মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত তো? ফ্যাসিস্ট ‘ছাত্র রাজনীতি’ ফ্যাক্ট

ঈশিতা বিনতে শিরীন নজরুল:

আমার বাবা অ্যাক্টিভ ছাত্র রাজনীতি করতেন। পাকিস্তান আমলের কথা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার যা তাঁর চাকরি জীবনেরও নানা সময়ে নানা প্রভাব ফেলেছে। বড়ো ঠোঁটকাটা মানুষ ছিলেন। তো এই মানুষটার কাছেই রাজনীতির ইতিহাস জানা! হাজার অভিজ্ঞতা শুনতে শুনতে আমার বড় হওয়া। এক সময় মনে বিশ্বাস জন্মে গিয়েছিল, ছাত্রনেতা মানেই বুঝি জ্ঞান আর বুদ্ধির মিশ্রণ।

মুগ্ধ হয়ে শুনতাম সেই সময়ের গল্প। বাবা পড়তেন সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে। সন্ধ্যায় মিটিং থাকলে বিকেলের ভেতর পড়া শেষ করে তারপরে সবাই হল থেকে বের হতেন। আমি সেই সময়ের কথা বলছি, যখন মেডিকেল কলেজে হাজার পরিশ্রম করে পড়াশুনা করেও পাশ করতেন ৩/৪ জনের বেশি না। আবার কোনো ছাত্রনেতাকে জেলে নিয়ে গেল, জেলে বসেই নাকি ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে তিনি সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়েছিলেন!

এগুলো ছিল আমার কাছে রূপকথার গল্প। ছাত্র রাজনীতি তখন আমার কাছে একটা অলৌকিক জগৎ। বাবা অনেকবার বলেছেন, ছাত্র রাজনীতি করতে গেলে প্রথমেই নাকি তার সব বিষয়ে প্রচুর পড়াশুনা থাকতে হবে। আমার বাবা রাজনীতি নিয়ে আরও পড়াশুনার ধাপ হিসেবে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু এর তিনটি মোটা মোটা বই আমাকে কিনে দিলেন। বলাই বাহুল্য যে, তখন আমি ক্লাস সিক্সে পড়ি! একই ক্লাসে দিলেন মাও সেতুং এর বইও! এতো সাতকাহন গাইছি, কারণ এই মানুষটিই আমাকে পরবর্তি সময়ে বারংবার মনে করিয়ে দিতেন, ভুলেও যেন রাজনীতির দিকে পা না মারাই! যে মানুষটা কখনও অন্যায়ের সাথে আপোস করেননি, তিনিই বলতে থাকলেন, কোন ঝামেলায় জড়াবে না! সবকিছু করা যাবে, ছাত্র রাজনীতি করা যাবে না!

অথচ ছাত্র রাজনীতি দেখে দেখেই বড় হতে থাকলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিমণ্ডলে।

জাকসু! আমি তখন অনেক ছোট, কিন্তু এখনও মনে পরে জাকসু নির্বাচনের উৎসবমুখর পরিবেশের কথা। সবচেয়ে মনে রাখার মতো বিষয় ছিল, ছাত্রীদের বিপুল অংশগ্রহণ যা কিনা আপনি এখন খুঁজলেও পাবেন না! পরবর্তী সময়ে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ তো কমে যায়। এর আরেকটা কারণ বোধকরি ডান রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্টদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও জানাশোনা ছিল অত্যন্ত স্থূল পর্যায়ের। অথচ এই বিশ্ববিদ্যালয়েই কত আন্দোলন হয়েছে। এমনকি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই সময়ে ছাত্রলীগ-ছাত্রদল এক হয়ে ছাত্র শিবিরের অন্যায়ের প্রতিবাদ পর্যন্ত করেছিল!

১৯৯৫ সালে তৎকালীন ভিসি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন, ছাত্রদের পাশে থেকেছেন, নিরাপদে রাখার চেষ্টা করেছেন! কিন্তু আজ? অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানববন্ধনে ছাত্র-শিক্ষক আপনি হাতে গুনতে পারবেন। কেন? কারণ শিক্ষক থেকে ছাত্র সবাই এখন লেবাসধারী বটবৃক্ষের তলায় আশ্রয়ে আছে। আর গুটিকয়েক ‘প্রান্তিক’ ছাত্র-শিক্ষক অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে যায়, মার খায়!

