একজন আবরারের মৃত্যু আর আমার বিক্ষিপ্ত অভিজ্ঞতা

জহুরা আকসা:

সেদিন একজন কমেন্টে আমাকে খুব দৃঢ়তার সাথে রাজাকারের গুষ্ঠি বলে গালাগালি করলো। আমি খুব অবাক হয়ে ভাবলাম, তিনি কেন এমন কমেন্ট করলেন! পরে বুঝলাম, আসলে আমার পোশাক বা মাথার হিজাব দেখেই তিনি বিচার করলেন যে আমি রাজাকারের গুষ্ঠি। অথচ আমার বাবা, চাচারা, মামারা এবং আমার দুই নানা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। কোনো দিক দিয়েই আমাদের পরিবারের সাথে রাজাকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবুও পোশাক দেখে এমন মন্তব্য শুনতে হলো!

আরেকবার আরেকজন এক কমেন্টে আমাকে পাকিস্তানি দালাল বলে গালাগালি করলো! শুনে হাসবো না কাঁদবো তাই চিন্তা করলাম। অবিভক্ত ভারতবর্ষ যে আমার অতীত তা এখনও ভুলতে পারি না। এখনও ভারতে আমাদের রক্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বরং পাকিস্তানার সাথে কোনোভাবেই কোনো সম্পর্ক নেই। না রক্তের না চিন্তার। বরং রাগ এখনো জীবিত। তবুও আমার পোশাক দেখে বলবে আমি পাকিস্তানি দালাল!

ফ্রান্সের মতো আধুনিক বিশ্বে থেকেও কিছু মানুষ আমার লেখালেখি নিয়ে কুৎসিত মন্তব্য করতে গিয়ে বলবে বোরখার তলায় তসলিমা নাসরিন! নাস্তিক! অথচ আমি জ্ঞান বুদ্ধি হওয়ায় পর থেকে নিয়মিত ধর্ম চর্চা করি। তবুও নাকি আমি নাস্তিক!

আসলে আপনি নিরপেক্ষ হয়ে কোনো কিছু চিন্তা করতে পারবেন না। আপনাকে কারোর না কারোর পক্ষ নিয়ে কথা বলতে হবে। আপনি ভারতকে নিয়ে খারাপ কিছু কথা বললে শুনতে হবে পাকিস্তানের দালাল। নিয়মিত নামাজ রোজা করলে শুনতে হবে জামাতি ইসলাম। বোরখা হিজাব পরলে শুনতে হবে রাজাকার।

শুধু তাই না, অনেকদিন ধরে বাংলাদেশে কিছু মানুষ সবসময় এমন কথাবার্তা বলেন যে, যারা মুক্তিযোদ্ধা ছিল তারা কেউ নামাজ পড়তো না, তারা সবাই সেক্যুলার রাষ্ট্র পছন্দ করতো, এবং যারা নামাজ পড়ে, যারা ধর্ম বিশ্বাস করে তারা সব রাজাকার! অথচ বাংলাদেশের বেশিরভাগ মুক্তিযোদ্ধা ছিল সাধারণ জনগণ, যাদের অধিকাংশই ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন।

আবার আপনি যদি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলেন, বা মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের কথা নিয়ে স্ট্যাটাস লিখেন, কিংবা ৭১ এর পাকিস্তানের বর্বরতা নিয়ে কথা বলেন তাহলে বলবে, ভারতের দালাল! নয়তো নাস্তিক! পাকিস্তানের সমালোচনা করলে বলবে ভারতের দালাল।

আপনি যদি নারী স্বাধীনতা নিয়ে কথা বললেন, তাহলে আপনাকে নারীবাদী ট্যাগ দিবে, নাস্তিক বলে গালাগালি করা হবে। আপনি যদি মুক্তচিন্তা চর্চা করেন তাহলে নাস্তিক ট্যাগ দিবে! আপনাকে নোংরা আক্রমণ, এমনকি হত্যা করা জায়েজ করবে!

এমনকি আপনি ফেসবুকে স্ট্যাটাস লিখেন? নিজের মতামত চর্চা করেন? তাহলে আপনার জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আক্রমণ শুরু করবে! নানান ধরনের উল্টো পাল্টা নেতিবাচক অনেক উপমা দিয়ে আপনাকে আক্রমণ করা জায়েজ করবে।

উদাহরণ সামনে হাজির।

নাস্তিক ট্যাগ দিয়ে একের পর এক ব্লগার, মুক্তচিন্তক খুন, আর শিবির ট্যাগ দিয়ে আবরার ফারহাদ খুন একই বিষয়।

আবরারের দোষ, সে নিজের মতামত ফেসবুকে লিখেছিল। যেখানে ভারতের সামান্য সমালোচনা করা হয়েছিল, আর করা হয়েছিল সরকারের নাজুক রাজনীতির। সেখানে হাজার হাজার লাইক পড়েছে। হাজার হাজার শেয়ার করা হয়েছে। নিশ্চয় তার স্ট্যাটাসের লাইক কমেন্ট শেয়ার দেখে কিছু মানুষ ঈর্ষান্বিত হয়েছিল!

তার উপরে আবরারের মুখে হাল্কা দাড়ি ছিল। তার বাবার সাক্ষাত্কারে শুনে বোঝা গেল আবরার নামাজ পড়তো। তাই তার আশপাশের ছাত্ররা ধরেই নিল ফরহাদ শিবির করতো! সুতরাং তাকে ধরে পিটাও! পিটিয়ে পিটিয়ে আবরারকে হত্যা করো!

আমাদের সমস্যা কি জানেন? আমরা অন্যের ভিন্ন চিন্তা, ভিন্ন মতাদর্শ মেনে নিতে পারি না। আমরা মতের বিরুদ্ধে গেলেই নোংরা আক্রমণ শুরু করি। এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মকে গালাগালি না করে শান্তি পায় না। আর আমাদের এই আচরণ গুলি একে অন্যের বিরুদ্ধে হিংসা বিদ্বেষ ছড়ায়।

আপনি মানুন আর না মানুন, অন্য ধর্ম বা মতাদর্শের মানুষদের বিরুদ্ধে হিংসা বিদ্বেষ কিন্তু আমরাই চর্চা করি। অন্য ধর্ম ও মতাদর্শের মানুষদের আক্রমণ করতে পচ্ছন্দ করি। তাদের হ্ত্যা জায়েজ করি।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.