মেন্সট্রুয়াল কাপ: ট্যাবু কেন পিছিয়ে দিচ্ছে!

নাহিদ দীপা:

১৯৯৫-৯৬ সালের দিকে বার্ষিক পরীক্ষা দিচ্ছি খুলনার বেশ নামকরা এক স্কুলে। তিন ঘন্টার পরীক্ষায় এক ঘন্টা পেরোলে ওয়াশরুমে যাওয়ার অনুমতি মিলতো। ঘন্টা পেরোনেোর আগেই পাশের কক্ষ থেকে আচমকা এক স্যারের চিৎকার, এক ম্যাডামের সংগে তিনি বেশ উঁচু গলায় কথা বলছেন, একজন ছাত্রী ওয়াশরুমে যেতে চায় আর স্যার যেতে দিবেন না। দুঘন্টা পেরোলে আমি লেখা মোটামুটি গুছিয়ে ওয়াশরুমে যাওয়ার অনুমতি চাইলাম। যাবার পথে দেখলাম খুব পরিচিত এক আপু বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। খুব কাঁদছেন আর তিনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন সেখানে ঠিক তার পায়ের কাছে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত।

আমার মাসিক তখন কেবল শুরু হয়েছে, দুই কি তিন মাস। আর আমিও ওয়াশ রুমে যাচ্ছিলাম সেজন্যই। তখন খুব কষ্ট লাগছিল সেই আপুর জন্য। কেউ না বুঝলেও নিজে নিজেই মিলিয়ে নিলাম, স্যারের রাগান্বিত বাদানুবাদের কারণ। পরীক্ষা শেষের কিছুক্ষণ আগে, সেই ম্যাম-যার গলা শুনছিলাম স্যারের সংগে কথা কাটাকাটিতে, তিনি হন্তদন্ত হয়ে এলেন, জিজ্ঞেস করলেন কার কার লেখা শেষ। আমি হাত তুললাম।
বললো, এই আপু কী বলেন তুমি দ্রুত লিখে দাও। আরেকজনকে দায়িত্ব দিলেন, তার অবজেকটিভ খাতায় বৃত্ত ভরাটের। দুটো মিলিয়ে অন্তত: সেই আপু পাশ যেন করতে পারেন।

সেই সময়ে মাসিক বা পিরিয়ড ছিল নিষিদ্ধ এক বিষয়ের নাম। মেন্সট্রুয়াল হাইজিন পণ্য স্যানিটারি প্যাড প্রথম হাতে ধরে দেখি আমি আরো প্রায় ৮/৯ বছর পরে, বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে। কিন্তু কিনতে গেলে খরচের কথা মাথায় ঘুরতো, দুই প্যাকেট প্যাডের দামে সারা মাসের হলের ডাইনিংয়ের খাবারের বিল দেয়া যেত। তাই প্যাড কেনা বিলাসিতা মনে হতো। প্যাডের উপর টয়লেট টিস্যু তাই হলো আমার খরচ বাঁচানোর উপায়। একেই যে বলে ‘পিরিয়ড পোভার্টি’ তা জেনেছি এই মাস দুয়েক আগে।

বর্তমান পেশার জন্যই মাঝে মাঝে স্কুল-কলেজের কিশোর-কিশোরীদের সামনে কথা বলার সুযোগ পাই, এই মাসিক চলাকালে কী করতে হবে আর কী করতে হবে না- সেই বিষয় নিয়ে।
তাদেরকে জানাই, যদি বাসা-স্কুল কোথাও জানতে না পারে এই ‘মাসিক’ এর ব্যাপারে, তাহলে বিনামূল্যে তারা ফোন করতে পারে কিছু সরকারি/বেসরকারি নাম্বারে (জাতীয় স্বাস্থ্য বাতায়ন-১৬২৬৩, মেরী স্টোপস কল সেন্টার-০৮০০০২২২৩৩৩)।
একসময়ে নিষিদ্ধ বিষয় এখন উঠে এসেছে পাঠ্যবইয়ে। শিক্ষকরা যেন বিনা সংকোচে পড়াতে পারে সেজন্য পাঠ্যবইয়ের বাইরে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে সরকারিভাবে। মাধ্যমিক স্তর থেকেই মাদ্রাসা এবং স্কুলে একই শ্রেণীকক্ষে ছেলে-মেয়েরা একই সাথে শিখছে মাসিককালীন স্বাস্থ্য সচেতনতা সম্পর্কে।

