পুরুষাতঙ্কে কেন ভোগে নারীরা?

অপরাজিতা সঙ্গীতা:

‘পুরুষাতঙ্ক’ নামে কেন আমি সিনেমা বানিয়েছি এর জন্য মাঝে মাঝেই বিভিন্ন পুরুষের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় আমাকে। কেউ কেউ তো আবার শুধু প্রশ্ন করেই ক্ষান্ত হোন না, সাথে আমি ‘পুরুষবিদ্বেষী’সহ আরও নানান কথা শুনিয়ে দেন।

এখন আমি আমার নিজের একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি:

ঢাকা থেকে গ্রামে এলাম। যে গ্রামে এসেছি ঢাকা থেকে সরাসরি সেই গ্রামে আসার খুব ভালো মানের বাস নেই। ভালো বাসে করে আসতে গেলে নদীর কারণে অনেক ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে তিন বার বাস পরিবর্তন করে আসতে হয়। আমার সাথে বড় বড় দুটো ব্যাগ থাকায় বাস পরিবর্তন করার ঝামেলা করতে ইচ্ছে করলো না।

তাই সরাসরি বাসের টিকেটই কাটলাম। আমি একা আসবো কিন্তু পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে যেতে পারে তাই দুটো সিট নিলাম। কারণ এর আগে একবার এরকম একটা জার্নিতে আমার পাশের সিটে বসা পুরুষ যাত্রীটিকে যৌন নিপীড়ক হয়ে উঠতে দেখেছিলাম অন্ধকার নামার সাথে সাথে।

সেটা আরেকদিন বলবো। এখন ঘটনায় ফিরে আসি।

ঢাকা থেকে বাস ছাড়লো ঠিকঠাক। আরিচা ফেরিঘাটের কাছে এসে বাসের সুপারভাইজার জানালো, ফেরিঘাটে অনেক জ্যাম, তাই বাস ফেরি পার হবে না। এপারে নেমে হেঁটে গিয়ে লঞ্চে পার হয়ে ওপার থেকে অন্য বাসে যেতে হবে। অথচ পদ্মায় পানি বাড়ার কারণে লঞ্চে করে পার হওয়া এখন খুব ঝুঁকিপূর্ণ। আমি এই কথা তাদের বলার পর প্রথমেই সুপারভাইজার বলে উঠলো- “মাইয়া মানুষ নিয়া এই হইলো সমস্যা, মাইয়া মানুষ একা রাস্তায় বাইর হইছেন ক্যান?” এবং বাসের অন্য যাত্রীরাও এই কথায় নিরব সম্মতি দিয়ে লঞ্চে করে পার হওয়ার ব্যাপারে সম্মতি জানালো। কারণ তাদের কাছে জীবনের চেয়ে সময়ের দাম বেশি।

যাই হোক- এরপরের সমস্যা হলো বিশাল বিশাল দুই ব্যাগ নিয়ে আমি কী করে লঞ্চ পর্যন্ত যাবো। আমি তো ফেরি পারাপারের বাসে এসেছি ব্যাগ যেন টানাটানি করতে না হয় সেজন্য। এটা বলার পরও তারা আবারও শুনিয়ে দিলো মাইয়া মানুষ একা রাস্তায় বের হওয়া কতটা অপরাধ। তারপর আমি এদের কথার উত্তর দিতে দিতে একজন কুলির সাহায্য নিয়ে লঞ্চে গিয়ে উঠলাম। তখন তারা রাগে গজগজ করছে আমি তাদের কথার উত্তর দেয়ায়। তাদের মতে – ‘মাইয়া মানুষ এতো কথা কয় ক্যান?!’

