আমাদের বর্তমান, আমাদের বিবাহ, আমাদের বিচ্ছেদ

মাশরুর শাকিল:

১.
কোহিনুর একটি টেলিভিশন চ্যানেলের রিয়েলিটি শো’র মাধ্যমে চার বছর পূর্বে নির্বাচিত সঙ্গীত শিল্পী। চট্টগ্রাম থেকে আসা যাওয়া করে ঢাকায় এ সাফল্য সে অর্জন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে স্নাতক পড়া মেয়েটি ঢাকায় আইন ও সঙ্গীতের ক্যারিয়ার গড়তে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের সিনিয়র সাংবাদিককে বিয়ে করে। বিয়ের পূর্বে একটি বিষয়েই কোহিনূর ঐ সাংবাদিকের কাছে নিশ্চয়তা চায়। বিয়ের পর তাকে গান করতে দেয়া হবে কিনা। নিজের পরিবার নিমরাজী হলেও নিজের সংস্কৃতিমনে ঐ সাংবাদিক পূর্ণ আশ্বস্ত করে তাকে। কোহিনূরের পরিবার খোঁজ নিয়ে দেখে ছেলের গাড়ি-বাড়ি কিছুই নেই। বেতনও আহামরি নয়। তবে সমাজে তার নাম ডাক আছে। পাত্রের এসব সীমাবদ্ধতা মেয়েকে জানালেও শুধু গান করার স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেয়। মেয়েটির পিতামাতা নেই। ছয় ভাইবোনের পরিবারও ভাবে ২১ বছরে তাদের বোনকে বিয়ে দিয়ে দিলে অনার্স মাস্টার্স পড়ার খরচসহ সব ল্যাঠা চুকে যায়।

সাংবাদিক স্বাধীন নারীদের ব্যাপারে দারুণ দুর্বলতা। সে মনে করে নিশ্চয় কোহিনুর তার সাপোর্ট নিয়ে আইন এবং সঙ্গীতে ধীরে ধীরে বড় হবে। চার বছরের মাথায় কোহিনুর তার বিয়ের অলিখিত চুক্তি ভুলে যায়। নিকেতন কেন্দ্রিক গানের এক ধান্ধাবাজ দলের খপ্পরে পড়ে। তারা তাকে লোভ দেখায়। ‘তুমি অনেক বড় শিল্পী, এসব ছোট খাটো সাংবাদিক কি তোমাকে মানায়’ তোমার একটি গান কয়েক লাখ ভিউ হবে’। উঠতি শিল্পীদের, শারীরিক, আর্থিক সবকিছু হাতিয়ে নেয়ার জন্য তাদের এই কৌশল। এর প্রভাবে কোহিনুর বিভ্রান্ত হয়। প্রতিদিন বিচিত্র অভিযোগ করতে থাকে সংসারে। এক পর্যায়ে ঝগড়া হলে সাংবাদিক সায়েম ঘর থেকে বের হয়ে যায়। পরে কোহিনূরের পরিবারও তার সবকিছু নিয়ে চট্টগ্রাম চলে যায়। সম্পর্কটি এখন ঝুলে আছে। এ সম্পর্ক টিকতেও পারে, আবার নাও টিকতে পারে।

২.
শাওন প্রেম করে বিয়ে করে। গার্মেন্টস বায়ারদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ওয়ালমার্টে ভালো বেতনের জব করে। তার স্ত্রী আহসানুল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর্কিটেকচারে অনার্স মাস্টার্স শেষ করে। দারুণ ধৈর্য্যের সাথে দুজন তাদের পরিবারকে রাজী করিয়ে তারা বিয়ে করে। দু’বছরের মধ্যে তাদের একটি কন্যা সন্তান হয়। শাওনের বন্ধু রাইসুল। অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা করে হঠাৎ ফুলে ফেঁপে এমন কলাগাছ হয় যে সেই টাকা সাদা করতে অনলাইন মাছ কোম্পানি খুলে। সফটওয়্যার কোম্পানি খুলে সরকারি কাজ নেয়ার চেষ্টা করে। এইজন্য সরকারি বয়স্ক কর্মকর্তাদের বাগে আনতে বনানীতে ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়। সেখানে দেহপসারিনীদের মাসের একটি দিন আনা হয় এসব বয়স্ক সরকারি কর্মকর্তাদের খুশি করার জন্য। নিজেরাও লিপ্ত হয় অনৈতিক কাজে। শাওন ওখানে গিয়ে দেহ পসারিনীদের স্বাদ পায়। নারীরা যখন মা হোন তখন তাদের শরীরে বিচিত্র পরিবর্তন ঘটে। ভালোবাসা না থাকলেও এ সময় পুরুষদের অন্য নারীর কাছে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হয়। স্ত্রী এ বিষয় বুঝতে পেরে সন্দেহ করে। নানা বিষয়ে ঝগড়া হতে হতে একটি পর্যায়ে সর্ম্পকটি ভেঙ্গে যায়। শাওন তার মেয়েকে নিয়ে আবার বিয়ে পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছে।

