ত্রিকাল দর্শিনী

সুচিত্রা সরকার:

ষষ্ঠী থেকে পুজো শুরু নয়। মহালয়া থেকেও নয়। আগষ্টে জন্মদিনের পর থেকেই মূলত শুরু। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকলেই পূজোর বাতাস নাকে টের পেতাম। গন্ধটায় শিউলি, ঢাক, আর ধুনুচি নাচের সুবাস।

বাবার সঙ্গে পুজোর স্মৃতি বলতে এই, একবার মনে আছে, চারজনে মিলে শিব মন্দিরে গিয়েছি। আরেকবার বাবা প্রচুর দামী একটা জামা সারপ্রাইজ গিফট দিয়েছিলেন। তারপর থেকে আমার পূজো বাবাহীন।

পূজোয় সেই কালে ষষ্ঠীর বেলবরণ, কলাবউ ইত্যাদিতে ঘোরের মধ্যে থাকতাম। একটু একটু আনন্দের খিঁচুনি উঠতো যেন!
পাড়ায় যে মন্দিরে আমরা পূজো করি, সকাল থেকে রাত সেখানেই। খাঁ খাঁ দুপুরে, যখন সবাই ক্লান্ত, তখনও। কিছু যেন বাদ না পড়ে, আনন্দ থেকে।

তারপর কৈশোর।
আগের সবকিছুর মধ্যে মন্দিরে পড়ে থাকাটা একটু কমেছিল। বেড়েছে মুগ্ধতা। সবকিছুতেই মুগ্ধদৃষ্টি। আরতি নাচ দেখার আগ্রহ বেশি ছিল, বয়সের ঝোঁকে।
সে বয়সটায় প্রেমে পড়া বারণ। তাই পূজোর প্রথম দিন যে ছেলেটা আমার হৃদয় ঝলকিয়ে চলে গেল, দশমীর পর হয়তো তাকে আর মনে পড়তো না।
সে বয়সের ধর্ম যা, আমি কোন হনু, তাকে বিরত রাখি। তাই সবই চলেছে নিয়মমতো।

তবে তখন আমাদের সংসারে বাবা নেই। মা প্রতিদিন শত অপমান মাথায় নেয়। রাতে বালিশ ভেজায়। আমি মায়ের চোখের জল মুছি। বাজারের ব্যাগ বহন করি। সুতরাং কৈশোরের মগ্নতা খুব ছুঁতে পারেনি।

তবে তখন যেন কাশফুল কেবল আমার তরেই ফুটতো। একবার দশমীর পরে দুগ্গা মাকে যে ট্রাকটায় করে বুড়িগঙ্গায় নিচ্ছিল, সেটায় চেপে বসেছিলাম। আমিও যাবো বুড়িগঙ্গায় ঠাকুর ডোবাতে।

তার কিছুকাল পরে তারুণ্য। পূজোয় সন্ধিপূজোর একশ আটটা নীলপদ্ম ফোটাতাম। কী এক প্রেম একশ আটটা প্রদীপে, জানি না। আর অপেক্ষা করতাম দশমীর সিঁদুর খেলার জন্য। কপাল লাল করবো সিঁদুরে। মনে মনে হয়তো চাইতাম কেউ সিঁথি রক্তিম করুক প্রতিদিন।

এবারের পূজো অন্যরকম। কেনাকাটা নিজের জন্য কিছুই হলো না। হায়দরাবাদ, দিল্লী থেকে সেবারের আনা কাপড়েই চালিয়ে নিচ্ছি। ষষ্ঠী গেল নিজের মতো। আমাকে ছাড়াই দুগ্গা মায়ের প্রতিষ্ঠান হয়ে গেল মন্দিরে।

জানলা দিয়ে যদি ঢেঙকুরকুর শোনা যেত! এখানে পূজো একটা। তাই হাওয়ায় ভেসে ভেসে পূজো আসে না আমার বাড়ি।
সপ্তমীর সকালে স্নান করলাম না। বাবিনকে সামলাই তখন। ওর শরীর খারাপ।

