আবরার হত্যার বিচারসহ সকল বিচার বহির্ভুত হত্যার বিচার চাই

সামিনা আখতার:

আবরার ফাহাদের বাবা আর মা এর মুখটার দিকে তাকাতে পারছি না। লিখতে গিয়েও কান্না আসছে। মায়ের মুখটা আমাদের যেকোনো মায়ের মুখ। বাংলার মায়ের মুখ।

আমরা বহুবার শুনেছি এই বাক্য, আর যেন কোনো মায়ের বুক খালি না হয়! কিন্তু মায়েদের বুক খালি হয়েই চলেছে। এবং এমন নৃশংসভাবে খালি হচ্ছে যে সহ্য করা কঠিন। কোন মা’ই জানতে পারছে না তার ছেলেকে কেন হত্যা করা হলো!

আপনারা মায়ের বুক খালি হওয়ার বিষয়ে যে কথাটা বলেন, তার অর্থ কি বোঝেন? একটা মা ছাড়া এই কষ্ট পুরোপুরি বোঝা সত্যিই কঠিন। একটা মা সন্তানকে পেটে ধারণ করা থেকে শুরু করে অনেক বড় হওয়া, এমনকি তার নিজের মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটা মুহূর্তে তার সন্তানকে বুকে তো বটেই, তা না পারলে মনটা দিয়ে আগলে রাখেন। তিনি নিজের চাইতেও সন্তানের মঙ্গলকেই অগ্রাধিকার দেন।

ধরুন কোনো কারণে সন্তানের মন খারাপ, সেই মন খারাপের পুরোটাই মাকে আক্রান্ত করে। ধরুন সন্তান কোন সমস্যার কারণে খেতে পারছে না। মা’ও সেদিন ভালো ভাবে খেতে পারে না। গলা দিয়ে নামবেই না খাবার। সন্তান কোথাও ব্যথা পেয়েছে, আগেই জেনে যায় মা। এই হলো মা।

সেই আবরারের মা কী করে সহ্য করবে যে তার সন্তানকে তারই সতীর্থ ছেলেরা অমানুষের মতো পিটিয়েই শুধু ক্ষান্ত হয়নি, একদম প্রাণে মেরে ফেলেছে! ছেলেটা পিঠা খেতে চেয়েছিল। হায়রে মা, আর কোনদিন তুমি যে নিজে পিঠা খেতে পারবে না সেটা আমরা যারা মা হয়েছি তারা বুঝি, মা!

আবরারের হত্যার এই ঘটনার পর সারা বাংলাদেশ প্রতিবাদ জানালেও কেউ কেউ আবরারের ফেসবুক পেজে কী লিখেছিল তার লিংক দিচ্ছেন। প্রমাণ করতে চাচ্ছেন সে শিবির ছিল। আমি জানি না তারা কোন হৃদয়ে এই কাজটা করতে পারছেন! সে শিবির করলে তাকে এমন নৃশংসভাবে হত্যা করা জায়েজ করে ফেলছেন!

হ্যাঁ, একসময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিবির রগ কাটতো, হত্যাযজ্ঞ চালাতো। কিন্তু সেই একই অন্যায় আপনাদের হাতে হলে আপনারা খুব একটা অন্যায় দেখতে পান না, তাই তো? তাই যদি হয় তাহলে বলবো, আপনারা দেখতে পান না কিন্তু আমরা আপনাদের ফ্যাসিস্ট চেহারাটাই দেখতে পাচ্ছি!

এখনও যে ঘটনার রেশ কাটেনি সেই নয়ন বন্ডকে ক্রস ফায়ারে মারা হলো। আমি এই মৃত্যুর খবরের লিংকে অনেককে কমেন্ট করতে দেখেছি যে এরকম খুনিকে ক্রসফায়ারে দেয়াটাই ঠিক হয়েছে। আসলেই কি তাই?
আপনারা একবারও সেই নয়ন বন্ডকে কি তার মায়ের চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন? এই নয়ন তার মায়ের পেটে ছিল, তারপর আপনার বা আমার সন্তানের মতোই সে মায়ের নয়নের মনি ছিল।

কিন্তু মায়ের কোল ছাড়িয়ে কোনো এক সময় সে যখন এই পঙ্কিল, অপরাজনীতি, দুর্নীতিগ্রস্থ সমাজটাতে প্রবেশ করেছে, তখন দিনে দিনে সে হয়ে উঠেছে নয়ন বণ্ড! আচ্ছা, আপনাদের কি একবারও মনে হয়েছে, এই নয়নকে একজন আদর্শবান নয়ন হিসাবে গড়ে তুলবার জন্য রাষ্ট্রেরও দায় দায়িত্ব ছিল! আর ঠিক একইভাবে নয়ন একদিনেই বন্ড হয়ে উঠেনি তার এই বন্ড হয়ে উঠার পেছনে কারও না কারও সহায়তা ছিল। অথবা অন্ততঃপক্ষে প্রশাসন তাকে প্রশ্রয় দিয়ে দিয়েই বন্ড হতে সহায়তা করেছে। আর আমরা তো এতোদিনে জানিই কারা এবং কাদের মদদে নয়ন এরকমটি হয়ে উঠেছিল! মাঝখান থেকে পঙ্কিল হলো সমাজ, প্রাণহানি হলো আরও অনেকের, সেইসাথে অনেকগুলো মা সন্তানহারা হলো!