দার্শনিক হারবার্ট মারকিউস তার ‘ওয়ান ডাইমেনশনলি ম্যান’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘বর্তমান সমাজে তরুণ সমাজই একমাত্র বিপ্লবী সত্তা, কারণ তারা উৎপাদন প্রক্রিয়ার বাইরে রয়েছে। রাষ্ট্রের সব রকম উৎপীড়নের বিরুদ্ধে তারাই সংগ্রাম চালাতে সক্ষম এবং পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই তরুণ সমাজ অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করে এসেছে। বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের আন্দোলনে তাদের অবদানই সবচেয়ে বেশী।’

১৮৩০ সালের জুলাই মাসে ফ্রান্সে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে বিপ্লব মাত্র সংঘটিত হয়েছে, সে সময় কলকাতার তারুণ্যে ভরা কয়েকজন ছাত্র একদিন গভীর রাতে নবনির্মিত একটি মনুমেন্ট নাম অক্টরলনি, সেখানে গিয়ে সেই অক্টরলনির চূড়া থেকে ইংরেজদের জয় পতাকাটি অপসারণ করে উড়িয়ে দেয় ফরাসি বিপ্লবের সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার বিজয় নিশান। আর সেদিনকার ঐ ঘটনাটি ছিল এ বাংলার ছাত্রদের প্রথম আন্দোলন ও প্রতিবাদ। এ বাংলায় ছাত্র আন্দোলনের জন্য অসংখ্য ছাত্র সংগঠনের জন্ম হয়েছিল। প্রথম যে ছাত্র সংগঠনটির জন্ম হয় তার নাম ছিল ‘একাডেমিক এসোসিয়েশন’। এই ‘একাডেমিক এসোসিয়েশনের’ লক্ষ্য ছিল ছাত্রদের মাধ্যমে সমাজের কুসংস্কার দূর করা। ১৯২৮ সালে নিখিল বঙ্গ সমিতি’, ১৯৩১ সালে ‘বঙ্গীয় তরুণ ছাত্র সংঘ, এরকম কত কত নাম আমরা পড়েছি!! সবই মনে হয় রূপকথা, নয় কি?

ছাত্র রাজনীতি তথা ছাত্র সংগঠনগুলো অনেক আগেই তাদের অতীত গৌরব হারিয়ে ফেলেছে। ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১ সালের ছাত্র আন্দোলন ও গণঅভ্যূত্থান এখন কেবলই ইতিহাসের বিষয়। এমন দুর্ভাগ্যজনক পরিণতির প্রধান কারণও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্র সংগঠনগুলো যতদিন স্বকীয়তা ও স্বাধীন মর্যাদা নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, ততদিনই তাদের পক্ষে ছাত্র সমাজের পাশাপাশি দেশ ও জনগণের স্বার্থে অবদান রাখা সম্ভব হয়েছে। এরপর এসেছে পতনের পালা আর তার কারণ, রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্র সংগঠনকে নিজেদের অঙ্গ-সংগঠনে পরিণত করেছে। অন্যদিকে দলীয় সংঘর্ষ ও মৃত্যু। এমনকি ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ বন্ধের জন্য বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের শান্তি-মিছিলেও গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল মঈন হাসেন রাজুকে!! যার স্মরণে টিএসসি মোড়ে নির্মিত হয়েছে রাজু ভাস্কর্য। বর্তমানে প্রতিপক্ষ বলে কেউ নেই। জোরপূর্বক ছাত্রদল, ছাত্র-শিবির– সবাই এখন একই ব্যানারে সমবেত, তার নাম হলো ছাত্রলীগ।

বিএনপি শাসনামলে দেখা যেত বিশ্ববিদ্যালয়ের হলসমূহ অস্ত্রসহ পাহাড়া দিচ্ছে ছাত্রদল, যেন কোনো ছাত্রলীগ কর্মী ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়েও হলে প্রবেশ করতে না পারে। আবার পরবর্তীতে একই চিত্র। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে– কে কখন লাশ হয়ে ফিরছে বা ফিরবে তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না, নেইও। চেঙ্গিস খাঁ, নাদির শাহ কিংবা আধুনিক কালের ফ্যাসিস্ট শাসকদের অত্যাচারকেও ছাড়িয়ে গেছে এসব বর্বরতা। নইলে হলের শত শত ছাত্রের উপস্থিতিতে কীভাবে একজন ছাত্রকে মেরে ফেলা সম্ভব? আমি ভয়ে শিউরে উঠছি সত্যি!!

ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করলাম যে, আমি যদি ঐ হলের কোনো একজন ছাত্র হতাম আমি কি প্রতিবাদ করতাম? করতাম না। আমরা ধরাছোঁয়ার বাইরে বসে প্রতিবাদ করতে চেষ্টা করি। এটা কি দোষ? কেউ কেউ বলবেন, এটা সেলফ ডিফেন্স, কেউ বলবেন কাপুরুষ, আবার কেউ বলবেন সারভাইবেল ফর দ্য ফিটেস্ট!! আপনি আসলে এমন একটা ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বলতে চান যেখানে আপনি আসলে এক্সিস্টই করেন না। আপনাকে কেউ কি আসলেই গোণায় ধরে? আপনি কি আদৌ মানুষ? কী জানি?