রেডিও, টিভিতে অবলিলায় স্যানিটারি প্যাডের বিজ্ঞাপন-আলোচনা অনুষ্ঠান প্রচারিত হচ্ছে। প্রথমদিকে যে স্যানিটারি প্যাডের বিজ্ঞাপনে নীল রং দেখানো হতো রক্ত শুষে নেবার ক্ষমতা বোঝাতে এখন সেখানে লাল রং দেখানোর সাহস করতে পারছে নির্মাতারা। যেখানে প্যাড কেনা আমার জন্য ছিল বিলাসিতা, সেই প্যাড এখন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন দিচ্ছে এক টাকায়। নামী দামী কোম্পানিকে তারা দেখিয়ে দিচ্ছে সদিচ্ছা থাকলে সবকিছুই সম্ভব।

নতুন পেশায় এসে আরো দুইটা স্যানিটারি উপকরণের সাথে পরিচয় হলো আমার। একটা হলো ট্যাম্পুন, অন্যটা মেন্সট্রুয়াল কাপ। পিরিয়ড পোভার্টিকে কীভাবে বাগে আনা যায় সে চিন্তা আর আরামের কথা মাথায় নিয়ে পড়ালেখা করতে করতে আবিস্কার করলাম, মেন্সট্রুয়াল কাপ হতে পারে এর সহজ সমাধান।

বিংশ শতাব্দির মাঝামাঝি এই মেন্সট্রুয়াল কাপ আবিস্কৃত হলেও তা আজও ততটা প্রচার পায়নি কিছু ট্যাবু বা সংস্কারের জন্য। যেমন এটা অবিবাহিতরা ব্যবহার করলে ভ্যাজাইনা বড় হয়ে যাবে, ভ্যাজাইনার মধ্যে হারিয়ে যাবে ইত্যাদি।

এর চেয়েও বড় বিষয় হলো, ভয়। অবিবাহিতরা তো বটেই, কীভাবে ব্যবহার করবো-এই ভয়েই কাবু হয়ে যায় বিবাহিতরাও। কিন্তু এক বছর ধরে ব্যবহার করার পর আমি জানি, এই ভয়টুকু জয় করতে পারলেই চিন্তামুক্ত হয়ে নির্বিঘ্নে অন্যান্য দিনগুলার মতোই স্বাভাবিকভাবে কাটানো যায় মাসিকের ৪/৫টি দিন।

বিশ্বের সেরা ব্র্যান্ড অরগানি কাপ ২০১২ সাল থেকে বিপণন করে আসছে বাজারে। তারা তাদের সাত লাখ ব্যবহারকারীর উপর জরিপ চালিয়ে দেখেছে ৯৪% মেয়েরা যারা একবার মেন্সট্রুয়াল কাপে অভ্যস্ত হয়েছে, তারা আর অন্য কিছু ব্যবহার করতে চায় না।
সিলিকনের তৈরি একটি কাপ ঠিকঠাক মতো ব্যবহার করলে যেখানে ১০ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়। একই সাথে একটা অর্থসাশ্রয়ী, স্বাস্থ্যকর, আরামদায়ক আর পরিবেশ বান্ধব। পার্বত্য অঞ্চলে, যেখানে পানির অভাব কিংবা বিল বা হাওড় বা বন্যা প্রবণ এলাকার মেয়েদের জন্য মেন্সট্রুয়াল কাপ একটি দারুণ সমাধান হতে পারে।

প্রতিমাসে স্যানিটারি প্যাড কেনা বাবদ একজন মেয়ের গড়ে প্রতিবছর ছয় হাজার টাকা খরচ হয়। তার তিনভাগের একভাগ টাকা, মানে দুই হাজার টাকায় বিশ্বমানের একটি কাপ কিনে ১০ বছর ব্যবহার করা যায়। একজন স্বচ্ছল নারী যিনি ‘পিরিয়ড পোভার্টি’কে বুড়ো আংগুল দেখিয়ে স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করার সামর্থ রাখেন, তিনিও পরিবেশ অসচেতনতায় ফেলছেন গড়ে সাড়ে এগারো হাজার স্যানিটারি প্যাড। যার এক একটি পঁচতে সময় লাগে সাড়ে পাঁচশো বছর।