এই প্রথম অনুভব করলাম একটা প্রাণ আমাকেই অবলম্বন করেছে। তাই ধুপ, ধুনো, মন্ত্র, বেলপাতা, অঞ্জলি, শিউলি ফুলের মালা স্মৃতিতে পড়ে থাকে। বাস্তবে ফিডার, ন্যাপি, বেবি পাউডার আর আমার বাবিনের নতুন শেখা খিলখিল হাসি, পুজোর আমেজ ছাপিয়ে যায়।

একবার গেলাম দুপুরে ওর বাবাকে নিয়ে। দুগ্গা এবার কেমন দেখতে? মনে করতে পারি না। তখন আমি ব্যস্ত বাবিনের ঘাড় নিয়ে। শক্ত হয়নি। তাই যেন ঠিকঠাক থাকে।

সকলে কোলে নিতে চাইছে। টিকা পড়েনি সব। তাই বুকের খাঁচায় মানিক আড়াল করি! ওকে একবার পরিচয় করাই দুর্গা মায়ের সঙ্গে। তারপর ক্ষমা টমা চেয়ে চলে আসি।
হাঁফ ছেড়ে বাঁচি যেন।

সন্ধ্যায় উবারে চড়ে কলাবাগান। জ্যামে আর শরীরের ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। প্রায় এক ঘন্টা। ওঠেই মনে হলো ফিডারের দুধটা শেষ করতে হবে বাবিনের।

সদ্য পাটভাঙা আসাম সিল্কের শাড়িটায় ফিডারের অর্ধেকটা দুধ পরে একাকার অবস্থা।
আমার ব্যাগে আর টিস্যুর জায়গা হয় না। এখন বাবিনের মোজা, জুতা, হাগিজ, ওয়াইপস আর মোবাইলটা। অথচ টিস্যু ছাড়া আমি অসহায় ছিলাম এককালে!

কলাবাগানে ভয়ংকর ভিড়। আরতি চলছে। কিছুটা দেখা বলো। বাবিনকে ওর বাবার সঙ্গে পাঠালাম ভিড় বাঁচিয়ে মাঠের এক কোনে।

আরতি দেখলাম ছাই। মন প্রাণ জুড়ে বাবিনের চিন্তা। আচ্ছা মাঠের ধুলাগুলো সব কি ধাওয়া করেছে ওর দিকে? ধূলিকণা চোখে দেখা গেলে বেশ হতো। গুলি করে প্রত্যেকটাকে শেষ করতাম!

ঢাকের আওয়াজকে ছাপাতে ব্যস্ত ব্যান্ড পার্টির প্যা পো। ‘ঢাকের তালে কোমর দোলে’ আর বিয়ের গীতের ‘আমার মেয়ের এই বাসনা, হলদি ছাড়া স্নান করে না…’ দিয়ে ঠাকুরমশাই আরতি করছে দুর্গার।

শহুরে বড়লোকগুলো ছাগলই হয়! তাতেই ধ্যাই ধ্যাই নাচছে। বেচারা ঢাঁকি তিনজন তবু প্রাণপনে ঢাঁক বাজিয়েই চলেছে। প্রতিযোগিতায় জিততেই হবে। বাইরে ‘সাধের লাউ’ গাইছে একজন হেরে গলায়।

দুর্গা মা কিংকর্তব্যবিমূঢ়!

তারপর ফটো তোলা হলো পুত্রসহ।
পুরোটা রাস্তায় সে আমাদের ব্যস্ত রাখলো।
আগে একেকটা মন্দিরে যেতাম আর কমপেয়ার করতাম কোন দুর্গাটা কেমন হলো!

আজ মনে করতে পারছি না, দুর্গা ঠাকুরের শাড়িটার রঙ কী! চোখ কি পটলচেরা হয়েছিল? টিকালো নাক?

কী করবো, এতোগুলো এয়ারকুলারের বন্যায় মা সুচিত্রার ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা।

বাসায় ফেরা থেকে এখন অবধি পুজোয় শুধুই বাবিন।

মহাঅষ্টমী ভালো কাটুক সকলের। বাবিন সকালের ব্রেকফাস্ট করে এখন ঘুমে। আমারও উচিত। তবে হাত নিশপিশ করছে বাজে কয়েক ছত্র বের করার জন্য।

শেয়ার করুন:
  • 69
  •  
  •  
  •  
  •  
    69
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.