এমন ব্যর্থ রাষ্ট্রব্যবস্থা দিয়ে আমি কী করবো!

সামিনা আখতার:

আমরা জবাবদিহি কাউকেই করতে পারি না। জবাবদিহিতা যেন একটা অলীক বিষয় হয়ে যাচ্ছে দিন দিন বাংলাদেশে। রাষ্ট্র সে তো বিরাট ব্যপার! আমরা তো তার এক এক কোনায় পড়ে থাকা এক একজন!
আর সরকার! সে তো রাষ্ট্রের চাইতেও বড়! আর সেখানে আমরা এক একটা চুনোপুঁটি! আমাদের খোঁজ কে রাখে, বলেন!

আর সেজন্যই তো দিব্যি একটা জলজ্যান্ত কলেজ পড়ুয়া ১৭ বছরের দারুণ সম্ভাবনাময়ী ছেলে ধানমন্ডি লেকে ডুবে মরে গেল! খালি হয়ে গেল মায়ের বুক, কিন্তু আমরা কারও কাছেই জবাবদিহিতা চাচ্ছি না। কারণ চাইলেও কেউ দিবে না!

যদি প্রশ্ন করি সরকার আছে কীসের জন্য, বোধ হয় নিজের কাছেই অস্বাভাবিক ঠেকবে! কোন ছেলে কোথায় ধানমন্ডি লেকে ডুবে মরে গেল তার খোঁজ কেন সরকার রাখবে বলেন! সরকারের কত বড় বড় চিন্তা করতে হয়, সামলাতে হয়, তাই না!

সাগর-রুনি যখন খুন হলো নিজের বেডরুমে, তখন বলা হলো কারও বেডরুমে নিরাপত্তা দেয়া রাষ্ট্রে/সরকারের সম্ভব না। যদিও বাংলাদেশের মতো আজগুবি রাষ্ট্র আর সরকার ছাড়া এমন কথা কেউ বলবে না। বাবা মাকে হারিয়েছে আমাদের ‘মেঘ’, কিন্তু এখনও বিচার পায়নি।

ধানমন্ডি লেকটা তো কারও বেডরুম নয়! এটি একটি সরকারি সম্পত্তি। সুস্থ বিনোদনহীন শহরের মাঝখানের এই লেকটাতে মানুষ বেড়াতে যাবে সেটাই স্বাভাবিক। যাচ্ছেও। রবীন্দ্র সরোবরে প্রায়ই হচ্ছে নানান অনুষ্ঠান। আর যে লেকের পানির গভীরতা ৩০/৩২ ফুট, সেখানে এই লেককে ঘিরে কোন নিরাপত্তা কর্মী নেই কেন? এই প্রশ্ন কি খুব অমূলক?

হয়তো এবার রাষ্ট্র বলবে, মা কোথায়, ছেলেকে দেখে রাখার দায়িত্ব তো মায়ের। হ্যাঁ আমরা মায়েরা তো প্রতি মুহূর্তে নিজের সুখ জলাঞ্জলি দিয়েও আমাদের সন্তানদের আগলে রাখি, বড় করি। ঋদ্ধর মা আগলে রেখেছিল গত ১৭টা বছর। কিন্তু কোন একদিন একটা পাবলিক প্লেসে দুর্ঘটনায়ও রাষ্ট্র এগিয়ে আসবে না? এ দায়িত্ব কি শুধুই মায়ের? রাষ্ট্রের দায়িত্ব কি একটুও নেই?

নিরাপত্তার সাথে সবসময় শুধু খুব শিক্ষিত প্রশিক্ষিত বাহিনী বোঝায় তা নয়। স্বেচ্ছাসেবী বলে একটা কথা সারা পৃথিবীব্যাপী প্রচলিত আছে। বাংলাদেশেও আছে, কিন্তু সরকার থেকে কখনই তাকে সমাদর করা হয়নি।

হ্রদয়ঙ্গম ঋদ্ধ নামের আমাদের যে ছেলেটি ঐদিন ধানমন্ডি লেকে যখন ডুবে যাচ্ছিল তখন হ্রদয় ও শান্ত নামের দুজন ছেলে ঝাঁপ দিয়ে পানিতে নেমেছিল, কিন্তু বাঁচাতে পারেনি। পারবে কী করে? একটা ডুবন্ত মানুষকে কীভাবে বাঁচাতে হয় সেটি তো জানা দরকার, তাই না! এই যে শান্ত আর হ্রদয় যাদের নিজেদের একটা বিশাল হ্রদয় আছে, কিন্তু এই ছেলেগুলোর দিকেও কি রাষ্ট্র বা সরকারের কোন দায়িত্ব আছে?

এই ছেলেগুলো তো ফেলনা, সারাদিন হয়তো ঘুরে বেড়ায়। যদিও তারাই চেষ্টা করেছিল একটা প্রাণ বাঁচাতে। আর এই এইটুকু চেষ্টার জন্য ঋদ্ধর মা তৃষ্ণা তাদের হাতটা ধরে আছে, ছাড়তে পারছে না। পারবে কী করে ‘মা’ যে! আহা রে ‘মা’!
অথচ আমরা যারা ওর চেনাশোনা আর কাছের মানুষ তারা ঐ ছবির দিকে তাকাতে পারছি না। বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠছে বারংবার!