বরগুনার সেই হত্যাকাণ্ডের পর অনেকে অবশ্য খুব ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যে কেন মানুষ এগিয়ে এলো না। একটা কথা বলি, আপনারা যদি মনে করেন প্রকাশ্য দিবালোকে এরকম হত্যাটাই নয়নের সেই প্রথম এবং একমাত্র অন্যায় ঘটনা তাহলে বলবো, নয়ন বন্ড হয়ে উঠা এবং প্রতিদিন সেই এলাকায় নানান ঘটনার মাধ্যমে পুরো এলাকায় ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে বন্ড উপাধি ধারণের পুরো প্রক্রিয়াটাই আপনারা অস্বীকার করেছেন। যে সাধারণ মানুষগুলো প্রতিদিন এরকম দু একটা মারামারি, ধাওয়া পালটা ধাওয়া, চাঁদাবাজি ইত্যাদি দেখে, এবং এটাও দেখে যে প্রশাসন এ ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকে, কোনো বিচার নেই, এই সবকিছু যেন স্বাভাবিক, সেখানে সাধারণ মানুষকে দায়ী করবার আগে আর একবার ভাবা উচিত নয় কি?

তারপর এই নয়ন বন্ড যেদিন বিপদে পড়লো সেদিন তাকে মেরে ফেলে অসংখ্য রাঘব বোয়ালদের নানা অপকর্মের তথ্য প্রকাশের সম্ভাবনার মুখ বন্ধ করে দেয়া হলো, সেটি না ভেবে আপনারা বিচার বহির্ভুত এই হত্যার সমর্থন করলেন।
আচ্ছা একটিবার কি মনে হয়েছে, নয়ন বন্ডের মায়ের তো অধিকার ছিল পুরো বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার সন্তানের প্রকৃত অন্যায় জানার, তাই না?

ঠিক একই ঘটনা বুয়েটেও কি নয়? আপনাদের কি মনে হয় এই আবরারকে হত্যার মাধ্যমেই ছাত্রলীগের সেই পুরো গ্যাংটা একমাত্র অন্যায় করলো? আমরা সবাই জানি তারা সেখানে ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করেছিল। তাদেরকে দেখলে সাধারণ ছাত্ররা দশ হাত দূরে থাকে। তারা প্রতিদিনই নানা কারণে দু’একজনকে এরকম পিটিয়ে থাকে, আর প্রশাসন থাকে নিশ্চুপ! বুয়েটে টর্চার সেল বলে যে একটা সেল আছে, তাও তো জানলাম এখন। কত শত আবরার যে নির্যাতিত হয়েছে এসব সেলে সেই সংখ্যাটা জানতে পারবো কি কখনও?

আমরা তো আমাদের সময়কালেও দেখেছি, কীভাবে সাধারণ ছাত্র বা অন্য রাজনৈতিক আদর্শের ছাত্রদেরকে পিটিয়ে হাড় হাড্ডি একাকার করে দিত তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনগুলো। তারা একধরনের সরকার কায়েম করতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। হয়তো প্রাণের জোরে বেঁচে যেতো অনেকেই, কিন্তু মারাত্মক সেই অপমান কি তারা ভুলতে পারবে কোনদিন? মরে না গেলে কি সেটা অন্যায় নয়?

সেদিন যারা নিজের দলের সেই অন্যায় এর প্রতিবাদ করেননি, বরং মনে করেছেন, আরে রাজনীতি করলে এরকম একটু আধটু তো করতে হয়, না হলে সবকিছু লাইনে থাকে না, তারা আজ কি কোনো পার্থক্য দেখেন?
দেখতে পারেন, আমি দেখি না!

ঠিক একইভাবে বলবো যারা আবরারের ধর্ম বিষয়ক পোস্টের লিঙ্ক দিয়ে আবরার হত্যাকে একরকম বৈধতা দিতে চাচ্ছেন, তারা কি বুঝতে পারেন, তাই যদি হয় তাহলে অভিজিত হত্যার বিচার কেন এই সরকার করেনি? সেই একই তো গোঁড়া ধর্মীয় বিশ্বাস সেখানে কাজ করেছিল, তাই না?

এর অর্থ একটাই অভিজিত তো আপনাদের সোনার ছেলে ছিল না। আপনাদের দুর্নীতিগ্রস্থ রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি করা কোনো ছাত্র বা শিক্ষক কোনটাই সে ছিল না। আর অভিজিতের হত্যার বিচার মানেই তো ঠুনকো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে কিছু ভোট কমে যাওয়া। আপনাদের বিচক্ষণ রাজনীতি সেদিকে মাড়াবে না।
তাহলে আবরারের বেলায় কি হলো? সে তো নাকি শিবির ছিল!

আসলে এখানেও আপনাদের স্বার্থেই সে আঘাত করেছিল। ভারতের সাথে আপনাদের অন্যায় চুক্তির সে বিরোধিতা করেছিল। আর তাতেই আপনাদের পেটোয়া বাহিনী তাকে মেরেই ফেললো!
আমি চাই আবরার হত্যার বিচার চেয়ে গর্জে উঠুক বাংলাদেশ!
দাবি উঠুক বিচার বহির্ভুত সকল হত্যার বিচারের!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.