৩.
কয়েক বছর আগে ময়মনসিংহ কোর্টে একটি মামলা আসে বিচ্ছেদের। সালিশি বৈঠকে স্ত্রীর অভিযোগ তার স্বামীর মা মানে তার শাশুড়ি স্বামী-স্ত্রীর ঘরের দরোজা বন্ধ করতে দেন না। এ বিষয়ে স্বামী বললেও স্বামী কিছু বলতে পারে না মাকে। এ নিয়ে ঝগড়া, বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা।

৪.
পরিনিতা একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের নিউজ প্রেজেন্টার। দীর্ঘদিন ধরে তার একটি ছেলের সাথে সম্পর্ক। ছেলেটি কমিশনে র‌্যাঙ্কে সেনা কর্মকর্তা হয়। শ্যামলা হলেও চৌকস ছেলে অচিরেই প্রধানমন্ত্রীর নজরে পড়ে। তার এসএসএফে পোস্টিং হয়। মেজর ছেলেটির সাথে মেয়ের বিয়েতে আপত্তি করেনি একমাত্র কন্যা সন্তানের পরিবার। বিয়ের পর থেকে পরিনিতাকে টেলিভিশন ছাড়তে বলে ঐ সেনা কর্মকর্তা। যখন তখন শারীরিক সম্পর্কে অনিহা দেখায় পরিনিতা। ফলশ্রুতিতে তার স্বামী পরিনিতার বিরুদ্ধে একাধিক সম্পর্কের অভিযোগ তুলে। যদিও নিজেই বিভিন্ন মেয়ের কাছে যায়। শেষ পর্যন্ত শারীরিক নির্যাতনের পর্যায়ে যায় সম্পর্কটি। সম্পর্কটি টেকেনি।

এতো মাত্র চারটি ঘটনা। আমাদের চারপাশে এমন হাজারও ঘটনা ঘটছে।

আমরা একটি অস্থির সময় পার করছি। ফেইসবুকে ইদানিং একটি তথ্য বেশ ঘুরপাক খাচ্ছে। ঢাকায় গত এক বছরে আশংকাজনক হারে বেড়েছে বিবাহ বিচ্ছেদ। ৩০ শতাংশ আবেদন পুরুষের কাছ থেকে, ৭০ শতাংশ নারীদের কাছ থেকে। এ তথ্যে অনেকেই নারীদের দোষারোপ করছেন। বলছেন, পুরুষরা বিচ্ছেদ চায় না, নারীরা চাচ্ছে।

আসলে দোষ কারো নয়, দোষ সময়ের। দোষ বিজ্ঞাপন নির্ভর আরোপিত জীবনের। দোষ নারীদের আর্থিক স্বচ্ছলতার (?)। দোষ পুরুষের শত বছরের পুরুষ রাজত্বে ভাগ বসাতে দিতে পুরুষের অস্বীকার।

বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানের এই ভেঙ্গে পড়াকে বুঝতে হলে বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিকতা বুঝতে হবে। কেনো এ প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন পড়লো?

