাথায় জুম্মা পড়তে যেত কী না? আমি নিশ্চিত খুনে ছেলেটিরও এমনই রিপোর্ট পাওয়া যাবে পাড়ায়, স্বজনের কাছে।

তাহলে সমস্যাটা ঠিক কোথায় হলো?
কেন তারা এমন নিষ্ঠুর আচরণ করলো? কীভাবে কোন কারণে তারা ঘন্টার পর ঘন্টা তাদের মতোই দেখতে তাদেরই সহপাঠীকে পিটিয়ে মেরে আবার ফেলে রেখে দেয়? কেউ কেউ তাকে কাঁতরাতে দেখে ভাত খেতে চলে যায় নির্বিকারভাবে।

এমন অমানবিক কি তারা তবে বুয়েটে গিয়ে হয়েছে? নাকি এমনটা রাজনীতি করতে গিয়ে হলো? দেশ আর সময় কি তাদের এমন নির্দয় করে তুলেছে? তারা যে এমন পাষাণ হৃদয় এটা কি বাবা মা জানতো? তাদের বাবা-মায়ের চোখে ছেলের এই পরিবর্তন কি কখনো কোনদিন এতোটুকুও ধরা পড়েনি? ধরা পড়েনি তাদের ছেলেটা হিংস্র, মারমুখী নিষ্ঠুর আচরণ করতে শুরু করেছে?

এতোটা তো হবার কথা নয়।

এতোটা নিষ্ঠুরতা যারা করতে পারে তাদের ব্যবহারে, চলাফেরায় আচরণে পরিবর্তন আসতে বাধ্য।
সন্তানের যেকোনো পরিবর্তন আগে মা এবং বাবার চোখে ধরা পড়বেই। জেনে কি তারা কোন ব্যবস্থা নিয়েছে কখনও? তারা কিছু করতে না পারলে অন্যকেউ কী করে পারবে!

যতক্ষণ না বাবা-মা সন্তানের শিক্ষক হতে পারেন ততক্ষণ আসলে আর কারোরই কিছু করার থাকে না। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হাজার ছাত্রছাত্রী আর সন্তান আঙ্গুলের কড়ে গোনা যায়। নিজে সন্তানের আচরণ ব্যবহার মানবিক গুণাবলীর বিচার করুন, সতর্ক দৃষ্টি রাখুন। অন্য কেউ তার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুললে, সন্দেহ করলে, যাচাই বাছাই করুন, তাকে একেবারে উড়িয়ে দেবেন না। মনে রাখবেন, স্রেফ সন্দেহ করলেও, সমালোচনা করলেও আপনার চোখ কিন্তু সেই সমালোচকই খুলে দিচ্ছে।

সন্তান অবশ্যই আমাদের গর্বের জায়গা, তবু এই সন্তানরাও কিন্তু ভুল করে, ভুলপথে পা বাড়ায়, সমাজবিরোধী কাজ করে। চোর ধর্ষক খুনী জুয়ারি হয়। এক বাবা-মায়ের সতর্কতাই আরেকজনের সন্তানকে বাঁচিয়ে দিতে পারে মার খেয়ে মরে যাওয়া থেকে, খুনি হওয়া থেকেও।

চোখ বন্ধ করে সন্তানকে বিশ্বাস নয়, নিজের চোখ খুলে দেখুন। নিজের বিবেক বোধ থেকে দেখুন। সন্তানকে ভালো খাবার, ভালো কাপড়, ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানোই শুধু নয় তার মানসিক খুঁটিনাটি বিষয়গুলোও লক্ষ্য রাখুন, তাহলে হয়তো শুধু অনেক আবরার নয়, বেঁচে যাবে অনেক ফুয়াদ, অমিতরাও।
সেই সাথে বেঁচে যাবে কিছু পরিবার।

আর দেশ!
সে বাঁচবে কীনা কে জানে!
যে রাজনীতি ভিসিকে অভিভাবক হতে শেখায় নাই, প্রভোস্টকে শিরদাঁড়া খাড়া রাখতে দেয় নাই, ছাত্রদের শুধু ব্যবহার করে গেছে, সেই রাজনীতি দেশকে যে কতটা ছাড় দেবে সেটা বোঝা তো আমার কর্ম না।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.