জীবনটা হাতে নিয়ে লঞ্চে পদ্মা পার হয়ে আরেক বাসে গিয়ে উঠলাম। বাস চলা শুরু করার পর আমি ঘুমিয়ে গেলাম। যখন ঘুম ভাঙলো তখন দেখি বাস অনেকদূর এগিয়ে গেছে এবং বাসের বেশিরভাগ যাত্রী আগের কোনও স্টপেজে নেমে গেছে। আমি দেখলাম, বাসে যাত্রী আমিসহ তিনজন। ড্রাইভার, হেল্পার, সুপারভাইজার; সব মিলিয়ে মানুষের সংখ্যা ছয়জন, যার মধ্যে ‘মাইয়া মানুষ’ আমি একা।
হঠাৎ আমার পুরো শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেলো, মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেলো। বাস চলছে জনমানুষশূন্য একটি রাস্তা দিয়ে। রাত বাজে ১০টার মতো কিন্তু গ্রাম এলাকায় এটা মধ্যরাত। তাই রাস্তায় একটা কাক-পক্ষীও নাই। আমার আরও প্রায় এক ঘন্টার রাস্তা যেতে হবে। এর মধ্যেই আরও একজন নেমে গেলো। আর বাসের হেল্পার ছেলেটি একে একে বাসের সব গ্লাসগুলো বন্ধ করে দিতে শুরু করলো। সেটা দেখে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কথা বলতে গিয়ে দেখি গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না। হঠাৎ মনে পড়লো ফেরিঘাটে ‘মাইয়া মানুষ’ নিয়ে করা মন্তব্যগুলো।

নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করলাম। একটু সামলে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, গ্লাস কেনো বন্ধ করা হচ্ছে? তারা বললো, দুই পাশের গাছের ডালপালা বাসের ভিতর ঢুকে যাবে তাই বন্ধ করছে। খেয়াল করে দেখলাম দুই পাশে পুরো জংগলের মতো। এর মধ্যে শুরু হলো বৃষ্টি। হঠাৎ রূপার কথা মনে পড়লো! রূপারও নিশ্চয়ই আমার মতোই অনুভূতি হয়েছিলো।

অপরাজিতা সঙ্গীতা

কী করবো ঠিক বুঝতে পারছিলাম না! তাদের বললাম বাসের মধ্যের লাইটগুলো জ্বালিয়ে দিতে। তারা বললো- চলন্ত অবস্থায় লাইট জ্বালিয়ে রাখার কোনো নিয়ম নাই। আমি আর কোনো তর্কে গেলাম না। অন্য যে একজন যাত্রী ছিলো তারও নামার সময় চলে এলো। অথচ আমার আরও ১৫/২০ মিনিটের রাস্তা যেতে হবে। ওই লোকটি নামার সময় বাসের আলো জ্বালানো হলো। আমি সেই আলোতে কিছু ছবি তুলে ফেললাম- বাস, বাসের ড্রাইভার, হেল্পার আর সুপারভাইজারের। তারা অবাক হয়ে জানতে চাইলো, আমি কেনো ছবি তুললাম। আমি সরাসরি বললাম, তাদের আমি সন্দেহ করছি। তাই নিরাপত্তাজনিত কারণে তাদের ছবি তুলে রাখছি এবং এই ছবি আমার পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি যেন আমার কিছু হলে তাদের এই ছবি দেখে খুঁজে বের করা হয়। তারা আমার কথা শুনে খুব অবাক হলো এবং বললো ‘কিচ্ছু হবে না আফা, আফনে চিন্তা নিয়েন না’। তাদের কথায় আমার চিন্তা গেলো না। আমি বললাম, তাহলে বাসের লাইট জ্বালিয়ে রাখতে আপনাদের সমস্যা কী! এরপর তারা লাইট জ্বালিয়ে দিলো এবং একসময় আমি নিরাপদে আমার গন্তব্যে পৌঁছলাম।

বাস থেকে নামার সময় আমি তাদের সামনেই তাদের ছবি ডিলিট করে দিলাম। তাদের অনুমতি নিয়ে শুধু বাসের ভেতরের ছবিটি রেখে দিলাম।
এই হলো আমাদের প্রতিদিনের জীবন! বেশিরভাগ মেয়েরই প্রতিটা দিন কোনো না কোনোভাবে পুরুষের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হবার আতঙ্কের মধ্যে কাটে।

হয়তো বাসের এই পুরুষগুলো খারাপ ছিলো, কিন্তু আমি ছবি তোলায় তারা খারাপ হবার সাহস দেখায়নি। হয়তো তারা খারাপ ছিলো না, আমি ছবি না তুললেও খারাপ কিছু করতো না; কিন্তু আমি আতঙ্কে ভুগেছি।

এই আতঙ্কে ভোগার দায় কি আমার, নাকি আমাদের এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.