পূর্বে মানুষ যখন বনে জঙ্গলে থাকতো, শিকার করে জীবন ধারণ করতো, তখন বিবাহের প্রয়োজন হতো না। নারী একমাত্র সন্তান ধারণে সক্ষম। সে তার প্রয়োজন ও ইচ্ছামতো যার কাছ থেকে প্রয়োজন সন্তানের বীজ গ্রহণ করতো। জঙ্গলে যে শিশুর জন্ম হতো সে প্রকৃতির সন্তান। তার পিতৃপরিচয়ের প্রয়োজন হতো না।
কিন্তু যেদিন থেকে চাষাবাদের ভার পুরুষের হাতে পড়লো এবং পুরুষ জমির মালিক হতে শুরু করলো সেদিন থেকে তার মৃত্যুর পর সম্পত্তির উত্তরাধিকার নির্ধারণের প্রয়োজন পড়লো। আর তখনই বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাঁধতে চাইলো পুরুষ।

বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের পরিচালক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বিবাহকে একটি মধ্যবিত্তিয় পারস্পরিক নির্ভরশীলতার প্রতিষ্ঠান বলে মনে করেন। (বই-কথোপকথন) মানুষ মাত্রই স্বাধীন সত্তা। জন্মগতভাবে সে বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠান বিরোধী। মধ্যবিত্ত সমাজে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা স্বাধীনতার বিসর্জন দিতে দিতে এ প্রতিষ্ঠান এগিয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে তাই এই প্রতিষ্ঠান সৃষ্টিশীল মানুষের মৃত্যু ঘটায়। তবে সাংস্কৃতিকভাবে কাছাকাছি দূরত্বের মানুষ স্বামী-স্ত্রী হলে সেখানে সৃষ্টিশীলতা বৃদ্ধি পায়। দুটি আপাত ভিন্ন মানুষের একই ছাদের নিচে জীবন পার করে দেয়ার এ সংসার বড় বেশি কঠিন, নির্মম আবার সুখেরও কারণ।

মুসলিম বিবাহ আইনে যে কাবিন নামা সেখানে স্পষ্ট লেখা থাকে মোহরানা ও ভরণপোষনের বিনিময়ে নারীকে ভোগের অধিকার দেয়া হয় একটা পুরুষকে। মুহম্মদ (সা.) এর যুগে নারীদের জীবন্ত কবর দেয়া হতো। সেখানে নারীদের কর্মের অধিকার ছিলো দূরপ্রস্ত। মুহম্মদ নারীদের রক্ষার জন্য পিতা ও স্বামীর সম্পত্তিতে অধিকার দেন। জীবন্ত কবর নিষিদ্ধ করেন। তখন এ নিয়ম ছিলো নারী স্বাধীনতার সর্বোচ্চ অর্জন। বর্তমানে নারী তার কর্মের মাধ্যমে নিজের জীবন ধারণে সক্ষম। একজন স্বাধীন নারী সবসময় পুরুষের সব আদেশ বিনাবাক্যে মেনে নেবে এ আশা কি বাতুলতা নয়! ফলে এখন আর ভরণপোষন আর মোহরানার বিনিময়ে ভোগের যে রীতি সেটি আঘাত পাচ্ছে। পুরুষের ইচ্ছায় ভোগে রাজী হচ্ছে না নারী। সংসারের সব কাজও একা করতে চাচ্ছে না। এখন এক নতুন লক্ষণ প্রকাশিত। সেটি হলো, ভালোবাসার জন্য ভালোবাসা। তোমার সাথে থাকি কারণ তোমাকে ভালোবাসি। আর কিছু নয়।

ভালোবাসা স্বাধীন মানুষের বৈশিষ্ট্য। যে নারী নিজে আয় করতে পারে না, নিজে চলতে ফিরতে পারে না হাত পা মুখ চোখ, পড়াশোনা থাকার পরও তার যেমন বিকল্প থাকে না স্বাধীনতার অধিকার পুরুষ স্বামীর কাছে হাত পেতে চাওয়া ছাড়া, তেমনি একজন পুরুষেরও উচিত নয় একজন স্বাধীন নারী যারা নিজেকে পরিচালনার সকল আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে তার কাছ থেকে পূর্ণ বশ্যতা চাওয়া?

বিবাহ বিচ্ছেদ তাই সময়ের অস্থিরতার লক্ষণ, দীর্ঘমেয়াদী ফল নয়।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, চ্যানেল আই
কমনওয়েলথ শেভনিং ফেলো, ২০১৯
রিডিং ফেলো, রিডিং ক্লাব ট্রাস্ট।

শেয়ার করুন:
  • 270
  •  
  •  
  •  
  •  
    270
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.