বিশ্বের অন্যতম মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেট পাবলিক হেলথ, ২টি উন্নয়নশীল দেশ, ১৫টি নিম্ম ও মধ্য আয়ের দেশ ও বেশ কয়েকটি উন্নত দেশের ৩ হাজার ৩১৯ জন নারী ও কিশোরীর মতামত নিয়ে ৪৩টি গবেষণার ফল পর্যালোচনা করে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে ১ আগস্ট ২০১৯।

নিবন্ধে উল্লেখ করা ১৩টি গবেষণায় দেখা গেছে এ কাপ একবার ব্যবহার করে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার পর ৭৩ শতাংশ নারীই এটি নিয়মিত ব্যবহার করতে আগ্রহী। ২৯৩ জন নারীর ওপর চালানো চারটি গবেষণায় প্যাড অথবা টেম্পুনের সঙ্গে মেন্স্ট্রুয়াল কাপের ধারণ ক্ষমতা ও চুইয়ে পড়ার প্রবণতা মিলিয়ে দেখেছেন গবেষকরা এবং দেখা গেছে, এই দুই ক্ষেত্রেই মেন্সট্রুয়াল কাপের ব্যবহারকারীরা অনেক বেশি সন্তুষ্ট।

তিনটি গবেষণায় দেখা গেছে, টেম্পুন ও প্যাড থেকে রক্ত চুইয়ে পড়ার সম্ভাবনা যতটুকু থাকে, মেন্স্ট্রুয়াল কাপের ক্ষেত্রেও তা একই রকম। বরং একটি গবেষণায় কাপের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা আরও কম পাওয়া গেছে। ফলে কাপড়ে দাগ লাগার ভয়ও থাকে কম।

আমি নিজে ব্যবহার করছি প্রায় এক বছর ধরে। নিজে যে আরাম আর স্বাচ্ছন্দ পেয়েছি, তা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে হাতের নাগালে থাকা সবাইকে উৎসাহ দিচ্ছি-সাহস যোগাচ্ছি এই কাপ ব্যবহার করার জন্য। সবচেয়ে বড় কথা, মেন্সট্রুয়াল কাপ ব্যবহার করে পিরিয়ডকালীন শারিরীক ভাষা বদলে গেছে আমার। উঠতে গিয়ে আচমকা মনে হয় না, ভেসে যাচ্ছি রক্তে কিংবা এই বুঝি পেন্টি-পায়জামা ভেদ করে দাগ লেগে গেল জামায়।

উৎসাহী হয়ে ফেইসবুকে গ্রুপ খুলেছি (Menstrual Cup) বিভিন্ন তথ্য জানাতে। যারা কিনতে আগ্রহী, তাদের সরবরাহও করছি, কোথা থেকে সহজে কিনতে পারবে সে তথ্যও দিচ্ছি।

এখন যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন দেখি, কী ভয় আর দ্বিধা নিয়েই না আমি আমার মেয়েবেলা কাটিয়েছি। প্রথম পিরিয়ড শুরুর ২৫ বছর পর আমি জানি, এখন পিরিয়ডের দিনগুলো অন্য আর দশটা স্বাভাবিক দিন। মেন্সট্রুয়াল হাইজিনের সবচেয়ে আধুনিক আবিস্কারের সাথে আমার পথ চলছি। মেন্সট্রুয়াল কাপ যেকোনো সর্বাধুনিক ইলেক্ট্রনিক গ্যাজেটের চেয়ে বেশি মূল্যবান এখন আমার কাছে।

আর স্বপ্ন দেখছি, পিরিয়ড পোভার্টিকে পেছনে ফেলে, নারী জীবনের সাড়ে ছয় বছরের (প্রতিমাসের ৫/৬ দিন হিসাবে) দু:শ্চিন্তাকে একদিন হার মানাতে পারবে ধনী-গরীব সবাই।

শেয়ার করুন:
  • 598
  •  
  •  
  •  
  •  
    598
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.