হৃদয় আর শান্ত তো ব্রিজের কাছের পুলিশকে গিয়ে বলেছিল। তারা তাদেরকে পুলিশ ফাঁড়িতে যেয়ে রিপোর্ট করতে বলে। কেন? ডিজিটাল বাংলাদেশ কোথায় গেল? ওখানে হেঁটে গিয়ে রিপোর্ট করতে যে সময় লাগবে তার চাইতে একটা ফোন তো আরও দ্রুত কাজ করতো, তাই না? আর পুলিশের কাছে তো সেই
জরুরি নাম্বার থাকার কথা, তাই না? কোথায় কোন জরুরি বিভাগে, কাকে ফোন করতে হবে সেটাও তো তাদের জানার কথা, তাই না?

একটা মানুষ ডুবে মরে যাচ্ছে, সেই সংবাদ ঐ পুলিশদেরকে একটুও বিচলিত করে নি? আমাদের রাষ্ট্র এবং সরকার পুলিশকে নষ্ট করেছে, বললে কি ভুল বলা হবে?

সেই পুলিশ নিজে দৌড়ে গেলেও কি খুব ক্ষতি হয়ে যেত? একটা জীবন তো বাঁচতেও পারতো! পুলিশের তো নিশ্চয়ই সেই ট্রেনিং আছে! থাকা উচিত, তাই না?
একটা ডুবন্ত মানুষকে বাঁচানো খুব কঠিন কাজ নয়। শুধু কিছু বিষয় জানা দরকার।

আমি দুর্যোগে কাজ এবং স্বেচ্ছাসেবী তৈরির কাজ করেছিলাম বলে কিছুটা জানি।
শান্ত আর হ্রদয় যদি জানতো একটা দড়ির গিঁট কীভাবে দিলে এবং তা ঐ ডুবন্ত মানুষের মাথা গলিয়ে দুই হাতের নিচে কীভাবে দিলে ক্লান্ত মানুষটিকে উল্টো করে কিভাবে সহজেই টেনে তীরে আনা যায়, তাহলে হয়তো আমাদের ছেলেটি বেঁচে যেতো! ওর মাকে বার বার বলে উঠতে হতো না, ‘আমার বুকটা খালি হয়ে গেছে, কিচ্ছু নেই সেখানে’!

বাঁশ, কলাগাছ, কলস এইসব তো বটেই, একটা মাঝারি ধরনের পাতিল দিয়েও প্রাণ রক্ষা করা যায়। দুই তিনটা প্লাস্টিক ক্যানের মুখ ভাল করে এঁটে দড়ি দিয়ে বেঁধে দিলেও যে কেউ তা ধরে ভেসে থাকতে পারে।

ডুবন্ত মানুষটা অনেক পানি খেলে এবং অচেতন হলেও সাথে সাথে মরে যায় না। সুতরাং যদি দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া যায় তাহলে বেঁচে যেতে পারে। পানি থেকে তুলেই কী করতে হবে সেও প্রশিক্ষণের বিষয়, কিন্তু খুব কঠিন নয়। যে কাউকেই এই দক্ষতায় দক্ষ করে তোলা সম্ভব।

কিন্তু সেই যে বললাম সরকারের অনেক কাজ!
লেকের ধারে যেখানে ছেলেটি ডুবলো সেখানে একটি মসজিদ ছিল। আচ্ছা মসজিদে কি মাইক ছিল না? সেখানেও কি এই ডুবন্ত ছেলেটিকে বাঁচানোর আকুতি জানানো যেত না? আশেপাশের পুলিশের সাহায্য চেয়ে বা আশেপাশের বাড়ি থেকে কোন কাঠের খণ্ড, দড়ি বা কলসী নিয়ে আসার জন্য?

অথবা মসজিদের কোন এক কোনায় কি দুটো তিনটে ‘বয়া’ রেখে দেয়ার কথা কারও মাথায় এলো না? মসজিদটা যেহেতু লেকের ধারে। আর ঋদ্ধ ছাড়াও নাকি আরও অন্য একটি ছেলে ডুবেছিল এই লেকে।

আমি কি রাষ্ট্রের কাছে, মসজিদের কাছে বেশি কিছু চেয়ে ফেললাম? হবে হয়তো!কারণ এইসব মসজিদ, মন্দির তো মানুষের জন্য নয়, স্রষ্টার জন্য!
আর রাষ্ট্র? সে তো বিরাট ব্যাপার! তার অনেক কাজ!
অখ্যাত আমাদের সন্তানেরা প্রতিনিয়ত রাস্তায় বাসের নিচে পড়বে, পানিতে ডুবে মরবে তার দায়-দায়িত্ব রাষ্ট্র নেবে না!

তাহলে এই রাষ্ট্র দিয়ে আমি কী করবো! এই রাষ্ট্রকে আমি ধিক্কার জানাই!

(বিঃ দ্রঃ একটা তথ্য দিয়ে রাখি, বাংলাদেশে এক সময় শিশু মৃত্যুর হার বেশি ছিল ডায়রিয়ার কারণে। এখন সেটাকে ছাড়িয়ে পানিতে ডুবেই শিশু মৃত্যুর হার বেশি। এর বেশিরভাগ গ্রামাঞ্চলে। কিন্তু শহরের প্রাণকেন্দ্রে যেখানে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা আছে, সেখানেও আমরা হেরে যাচ্ছি।)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.