কন্যাশিশুর জন্য চাই বৈষম্যহীন পৃথিবী

ইলা ফাহমি:

১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। কেমন আছে বিশ্বের সকল কন্যাশিশু?

জন্মের পর প্রতিটি শিশুর যেখানে একজন মানুষ হিসেবে সকল অধিকার নিয়ে বেড়ে ওঠবার কথা, সেখানে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের শিকার হয়ে কন্যা সন্তানেরা বঞ্চিত হচ্ছে অধিকার থেকে, শিকার হচ্ছে বৈষম্য এবং নির্যাতনের। অথচ এ পৃথিবী সকল শিশুর যোগ্য বাসস্থান হবার কথা ছিলো, যেখানে সকল শিশু আগামী বিশ্বের যোগ্য মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠবে।

ইউএন উইম্যানের তথ্যমতে, প্রতিবছর সারাবিশ্বে ১২ মিলিয়ন কন্যাশিশু বাল্যবিয়ের শিকার হয়, ১৩০ মিলিয়ন কন্যাশিশু এখনো স্কুলে যেতে পারে না এবং আনুমানিক ১৫ মিলিয়ন কন্যাশিশু ১৫ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে জোরপূর্বক যৌনসম্পর্কের শিকার হয়।

সারাবিশ্বে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য নিয়মিত ঘটনা যেখানে নারী এবং শিশু প্রতিনিয়ত একটি বৈষম্যমূলক সমাজের মুখোমুখি হয়। জন্মের পর থেকে কন্যাশিশু প্রতিনিয়ত এমন একটা সামাজিক চিত্রের মাঝ দিয়ে যায় যেখানে সে দেখতে পায়- সে ছেলেশিশুটির চেয়ে দুর্বল এবং কম সুবিধাপ্রাপ্ত; এ সমাজে নারী ও পুরুষের কাজ আলাদা; সমাজ তাঁর জন্য নিরাপদ নয় এবং তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্ব পুরুষের; তাঁর জন্মই হয়েছে সন্তান জন্মদান, প্রতিপালন এবং গৃহস্থালী পরিসরের জন্য। এবং এ সকল বিষয়কে স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক হিসেবে দেখানো হয়। এ চিন্তাধারা ছেলেশিশুকেও ক্ষমতাধর হিসেবে বেড়ে উঠতে দেয় এবং নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতি ধাবিত করে। কিন্তু সন্তান জন্মদান বাদে বাকী সব বৈষম্যই সৃষ্টি হয়েছে হাজার বছর ধরে সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিসরে।

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের হিসেবে বাংলাদেশে এখনও ৫৯ শতাংশ কন্যাশিশুর বিয়ে হয় ১৮ বছর হবার পূর্বেই। প্রাথমিক শিক্ষায় কন্যাশিশুর উপস্থিতির হার একটি ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখা হলেও এই কন্যাশিশুরাই পারিবারিক সহিংসতা, বাল্যবিয়ে, যৌন নির্যাতন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং অন্যান্য লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এসব নির্যাতনের মধ্যে রয়েছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, ধর্ষণ এবং হত্যা।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের এক পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ সালে জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত সারাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে অন্তত ১৬ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। এ বছর জানুয়ারি থেকে মার্চে ১৬৪ শিশু এবং এপ্রিল থেকে জুনে ৩৩২ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

এক্ষেত্রে সহজভাবেই বলা যায়, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার পাশাপাশি নারী ও কন্যাশিশুকে মুক্ত করতে হবে সামাজিক স্টিগমা এবং পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শ থেকে। এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর আইন সঠিকভাবে প্রতিস্থাপন এবং ব্যবহার, যেখানে রাষ্ট্রকে তাঁর ভূমিকা পালন করতে হবে।