এখন প্রশ্ন–সরকারের ইঙ্গিত ছাড়া এ ধরনের কর্মকাণ্ড কি ঘটতে পারে? ছাত্রলীগ-ছাত্রলীগে মারামারি হয়, ছাত্রী প্রহৃত হয়, ধর্ষণের শিকার হয়–তখন এর দায়ভার সুনির্দিষ্ট দল নিতে না চাইলেও কি তার উপরই বর্তায় না? সন্তান জন্মদান করে অস্বীকার করলেই তো আর পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব খারিজ হয়ে যায় না। যেসব রাজনৈতিক দল ঐ সব ছাত্র সংগঠনের জন্ম দিয়েছে বলে গর্ববোধ করে, এর নিন্দনীয় ভাগটিও তাদেরই বহন করতে হবে। রাজনৈতিক দলসমূহের যেসব ক্রিয়াকর্ম রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যক্তিগত করে নেয়, ব্যাংকের টাকা লুটের মাধ্যমে দলীয় ব্যক্তিদের ‘শিল্পপতি’ বানায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ পাচার হতে সহায়তা করে, নদীনালা, খাল-বিল দখল ও হাজার হাজার একর পাহাড়ি বনভূমি কেনাবেচার মহোৎসব করে মানুষের মৃত্যুসহ পাহাড় ধ্বংসে সহায়তা করে, ইটভাটার দূষণ, নদী-দূষণসহ সব অন্যায়কারীদের পৃষ্ঠপোষকতা করে, ক্ষুদ্র চাষিকে নির্যাতন করে চিংড়ি ঘের দিয়ে পুরো অঞ্চল লবণাক্ত করে কৃষি ও মানুষসহ সকল প্রাণির জীবনকে দুর্বিষহ করে এবং তারা তা করে জাতীয় রাজনীতিরই ছত্রছায়ায়– কাজেই তারাই কি দায়ী নয়?

আপনি কি মনে করেন না যে, শিক্ষাব্যবস্থা এবং দেশকে বাঁচানোর জন্য সন্ত্রাস-সমস্যাকে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন? ছাত্রদের আন্দোলনকে শুধু শক্তি হিসাবে চিহ্নিত না করে ভবিষ্যতে মেধা ও নেতৃত্ব বিকাশের সুস্থ পথে চলতে দেয়ার সুযোগ করে দিতে হবে? আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সর্বসম্মতভাবে ছাত্র রাজনীতির আচরণবিধি ও রূপরেখা প্রণয়ন এবং কার্যকরণ করার প্রয়াস রূপকথার গল্প মাত্র।

মনে হচ্ছে ক্রিটিসিজম, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতা মানেই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করা, সরকারি দলের অঙ্গ সংগঠনগুলো এখন পেটোয়া বাহিনীর রূপে আবির্ভূত হয়েছে, যেকোনো ধরনের সমালোচনাকে প্রতিহত করতে রাজনৈতিক দলের পেটোয়া বাহিনী এখন ছাত্র, সাধারণ মানুষ, ব্লগার, সাংবাদিক হত্যার হোলি খেলায় উন্মাদের মত আচরণ করছে, বুয়েটে আবরার ফাহাদ হত্যা কাণ্ড সহ অনেক হত্যাকাণ্ডই ঘটে যেতে থাকবে।

দেশের সর্বোচ্চ মেধাসম্পন্ন ছেলেমেয়েরা এখানে পড়ালেখা করতে আসে। তারা শুধু তাদের অভিভাবকদেরই গৌরবের নয়, দেশেরও গৌরব। দেশ একটা মেধা হারালো আর যার পেছনে অন্য মেধাবীরা জড়িত। শুধু মেধা থাকলেই হবে না, সেটার গুরুত্বও বুঝতে হবে। কেথায় এরা পড়ালেখা আর গবেষণা করে দেশকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে, সেটা না করে একজন অন্যজনকে নির্দ্বিধায় নিধন করছে। বাবা মায়ের কোল খালি হলো যারা অনেক স্বপ্ন নিয়ে তাদের মেধাবী ছেলেকে দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পাঠিয়েছিল।
দেশ এমন একজন মেধাবীকে হারালো যে হয়তো তার মেধা দিয়ে দেশকে আলোকিত করতে পারতো। কোপানোর ছবি থাকা সত্ত্বেও বিশ্বজিতের খুনিদেরকে ফেরারি অবস্থায়ও খালাস দেয়া হয়েছিল। আর অভিজিৎ এর সময় পুলিশ পাশে থাকলেও এগিয়ে আসে নাই। এমন হাজার আবরারের মৃত্যু হচ্ছে প্রতিদিন। আপনি, আমি কয়টার খবর জানি? কীইবা করতে পারি?

নৃবিজ্ঞানী, গবেষক ও অনলাইন লেখক

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.