ফাহমি ইলা

১৯৯৫ সালে বেইজিংয়ে নারীদের নিয়ে বিশ্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল যেখানে প্রায় ২০০টি দেশ থেকে ৩০,০০০ নারী-পুরুষ অংশগ্রহণ করেছিলো, দেশগুলি সর্বসম্মতিক্রমে Beijing Declaration and platform for action গ্রহণ করেছিল। এটি কেবলমাত্র নারীদের অধিকার নয়, কন্যাশিশুর অধিকারের ক্ষেত্রে অগ্রগতির একটি অন্যতম মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। এই ঘোষণাটিই প্রথম বিশেষভাবে কন্যাশিশুর অধিকারের ডাক দেয়।

platform for action এ যেসকল ইস্যুগুলো তুলে ধরা হয় সেগুলো হলোঃ

১। কন্যাশিশুর প্রতি সকল বৈষম্য দূরীকরণ
২। কন্যাশিশুর প্রতি সকল নেতিবাচক সাংস্কৃতিক মনোভাব এবং প্র্যাকটিস দূরীকরণ
৩। কন্যাশিশুর অধিকার সুরক্ষা এবং কন্যাশিশুর প্রয়োজনীয়তা ও সচেতনতা বৃদ্ধি
৪। শিক্ষা, দক্ষতা ও প্রশিক্ষণে কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণ
৫। স্বাস্থ্য ও পুষ্টিতে কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণ
৬। শিশুশ্রমের অর্থনৈতিক শোষণ দূরীকরণ ও কর্মক্ষেত্রে কন্যাশিশুকে রক্ষা করা
৭। কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সকল সহিংতা নির্মূলকরণ
৮। সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক পরিসরে কন্যাশিশুর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ এবং সচেতনা বৃদ্ধি
৯। কন্যাশিশুর অবস্থা/স্ট্যাটাস পরিবর্তনে পরিবারের ভূমিকা জোরদার করা

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর, ১১ অক্টোবরকে কন্যাশিশুর জন্য আন্তর্জাতিক দিবস হিসাবে পালনের জন্য একটি প্রস্তাব দেয়। বিশ্বজুড়ে সকল কন্যাশিশু যেসকল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় সেগুলোকে সামনে এনে কন্যাশিশুর অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করাই ছিলো এর মূল লক্ষ্য। ২০১২ সালের ১১ ই অক্টোবর প্রথম আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস পালিত হয় এবং এর থিমটি ছিল ‘বাল্য বিবাহ নিরসন’।

বেইজিংয়ের বিশ্বসম্মেলনের পর থেকে গত ২৫ বছরে বাল্যবিবাহ, শিক্ষায় বৈষম্য, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, জলবায়ু পরিবর্তন, কন্যাশিশুর আত্মসম্মান এবং ঋতুস্রাবের সময় পাবলিক প্লেস ও উপাসনালয়ে প্রবেশের অধিকারের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আন্দোলন হচ্ছে।

এ বছরের আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসের থিম হচ্ছে: ‘GirlChild: Unscripted and unstoppable’। পেছনে ফেলে আসা ২৫ বছরের সকল উদ্যোগ এবং কাজগুলোকে এ বছর উদযাপন করা হবে।

বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর একটি, ১৯৯০ সালে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে অনুস্বাক্ষর করার পর রাষ্ট্রীয়ভাবে কাঠামোগত অনেক উদ্যোগ নেয়া হলেও সামাজিক পরিসরে শিশু অধিকারের বিষয়টি অনেকখানি উপেক্ষিত যেখানে কন্যাশিশু আরো প্রান্তিক এবং অনিরাপদ।

রাষ্ট্রের উচিৎ লিঙ্গীয় বৈষম্য রোধে আরো সক্রিয় হওয়া, কন্যাশিশুর অধিকার নিশ্চিত করা, কন্যাশিশুবান্ধব আইন প্রতিষ্ঠা এবং তাঁর সঠিক চর্চা নিশ্চিত করা। একটি জনগোষ্ঠীর অর্ধেক অংশকে অনিরাপদ এবং অধিকারবঞ্চিত রেখে একটি দেশের উন্নতি কোনভাবেই সম্ভব না। এবং এ ভূমিতে প্রতিটি শিশুর সুষ্ঠু ও স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে।

লেখক: জেন্ডার এক্টিভিস্ট

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.